আসিফ ইবনে বারখিয়া কে ছিলেন জ্বিন না মানব?

আসিফ ইবনে বারখিয়া, হজরত সুলাইমান, বিলকিস, বিলকিসের সিংহাসন,
নাম: আসিফ।  আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর একজন বার্তা লেখক অথবা খাদেম ছিলেন। ইতিহাসে রেওয়ায়েতে  হজরত সুলাইমান (আ.) তাঁর নামকে উল্লেখ করেছেন। (কেসাসুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা ২৮৪, মিযান, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩৬৩) আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ

আসিফ ইবনে বারখিয়া কে ছিলেন জ্বিন না মানব?

এস, এ, এ

আসিফ ইবনে বারখিয়ার পরিচয়:

নাম: আসিফ।  আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর একজন বার্তা লেখক অথবা খাদেম ছিলেন। ইতিহাসে রেওয়ায়েতে  হজরত সুলাইমান (আ.) তাঁর নামকে উল্লেখ করেছেন। (কেসাসুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা ২৮৪, মিযান, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩৬৩)

আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর একজন বন্ধু অথবা কাছের লোক। তিনি ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর  বোন জামাই। (তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৩৬)

আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর খুব কাছের লোক তিনি হজরত সুলাইমান (আ.)এর অবর্তমানে তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। (মাজমাউল বায়ান, খন্ড ৭, ৩৪৯)

বিভিন্ন তাফসির এবং রেওয়ায়েতে আসিফ ইবনে বারখিয়াকে হজরত সুলাইমান (আ.)এর একজন বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ উজির ছিলেন।  তিনি ছিলেন একজন বণি ইসরাইলের লোক। তিনি ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর সমবয়সী।

কোরআনে হজরত আসিফ ইবনে বারখিয়া:

কোরআনে সরাসরি আসিফ ইবনে বারখিয়ার কথা বর্ণিত হয়নি কিন্তু হজরত সুলাইমান (আ.)এর ঘটনায় তাঁ কথা বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে তার ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি হজরত সুলাইমান (আ.) কে বলেছিলেন যে তিনি চোখের পলক ফেলার পূর্বেই বিলকিসের রাজ কেদারাকে এনে দিবেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২৬৯)

قَالَ يَا أَيُّهَا المَلَؤُا أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَن يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ

অর্থ: সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?    (সূরা নমল, আয়াত নং ৩৮)

যেভাবে তাফসীর এবং রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর উজির এবং বোন জামাই।(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১২৩)

আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর স্থলাভিষিক্ত। তিনি নিজের পরে হজরত যাকারিয়া (আ.)কে নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নির্বাচন করেন। (মান লা ইয়াহযারুহুল ফাক্বিহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১২৩)

আসিফ ইবনে বারখিয়া হজরত সুলাইমান (আ.)এর  অনুমতিক্রমে বিলকিসের রাজকেদারাকে চোখের পলক ফেলার পূর্বেই এনে উপস্থিত করে। কারণ তিনি ইসমে আযমের জ্ঞানকে লব্ধ করেছিলেন। (সুরা নমল, আয়াত নং ৪০ এর তাফসির)

হজরত সুলাইমান (আ.)এর জামাই, উজির, স্থলাভিষিক্ত, বার্তা লেখক ছিলেন আসিফ ইবনে বারখিয়া বিন শামআয়া অথবা শামউন। তিনি ছিলেন বণি ইসরাইল থেকে এবং এক বণনা অনুযায়ী তিনি ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর শৈশবের শিক্ষক।(তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৩৬, তাফসীরে সামার কান্দি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯৬)

 অনেকে আবার তাকে বোনর ছেলে, চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই বলেও মনে করেন। (তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড ১৩,পৃষ্ঠা ১৩৬, মাজমাউল বায়ান, খ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩৪৯)

তাওরাতে আসিফ বিন বারখিয়ার নাম উল্লেখিত হয়েছে। সেখানে তাঁকে হজরত দাউদ (আ.)এর একজন গায়ক দলের নেতা অথবা গায়ক বলে পরিচয় করানো হয়েছে। তাকে হজরত ইয়াকুব (আ.) এর নাতী লাভি এর সন্তান বলেও পরিচয় করানো হয়েছে। (কিতাবে মোকাদ্দাস, সাফরে আওয়াল তাওয়ারিখ, ১৫: ১৭, ১৮, ১৬: ৪, ৫)

