ইমাম রেযা (আ.)এর কবর যিয়ারতের ফযিলত

মানুষের প্রত্যেকটি ভাল কাজের বিনিময় রয়েছে এবং তার প্রতিদান অনেকে এ ‍দুনিয়াতে আবার অনেকে পরকালে উপলব্ধি করবে। আবার এমনও অনেক সৎ কাজ রয়েছে যা মানুষেরা সম্পাদন করে কিন্তু তাদের নিয়ত বা ভুল সম্পাদনের কারণে তার পূর্ণ সওয়াব অর্জন করা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। কিন্তু

ইমাম রেযা (আ.)এর কবর যিয়ারতের ফযিলত

এস, এ, এ

 

মানুষের প্রত্যেকটি ভাল কাজের বিনিময় রয়েছে এবং তার প্রতিদান অনেকে এ ‍দুনিয়াতে আবার অনেকে পরকালে উপলব্ধি করবে। আবার এমনও অনেক সৎ কাজ রয়েছে যা মানুষেরা সম্পাদন করে কিন্তু তাদের নিয়ত বা ভুল সম্পাদনের কারণে তার পূর্ণ সওয়াব অর্জন করা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে রাসুল (সা.)’এর আহলে বাইত (আ.)’এর যিয়ারত হচ্ছে এমন একটি আমল যার বিনিময়ের নিশ্চয়তা স্বয়ং আল্লাহ, রাসুল (সা.) এবং মাসুম ইমাম (আ.)গণ দান করেছেন।

মরহুম কুলাইনি এবং সাদুক (রহ.) ইমাম রেযা (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেকটি ইমাম (আ.)’এর অনুসারি এবং ভক্তদের উপরে একটি দ্বায়িত্ব রয়েছে আর তা হচ্ছে, তারা যেন তাদের কবরে যিয়ারতের জন্য যায়। আর যদি তারা এমনটি করে তাহলে কেয়ামতের দিন ইমাম (আ.)গণ তাদের জন্য শেফায়াত করবেন। (কাফি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬৭, উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬১, মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫৯)

নিন্মে ইমাম রেযা (আ.)’এর যিয়ারত সম্পর্কিত কিছু রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হলো: 

ইমাম রেযা (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, যদি কেউ দূর থেকে আমাকে উদ্দেশ্যে করে যিয়ারত পাঠ করে তাহলে কেয়ামতের দিন আমি তাকে তিন অবস্থায় সহায়তা করবো:

১-যখন সে ভয় পাবে।

২- যখন মানুষের আমল নামাকে তার ডান অথবা বাম হাতে দেয়া হবে।

৩- পুলসিরাত অতিক্রম করার সময়। (মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫, তারিখে নিশাবুর, পৃষ্ঠা ১৯১, সিরে ইমাম রেযা, পৃষ্ঠা ১২৩, আত তাহযিব, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮৫, খেসাল, পৃষ্ঠা ১৬৭, কামেলুয যিয়ারাত, পৃষ্ঠা ৩০৪, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ৪০)

বাযানতি থেকে বর্ণিত ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন: আমার অনুসারিদের মধ্যে থেকে যে মারেফতের সহিত আমার যিয়ারত করবে কেয়ামতের দিন আমি তার শেফায়াত করবো। (মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৮৩, আমলি সাদুক, পৃষ্ঠা ১১৯)

হাসান বিন ফাযযাল ইমাম রেযা (আ.) থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: অচিরেই আমাকে বিষ দ্বারা শহিদ করা হবে এবং পরবাসি অবস্থায় আমাকে দাফন করা হবে উক্ত ভবিষ্যত বাণিটি আমার বাবা তার বাবার কাছে এবং এভাবে তিনি ইমাম আলি থেকে এবং তিনি রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। যে ব্যাক্তি আমার যিয়ারত করবে কেয়ামতের দিন স্বয়ং রাসুল (সা.), আমার পূর্ববর্তি ইমাম (আ.)গণ এবং আমি তার শেফায়াত করবো। আর যদি তার গুনাহ সকল মানুষ এবং জিন জাতির সমতুল্যও হয় তাহলেও আমাদের শাফায়াতের কারণে তার সকল গুনাহকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। (উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩, আমালি সাদুক, পৃষ্ঠা ৬১১, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ৩৫)

