রবিউস সানি মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

সন ৬৫ হিজরির উক্ত দিনে সুলাইমান বিন সুরাদের নেতৃত্বে প্রায় ১৬ হাজার তাওয়াবিন যারা ইমাম হুসাইন (আ.)এর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আন্দোলন করেছিল। সুলাইমান বিন সুরাদ ছিল ইমাম আলি (আ.) এর অনুসারি। সে বিভিন্ন যুদ্ধে ইমাম আলি (আ.) এর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি

রবিউস সানি মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

এস, এ, এ

 

১লা রবিউস সানি:

তাওয়াবিনদের বিপ্লবি আন্দোলন:

সন ৬৫ হিজরির উক্ত দিনে সুলাইমান বিন সুরাদের নেতৃত্বে প্রায় ১৬ হাজার তাওয়াবিন যারা ইমাম হুসাইন (আ.)এর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আন্দোলন করেছিল। সুলাইমান বিন সুরাদ ছিল ইমাম আলি (আ.) এর অনুসারি। সে বিভিন্ন যুদ্ধে ইমাম আলি (আ.) এর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।  সে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদতের পরে আয়নুল ওয়ারদা নামক স্থানে ইবনে যিয়াদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ৯৩ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন এবং তার সেনাদের মধ্যে মাত্র ২৭ জন যারা আহত হয়েছিল শুধুমাত্র তারা ব্যাতিত সকলেই শাহাদত বরণ করে। (মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৮, কালায়েদুন নুহুর, )

 

ইমাম বাকের (আ.)এর শাহাদত:

রেওয়ায়েত অনুযায়ি ইমাম বাকের (আ.) উক্ত তারিখে শাহাদত বরণ করেন। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল সানি, পৃষ্ঠা ১৭৭)

 

৩রা রবিউস সানি:

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) গোরগানে সফর:

উক্ত তারিখে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) কেরামতের মাধ্যমে তাঁর কৃত অঙ্গিকার পূরণের জন্য সামেরা থেকে ইরানের গোরগানে আসেন। জাফর বিন শারিফ বলেন: আমি হজে যাওয়ার পূর্বে ইমাম (আ.)এর সাথে সাক্ষাতের জন্য সামেরাতে যায়। আমি ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছিলাম যে, অর্থগুলো কাকে দিব? উক্ত প্রশ্নটি করার পূর্বেই তিনি আমাকে বলেন:  আমার খাদেম মোবারকের কাছে দিও। ইমাম (আ.)এর কাছে থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে  তাঁকে বললাম যে, গোরগানে আপনার অনুসারিরা আপনাকে সালাম বলেছে। তখন ইমাম (আ.) বলেন: তুমি ১৭০ দিন পরে শুক্রবারে ৩রা রবিউস সানি তারিখে গোগানে পৌছাবা। সেখানে পৌছে তুমি সেখানে আমার অনুসারিদেরকে জানিয়ে দিও যে, উক্ত দিনে আমি তাদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য আসব। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। যখন তোমার সন্তানের একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তখন তার নাম রাখবে সালত। আল্লাহ অচিরেই তাকে আমাদের ওয়ালি হিসেবে পৃথিবির কাছে সুপরিচিত করবে। অবশেষে ইমাম (আ.) তাঁর অঙ্গিকার পূরণের জন্য উক্ত তারিখে গোরগানে আসেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫০, পৃষ্ঠা ২৬৩, আল খারায়েজ ওয়াল জারায়েহ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২৫)

 

হজরত আব্দুল আযিম হাসানি (আ.) এর জন্মদিবস:

নাম: আব্দুল আযিম, প্রসিদ্ধ হচ্ছেন সাইয়্যেদুল কারিম।

পিতা: আব্দুল্লাহ বিন আলি বিন হাসান বিন যায়দ বিন হাসান (আ.) বিন আলি ইবনে আবি তালিব (আ.)।

মাতা: ফাতেমা বিনতে উকবা বিন কাইস।

উপনাম: আবুল কাসিম, আবুল ফাতহ।

জন্ম তারিখ: রোজ বৃহঃস্পতিবার, ৪ঠা রবিউলস সানি, ১৭৩ হিজরি, খলিফা হারুনর রশিদ’এর যুগে জন্মগ্রহণ করেন।

জন্মস্থান: মদিনা, তাঁর পূর্বপুরুষ ইমাম হাসান (আ.)’এর বাড়িতে।

বয়স: ৭৯।

মৃত্যু: ২৫৪ হিজরি।

তিনি ইমাম মূসা কাযিম, রেযা, জাওয়াদ এবং হাদি (আ.)এর চারজন সানিধ্যে অর্জন করেছেন।

 

৬ই রবিউস সানি:

হেশাম বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুদিবস:

