আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে ইমাম রেযা (আ.)

আহলে সুন্নাতের অনেক বিজ্ঞ আলেমগণ নবী, আউলিয়া, সালেহিন এবং মুমিন বান্দাদের কবর যিয়ারতে কোন রকমের বাধা দান করেননি। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মাথা ব্যাথা হচ্ছে ওহাবি বা সালাফিদের।

আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে ইমাম রেযা (আ.)

এস, এ, এ

আহলে সুন্নাতের অনেক বিজ্ঞ আলেমগণ নবী, আউলিয়া, সালেহিন এবং মুমিন বান্দাদের কবর যিয়ারতে কোন রকমের বাধা দান করেননি। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মাথা ব্যাথা হচ্ছে ওহাবি বা সালাফিদের। আহলে সুন্নাত মতাদর্শের অনুসারিগণ সাহাবি, আয়েম্মা, তাবেয়িন এবং তাবে তাবেঈনদের কবর যিয়ারত করে থাকেন। এমনকি তাদেরকে ওসিলা করে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়াও চেয়ে থাকেন।

ইমাম রেযা (আ.)’এর যিয়ারত সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের দৃষ্টি ভঙ্গিকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।

প্রথম ভাগ: আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন বিশ্বস্ত গ্রন্থ সমূহে ইমাম রেযা (আ.)’এর যিয়ারত সম্পর্কে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে।

হজরত আয়েশা  থেকে বর্নিত হয়েছে যে, একদা রাসুল (সা.) বলেন: আমার সন্তানকে যে তুস শহরে যিয়ারত করবে তাহলে তাকে একবার হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। হজরত আয়েশা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন এক হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। রাসুল (সা.) বলেন: দুই হজ সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। হজরত আয়েশা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন দুই হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। রাসুল (সা.) বলেন: তিন হজ সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। হজরত আয়েশা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন তিন হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। একথা শুনে তিনি নিরবতা অবলম্বন করেন। রাসুল (সা.) বলেন: যদি তুমি নিরবতা অবলম্বন না করতে তাহলে আমি সত্তরটি হজের সমপরিমাণ পর্যন্ত সওয়াবের কথা বর্ণনা করতাম। (এহকাকুল হাক, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ২৫২)

হামাওয়াইনি ফাযযাল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন যে, আমি ইমাম রেযা (আ.) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন যে, একদা এক ব্যাক্তি তাঁর কাছে আসে এবং তাঁকে বলে যে, হে ইমাম! আমি স্বপ্নে রাসুল (সা.) কে দেখেছি তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, তোমরা থাকতে কিভাবে আমার দেহের অংশকে তোমাদের দেশে দাফন করা হবে এবং যখন আমার শরিরের একটি অংশকে মাটির নিচে ঢেকে দেয়া হবে তখন তুমি কিভাবে তাঁকে রক্ষা করবে। ইমাম রেযা (আ.) তার জবাবে বলেন: আমিই হচ্ছে সেই ব্যাক্তি এবং রাসুল (সা.)’এর সেই দেহের টুকরা এবং আমানত যাকে তোমাদের দেশে দাফন করা হবে। যে ব্যাক্তি পূর্ণ মারেফতের সহিত আমার যিয়ারত করবে। কেয়ামতের দিন আমি  এবং আমার পূর্বপুরুষগণ তার শেফায়াত করবো। উক্ত দিনে আমরা যার শেফায়াত করবো সে পরিত্রাণ অর্জন করবে।

সৈয়দ আলি বিন শাহাবুদ্দিন হামেদানি রাসুল (সা.) বর্ণনা করছেন যে, তিনি বলেছেন: অচিরেই আমার দেহের অংশকে খোরাসানে দাফন করা হবে। যে বিপদগ্রস্থ ব্যাক্তি তার যিয়ারতের জন্য যাবে মহান আল্লাহ তায়ালা তার দুঃখ-দুর্দশাকে দূর করে দিবেন এবং যে তার যিয়ারত করবে আল্লাহ তার গুনাহ সমূহকে ক্ষমা করে দিবেন। (মোয়াদ্দাতুল কুরবা, পৃষ্ঠা ১৪০, ইয়ানাবিউল মোয়াদ্দাত, পৃষ্ঠা ২৫৬)