হারাওয়ি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা ইমাম রেযা (আ.) হারুন’এর কবরের কাছে আসে এবং স্বীয় হাত দ্বারা একটি রেখা এঁকে দিয়ে বলেন: আমাকে এখানে দাফন করা হবে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উক্ত স্থানটিকে আমার অনুসারিদের সমাগমের স্থান করে দিবেন। মহান আল্লাহর শপথ যারা আমার যিয়ারত করবে বা আমার প্রতি সালাম প্রেরণ করবে আমরা আহলে বাইত (আ.)গণ তার জন্য শেফায়াত করবো।

শেইখ সাদুক (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন একদা এক খোরাসানবাসি ইমাম রেযা (আ.)’এর কাছে এসে বলে হে রাসুল (সা.)’এর সন্তান! আমি রাসুল (সা.)কে স্বপ্নে দেখেছি তিনি আমাকে বলেন যে, যখন আমার দেহের অংশকে তোমাদের দেশে দাফন করা হবে তখন কিভাবে তার রক্ষণাবেক্ষণ করবে? তখন ইমাম রেযা (আ.) বলেন: আমিই সেই ব্যাক্তি, রাসুল (সা.)’এর দেহের অংশ,আমানত এবং উজ্জল নক্ষত্র যাকে তোমাদের দেশে দাফন করা হবে। জেনে রাখ যারাই আমার যিয়ারত করবে কেয়ামতের দিন আমার পবিত্র পূর্বপুরুষগণ এবং আমি তার শেফায়াত করবো। (মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৮৫, ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫৫৫)

হজরত শাহ আব্দুল আযিম হাসানি বলেন: আমি ইমাম হাদি (আ.) থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন: কুমবাসিদের গুনাহকে ক্ষমা করে দেয়া হবে কেননা তারা তুস শহরে আমার বাবা ইমাম আলি ইবনে মূসা(আ.)’এর যিয়ারত করতে যায়। জেনে রাখ! যদি তুস যাওয়ার পথে যদি কাউকে কোন কষ্ট সহ্য করতে হয় তাহলে তার শরিরকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেয়া হবে। (ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫৬০)

ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন: আমাকে বিষ দ্বারা নির্যাতনের মাধ্যেমে শহিদ করা হবে এবং হারুনের কবরের পাশে আমাকে দাফন করা হবে। কেয়ামতের দিন আমার কবরের যিয়ারতকারিরা সম্মান ও মর্যাদার সাথে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে। যদি আমার কোন ব্যাক্তি আমার কবরের যিয়ারতের জন্য আসে এবং পথে সে কোন কষ্টের সম্মুখিন হয় তাহলে তার জন্য জাহান্নারে আগুনকে হারাম করে দেয়া হবে। (উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৫, মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড২, পৃষ্ঠা ৫৮৫)

ইমাম জাওয়াদ (আ.) থেকে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেছেন: তুস শহরের দুটি পাহাড়ের মাঝে বেহেস্তের মাটির টুকরা রয়েছে যে সেখানে প্রবেশ করবে কেয়ামতের দিন সে জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাবে। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৬)

আলি ইবনে মাহযিয়ার ইমাম জাওয়াদ (আ.)তে জিজ্ঞাসা করেন যে, ইমাম রেযা (আ.)’এর যিয়ারত কি ইমাম হুসাইন (আ.)’এর চেয়ে বেশি ফযিলতপূর্ণ? উত্তরে তিনি বলেন: আমার বাবা ইমাম রেযা (আ.)’এর কবর যিয়ারতের বেশি ফযিলত রয়েছে। কেননা সকলেই ইমাম হুসাইন (আ.)’এর কবর যিয়ারতের জন্য যায়। কিন্তু ইমাম রেযা (আ.)’এর কবর যিয়ারতের জন্য শুধুমাত্র তার অনুসারিরা যায়।(কাফি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৪, মান লা ইয়াহযারাহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৮২, আত তাহযিব, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮৪, উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩)

অন্য একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে একদা হাসান বিন ওয়াশশা ইমাম রেযা (আ.)কে জিজ্ঞাসা করেন যে, হে ইমাম! আপনাদের যিয়ারতের বিনিময়ে আমাদেরকে কি পরিমাণ সওয়াব দান করা হবে?