সন ১২৫ হিজরির উক্ত তারিখে রোজ বুধবার ‘রাসাফা’ নামক স্থানে হেশাম বিন আব্দুল মালিক মৃত্যুবরণ করে। হেশাম বিন আব্দুল মালিক ছিল বিদ্বেষি, কঠোর, ক্রুরহৃদয় ও কৃপণ প্রকৃতির মানুষ। সে যায়দ বিন আলি বিন হুসাইন, ইমাম বাকের (আ.)কে শহিদ করে এবং ইমাম সাদিক (আ.)কে শামে ডেকে পাঠায় এবং তাঁকে অপমান করে। তার খেলাফতকাল ছিল ১৯ বছর ৯ মাস ১০দিন এবং সে ৫৩ বছর বয়সে মারা যায়।  সাফফাহর যুগে বণি উমাইয়াদেরকে হত্যা করা শুরু হয় এবং তাদের কবরকে খুঁড়ে তাদের লাশের অবশিষ্ট অংশকে পুড়িয়ে দেয়ার প্রথা চালু হয়। যখন হেশাম বিন আব্দুল মালিকের কবরকে খুঁড়া হয় তখনও তার লাশ সম্পূর্ণভাবে গলে যায়নি। তার লাশকে কবর থেকে বাহির করা হয় এবং তার লাশকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ১১৮)

 

৮ই রবিউস সানি:

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর জন্মদিবস:

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)'র রেখে যাওয়া আহলেবাইতভুক্ত ১২ জন ইমামের মধ্যে একাদশ ইমাম। তাঁর পিতা ছিলেন ইমাম হজরত হাদী (আ.) ও মাতা ছিলেন মহীয়সী নারী হুদাইসা (সা.আ.)।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) পবিত্র মদিনায় ২৩২ হিজরির এই দিনে তথা ৮ই রবিউসসানি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও ইমাম (আ.) এর জন্মতারিখ সম্পর্কে ইতিহাসে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: ৮ই রবিউল আওয়াল এবং ১০ই রবিউস সানি।

বণি আব্বাসের খেলাফতের চাপের মুখে ইমাম আসকারি (আ.) ও তাঁর পিতা ইমাম হাদী (আ.) প্রিয় মাতৃভূমি মদিনা শহর ছেড়ে আব্বাসীয়দের তৎকালীন শাসনকেন্দ্র সামেরায় আসতে বাধ্য হন। সামেরায় ততকালীন শাসকদের সামরিক কেন্দ্র তথা 'আসকার' নামক স্থানে কঠোর নজরদারির মধ্যে ইমাম আসকারি (আ.)কে বসবাস করতে হয়েছিল বলে তিনি আসকারি নামেও পরিচিত ছিলেন।

কঠোর প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) অশেষ ধৈর্য নিয়ে তাঁর অনুসারীদেরকে জ্ঞানগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকসহ সব ক্ষেত্রেই পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পিতা ইমাম আলী নাকী তথা হাদী (আ.)'র শাহাদতের পর ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ২২ বছর বয়সে ইমামতের দায়িত্ব লাভ করেন। (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৩)

 

হজরত ফাতেমা (সা.আ.) এর শাহাদত:

ইতিহাসের বর্ণনামতে হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) রাসুল (সা.) এর ওফাতের ৪০ দিন পরে শত দুঃখ ও যন্ত্রণা সহ্য করে অবশেষে ৮ই রবিউস সানি মদিনায় শাহাদত বরণ করেন। (রওযাতুল ওয়ায়েযিন, পৃষ্ঠা ১৫১)

 

১০ই রবিউস সানি:

হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)এর মৃত্যুদিবস:

সন ২০১ হিজরির উক্ত তারিখে হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) শাহাদত বরণ করেন। মদিনা হতে খোরাসানে আসার সময় পথিমধ্যে তাঁর কাফেলার উপরে হামলা করা হয়। সাভে শহরে পৌঁছানোর পর তিনি মরাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখান থেকে তিনি কোমে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কোমে আগমণের ১৭ দিন পর ১০ই রবিউস সানি ২০১ হিজরীতে ২৮ বছর বয়সে প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের পূর্বে ইন্তেকাল করেন। কোমের শিয়ারা বিশেষ সম্মানের সাথে বাগে বাবেলান (বর্তমানে যেখানে মাজার শরীফ অবস্থিত) নামক স্থানে দাফন করে দেয়। তবে ইতিহাসের বর্ণনামতে তাঁর দাফনের সময় দুইজন ইমাম (আ.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। (মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড  ২, পৃষ্ঠা ১৬৩)

 

১২ রবিউস সানি:

নামাজ ওয়াজিব হয়:

এক বর্ণনা অনুযায়ি সন ১ম হিজরির উক্ত তারিখে সাধারণ এবং সফরের অবস্থায় নামাজ ওয়াজিব হয়। (মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৯৭)

 

১৩ই রবিউস সানি

হজরত ফাতেমা (সা.আ.) এর শাহাদত:

ইবনে শাহর আশুবের বর্ণনামতে উক্ত তারিখে হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) মদিনায় শাহাদত বরণ করেন। (মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪০৬)