বিলকিসের রাজকেদারা আনার ঘটনা:

অধিকাংশ মুফাসসিরগণ সুরা নমলের ৩৮, ৪০ নং আয়াতটিকে হজরত সুলাইমান এবং সাবার রাজ কেদারা কে কেন্দ্র করে তাফসির করেছেন। হজরত সুলাইমান (আ.) তার সঙ্গিদেরকে নিদেশ দেন যেন তারা রাণি সাবা আসার আগেই তার রাজ কেদারা নিয়ে আসে। তখন সভাতে উপস্থিত এক জ্বিন বলে আমি যোহর পর্যন্ত চলা এ সভা থেকে উঠার পূর্বেই উক্ত কেদারাটি আপনার কাছে এনে উপস্থিত করবো। (বিহারুল আওয়ার, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২৬৯)

কোরআনে এর  পরের ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

قالَ الَّذی عِنْدَهُ عِلْمٌ مِنَ الْکِتابِ أَنَا آتیکَ بِهِ قَبْلَ أَنْ یَرْتَدَّ إِلَیْکَ طَرْفُکَ فَلَمّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قالَ هذا مِنْ فَضْلِ رَبّی لِیَبْلُوَنی ءَ أَشْکُرُ أَمْ أَکْفُرُ وَ مَنْ شَکَرَ فَإِنَّما یَشْکُرُ لِنَفْسِهِ وَ مَنْ کَفَرَ فَإِنَّ رَبّی غَنِیٌّ کَریمٌ 

যে ব্যাক্তির এতো জ্ঞান ছিল কিন্তু তারপরেও কোরআনের তাফসিরে তার সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: বলা হয়েছে যে, তিনি ছিলেন হজরত খিযির, সাব্বাত বিন উদ, উক্ত দ্বীপের একজন সৎ ব্যাক্তি,  ইয়ামলিখা,  মালিখা, তামলিখা, বালিখা, বালখ, উসতুম, উসতুস, সুলাইমান, জিব্রাইল, ফেরেস্তা, যুন নুর অথবা হুদ (আ.) ছিলেন।

তবে অধিকাংশ মুফাসসীরগণ তাঁকে আসিফ ইবনে বারখিয়া বলে অভিহিত করেছেন। যিনি ছিলেন হজরত সুলাইমান (আ.)এর উজির, বিশ্বস্ত ব্যাক্তি এবং তিনি ইসমে আযমের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। (মাজমাউল বায়ান, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩,তাফসীরে সামার কান্দি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯৭, কাশফুল আসরার,খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২২)

আহলে বাইত (আ.) হতে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়েতে আসিফ ইবনে বারখিয়াকে হজরত সুলাইমান (আ.)এর একজন স্থলাভিষিক্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে।  রাসুল (সা.) হতে বর্ণিত রেওয়ায়েত অনুযায়ী আসিফ ইবনে বারখিয়া ছিলেন আমার ভাই হজরত সুলাইমান (আ.)এর স্থলাভিষিক্ত যিনি বিলকিসের রাজকেদারাকে নিয়ে এসেছিলেন যার কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল (اَلَّذِى عِندَهُ عِلمٌ مِنَ الكِتب)। (নূরুস সাকালাইন, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮৮)

যখন হজরত সুলাইমান (আ.)এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে তখন আল্লাহ তায়ালা হজরত সুলাইমান (আ.)কে ওহী করেন যে তিনি যেন আসিফ ইবনে বারখিয়াকে নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তাকে নূর, হিকমত মীরাস দান করেন। (তাফসীরে বোরহান, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২০)

ইমাম বাকের  ও  হাসান আসকারী (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা বলেছেন: ইসমে আযম ৭৩টি শব্দ দ্বারা স্থিরীকৃত  হয়েছে এবং আসিফ তন্মধ্যে শুধুমাত্রে একটি শব্দ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছিল। যার কারণে সে বিলকিসের রাজকেদারাকে চোখের পলকে নিয়ে আসে।

আসিফের  স্থলাভিষিক্ত কে ছিল?