ইমাম রেযা (আ.)তার উত্তরে বলেন ইমাম হুসাইন (আ.)’এর কবরের যিয়ারতের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। তখন আমি ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলাম যদি কেউ ইমাম হুসাইন (আ.)’এর যিয়ারত করে তাহলে তাকে কি পরিমাণ সওয়াব দান করা হবে?

ইমাম (আ.) বলেন: সেই পবিত্র স্বত্তার শপথ তাকে জান্নাত দান করা হবে। (জামে হাদিস আশ শিয়া, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৯১, মুসতাদরাকে ওসায়েল, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৮৩)

আব্দুর রহমান বিন মুসলিম ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যদি কেউ আমাদের মৃত্যুর পরে আমাদের কবরের যিয়ারত করে তাহলে তাকে আমাদের জিবিত অবস্থায় যিয়ারত করার সওয়াব দান করা হবে। (জামে হাদিস আশ শিয়া, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৯২)

শেইখ তুসি (রহ.) ইমাম রেযা (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: খোরাসানে একটি মাজার তৈরি হবে যেখানে কেয়ামত পর্যন্ত লোকজন তার যিয়ারতের জন্য আসবে এবং ফেরেস্তারা উক্ত কবরের চারিপাশে ঘুরতে থাকবে।

ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করা হয় হে রাসুল (সা.)’এর সন্তান! উক্ত কবরটি খোরাসানের কোথায় রয়েছে? তিনি বলেন তুস নামক স্থানে। মহান আল্লাহর শপথ উক্ত স্থানটি হচ্ছে বেহেস্তের একটি বাগানের ন্যায়।  যারা আমার উক্ত কবরের যিয়ারত করবে তার উদাহরণ হচ্ছে যে সে রাসুল (সা.)’এর যিয়ারত করলো এবং তাকে উক্ত যিয়ারতের বিনিময়ে তাকে এক হাজার কবুল হজ, এক হাজার উমরা হজের সওয়াব দান করা হবে এবং আমি ও আমার পূর্বপুরুষগণ কেয়ামতের দিন তার জন্য শেফায়াত করবো। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ৩৩, ৩৬৭)

বাযানতি (রহ.) বর্ণনা করেন যে, ইমাম রেযা (আ.) তাঁর এক খাদেমকে চিঠি লিখেন যে, আমার অনুসারিদেরকে বলো আমার কবরের যিয়ারত করলে তাকে এক হাজার হজের সওয়াব দান করা হবে।

বাযানতি বলেন আমি আশ্চর্যিত হয়ে ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলাম হাজার হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে? ইমাম জাওয়াদ (আ.) বলেন: মহান আল্লাহর শপথ যদি কেউ মারেফতের সহিত তার যিয়ারত করে তাহলে তাকে এক হাজার সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। (মান লা ইযারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৯, আত তাহযিব, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮৫, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ৩৩)

ইমাম মূসা কাযিম (আ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন: যদি কেউ আমার সন্তান ইমাম রেযা (আ.)’এর কবরের যিয়ারত করে তাহলে তাকে ৭০ কবুল হজের সওয়াব দান করা হবে।

মাযানি বলেন: আমি আশ্চর্যিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ৭০ হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে? ইমাম (আ.) বলেন ৭০ হাজার হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলাম ৭০ হাজার হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে? ইমাম (আ.) বলেন হ্যাঁ! কেননা অনেকেরই হজ কবুল হয় না। যদি কেউ আমার সন্তানের যিয়ারত করে এবং এক রাত সেখানে অতিবাহিত করে তাহলে তার অবস্থা হবে এমন যে সে আল্লাহর আরশের নিচে অবস্থান করছে। (কাফি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৮৫, আত তাহযিব, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮৫, বিহারুল আওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ৪৩)

উল্লেখিত রেওয়ায়েত সমূহে যিয়ারতের বিভিন্নভাবে সওয়াব বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে রেওয়ায়েতগুলো অসামন্জস্যপূর্ণ না। কেননা ইমাম কাযিম, রেযা এবং জাওয়াদ (আ.)’এর কাছের শ্রোতাদের সকলের মারেফত এক স্তরের ছিল না। আর এ কারণে উক্ত তারতম্যটি পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেকে উক্ত সওয়াবের কথা শুনে অতিব আশ্চর্যিত হয়ে পড়েছিল। আর উক্ত রেওয়ায়েত সমূহের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে ছিল যেন সে যুগের মুসলমানরা ইমাম (আ.)’এর মারেফত অর্জন করতে পারে।