 

বণি উমাইয়া বিলুপ্তি:

আবুল আব্বাস সাফফা ছিল বণি আব্বাসের প্রথম খলিফা উক্ত তারিখে বাইয়াত গ্রহণ করে। বণি মারওয়ানের রাজত্বের সাথে সাথে বণি উমাইয়া কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদিও মারওয়ানকে ২৭শে জিলহজে হত্যা করা হয়। কিন্তু ১২ রবিউস সানি সম্পূর্ণভাবে বণি উমাইয়ার নাম মিটিয়ে ইতিহাসের পাতায় বণি আব্বাসিয়ার নাম লিখে দেয়া হয়। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৯৫, পৃষ্ঠা ৩৫৭)

 

১৪ই রবিউস সানি:

মোখতারের বিপ্লবি আন্দোলন:

মোখতার সাকাফি উক্ত তারিখে আহলে বাইত (আ.)এর অনুসারিদেরকে নিয়ে “یالثارات الحسین” শ্লোগান দেয়ার মাধ্যমে কুফায় তার বিপ্লবি আন্দোলনের সূচনা করে। মোখতার সাকাফি সন ১ হিজরি তায়েফে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৭ হিজরি কুফাতে মোসআব ইবনে যুবাইরের নেতৃত্বে মসজিদে কুফার মেহরাবে শাহাদত বরণ করেন। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউস সানি, পৃষ্ঠা ২২৫- ২২৯)

 

২২শে রবিউস সানি:

মুসা মোবারকা (আ.)এর ওফাত:

হজরত মুসা মোবারকা (আ.) ছিলেন ইমাম মোহাম্মাদ তাকি (আ.)এর সন্তান। তিনি সন ২৯৬ হিজরি কুম শহরে মৃত্যুবরণ করেন। যখন তিনি কুম শহরে মৃত্যুবরণ করেন তখন কুম শহরের সুলতান ছিল আব্বাস বিন আমরু গানাভি তার জানাজার নামাজ পড়ান এবং মোহাম্মাদ বিন হাসান বিন আবি খালেদ আশআরির ঘরে তাঁকে দাফন করা হয়। (তারিখে সামেরা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩০২)

 

২৫শে রবিউস সানি:

মাবিয়া বিন এজিদ খেলাফত পরিত্যাগ:

যখন ৬৪ হিজরি ১৪ই রবিউল আওয়াল তারিখে এজিদ মারা যায় তখন মাবিয়া বিন এজিদ খেলাফতের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করে। কিন্তু খেলাফত গ্রহণের ২৫, ৩০ অথবা ৪০ দিন পরেই ২৫শে রবিউস সানি মেম্বারে আরোহণ করে খুৎবা পাঠ করে এবং তার বাবার কমকান্ডগুলোকে বর্ণনা করে এবং তার বাবা এবং তার পূর্ব পুরুষদের উপরে লানত প্রেরণ করে এবং অনেক ক্রন্দন করে। অতঃপর সে নিজেকে খেলাফত পরিত্যাগ করার কথাকে প্রচার করে। (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ৭২)

 

রবিউস সানি মাসের শেষ তারিখ:

খালিদ বিন ওয়ালিদের মৃত্যুদিবস:

রবিউস সানি মাসের শেষ তারিখে খালিদ বিন ওয়ালিদ মৃত্যুবরণ করে। সে রাসুল (সা.)এর বেসাতের ২০ বছর পরে রাসুল (সা.) এর জিবনের শেষাংশে আমরু আসের সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। হজরত আবু বকর তাকে শামের শাষক নির্বাচন করে এবং হজরত উমর তাকে পদচ্যুত করে তার কিছুদিন পরে সে হামাস নামক এলাকায় মারা যায় এবং সেখানেই তাকে দাফন করে দেয়া হয়। খালিদ বিন ওয়ালিদের অপকর্ম সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

১- সে হিজরতের রাতে রাসুল (সা.)কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছিল।

২- রাসুল (সা.)এর অনুমতি ব্যাতিত বণি নাযিরের লোকজনকে হত্যা করে।

৩- বণি সালিম গোত্রের বন্দিদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। উক্ত কারণে রাসুল (সা.) তার প্রতি অভিসম্পাত করেন।

৪- খালিদ বিন ওয়ালি আম্মারকে গালি দেয়। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন:  যে আম্মারকে গালি দিবে আল্লাহর তার প্রতি রাগান্বিত হবেন।

৫- সে হজরত আলি (আ.)কে হত্যা করার চেষ্টা করে।

৬- সে মালিক বিন নাভিরাকে হজরত আবু বকরের বাইয়াত না করার কারণে হত্যা করে এবং তার স্ত্রীর সাথে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। (সাবআতু মিনাস সালাফ, পৃষ্ঠা ৩৪৭, আস সাহিহ মিনাল সিরাহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৯, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫১, এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৮, সিরাতুল মুস্তাকিম, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৯)