সুরা সাবা এর ১৪ নং আয়াতে হজরত সুলাইমান (আ.) এর মৃত্যু সম্পর্কে বণনা করা হয়েছে। যখন হজরত সুলাইমান (আ.) তার ছড়িতে ভার দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন এবং এমতাবস্থায় তার রূহকে কবজ করা হয় তখন আসিফ ইবনে বারখিয়া তারপর সকল কর্ম দ্বায়িত্বকে নিজেই সম্পাদন করতেন। কিন্তু যখন তাঁরও মৃত্যুর  সময় ঘনিয়ে আসে  তখন তার কাছে আল্লাহর বার্তা আসে সে যেন তার সন্তান “সাফুরা”কে নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নির্বাচন করে এবং তার কাছে যে নূর ও হিকমতের জ্ঞান ছিল তা যেন তিনি তার সন্তানকে দান করেন। (ইসবাতুল ওয়াসীয়া, পৃষ্ঠা ৭৬)

তবে তাওরাতে সুলাইমান (আ.)এর সন্তানকে “রাহুবআম” নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং তাকেই সুলাইমান (আ.)এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (কিতাবে মোকাদ্দাস, সাফারে দোওয়ুম তাওয়ারিখ, ৯: ৩১)

কিতাব বলতে কি বুঝানো হয়েছে?

তাফসীরবিদদের দৃষ্টিতে কিতাব বলতে বুঝানো হয়েছে, যে জ্ঞান  আসিফ ইবনে বারখিয়ার কাছে ছিল। অনেকে তাকে লওহে মাহফুয আবার অনেকে তাকে বিলকিসকে লিখা সুলাইমান (আ.)এর চিঠি বলেও মনে করেন। আবার অনেকে তা নবীদের উপরে নাযিল হওয়া একটি কিতাব বলেও মনে করেন। আবার অনেকে উক্ত কিতাবটিকে তওরাত বলেও মনে করেন। আবার অনেকে তা ইসমে আযম বলেও মনে করেন যা হচ্ছে আল্লাহর নাম যা আসিফ ইবনে বারখিয়া লব্ধ করেছিলেন।  (মাজমাউল বায়ান, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩৪৯)

ইসমে আযম কি ছিল?

আসিফ ইবনে বারখিয়া যিনি ইসমে আযমের জ্ঞান থাকার কারণে বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকের হজরত সুলাইমান (আ.)এর সম্মুখে উপস্থিত করেন। উক্ত ইসমে আযম সম্পর্কে তাফসীর গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন:

১. «اللّه الرحمن»

২. «یا‌ حى یا قیوم»

৩. «آهیا شراهیا»

৪. « « یا ذا الجلال و الإكرام

৫. « یا إلـهنا و إلـه كل شىء إلـهاً وحداً لا إلـه إلا أنت» (আল মিযান, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩৬৩)

ইমাম বাকের এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে তাঁরা বলেছেন:ইসমে আযম ৭৩ টি অক্ষর সম্বলিত এবং আসিফ ইবনে বারখিয়ার শুধুমাত্র একটি অক্ষরের জ্ঞান ছিল। অথচ ইমাম (আ.)এর কাছে ৭২টি ইসমে আযমের জ্ঞান ছিল। (কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৬)

হজরত সুলাইমান (আ.) কি আসিফের মুখাপেক্ষি ছিলেন?

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন: হজরত সুলাইমান (আ.) আসিফের জ্ঞানের মুখাপেক্ষি ছিলেন না। তিনি শুধুমাত্র তাঁর উম্মতকে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, আসিফ হচ্ছেন হজরত সুলাইমান (আ.) এর স্থলাভিষিক্ত এবং আল্লাহর হুজ্জাত। আসিফের কাছে যে জ্ঞান ছিল তা তিনি হজরত সুলাইমান (আ.) এর কাছ থেকে শিখেছিলেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি আসিফকে উক্ত জ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছিলেন যেন হজরত সুলাইমানের পরে লোকজন তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও ইমামতের প্রতি সন্দেহ পোষণ না করে। (তাফসীরে মাজমাউল বায়ান, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩৫১)

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে এটাই স্পষ্ট হয় যে আসিফ ইবনে বারখিয়া জ্বিন ছিলেন না বরং তিনি মানুষ এবং হজরত সুলাইমান (আ.)এর স্থলাভিষিক্ত এবং নায়েব ছিলেন।

 

اشتراک گذاری: 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন

Fill in the blank.