অচিরেই আমার দেহের টুকরাকে খোরাসানের মাটিতে দাফন করা হবে, যে মুমিন বান্দা তার যিয়ারত করবে আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসি করবেন এবং জাহান্নামের আগুনকে তার জন্য হারাম করে দিবেন। (ফারায়েদুস সেমাতাইন, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮৮)

অন্য এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সা.) হজরত আয়েশাকে বলেন: যে তুস নগরিতে আমার সন্তান আলি ইবনে মুসা রেযা (আ.)’এর যিয়ারত করবে তাকে কয়েকবার হজের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে।

দ্বিতিয় ভাগ: আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন আলেমদের দৃষ্টিতে ইমাম রেয়া (আ.):

আহলে সুন্নাতের মতাদর্শের অনুসারিগণ রাসুল (সা.)’এর আহলে বাইত (আ.)দেরকে যথেষ্ট পরিমাণ সম্মান করে থাকেন। একাধিকবার দেখা গেছে যে, আহলে সুন্নাতের বিজ্ঞ আলেমগণ রাসুল (সা.)’এর আহলে বাইত এবং মাসুম ইমাম (আ.)দের উসিলা দিয়ে দোয়া করতেন, তাদেরকে অত্যান্ত ভালবাসতেন, তাদের যিয়ারতের জন্য যেতেন এবং তাদের গুণগান করতেন।

এক্ষেত্রে আমরা আহলে সুন্নাতের একজন ইমাম যার নাম হচ্ছে ইমাম শাফেয়ি। তিনি আহলে বাইতের ভালবাসায় একটি কবিতা লিখেছিলেন এবং তাঁর উক্ত কবিতাটি আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি তার সাওয়ায়েকুল মোহরেকা নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:

آلالنبــیذریعـتیوهُمإلیـهوسیلــتی
ارجوبهمأعطیغدابیدیالیمینصحیفتی

রাসুল (সা.)’এর আল হচ্ছেন আল্লাহ এবং আমার মাঝে মাধ্যেম স্বরূপ।

আশা করি তাদের উসিলার কারণে কেয়ামতে আমার আমল নামা আমার ডান হাতে দেয়া হবে।(সাওয়ায়েকুল মোহরেকা, পৃষ্ঠা ২৯, ইয়ানাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৮)

খতিবে বাগদাদি তার গ্রন্থ “তারিখে বাগদাদে” উল্লেখ করেছেন যে, আবু আলি খালাল, শেইখ হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন আমি যখনই কোন সমস্যায় পতিত হতাম। তখন হজরত আলি ইবনে মূসা রেযা (আ.)’এর যিয়ারত করার জন্য যেতাম। যখন আমি তাঁর উসিলা দিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া চাইতাম তখন আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। (তারিখে বাগদাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২০)

আবু হাতেম মোহাম্মাদ বিন হাবান তার “আল সেকাত” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আলি ইবনে মূসা রেযা হচ্ছেন একজন বিজ্ঞ, সম্মানিত এবং আহলে বাইত (আ.)ও বণি হাশিমের একজন সদস্য। আমি অনেকবার তাঁর কবরের যিয়ারত করেছি। আমি যখন তুসে জিবন যাপন করতাম এবং কোন ধরণের সমস্যায় পড়তাম। তখন আমি তাঁর যিয়ারত করতে যেতাম এবং সেখানে নবী (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)’এর উপরে দুরুদ প্রেরণ করতাম। তখন আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। উক্ত বিষয়টি আমার কাছে একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। আর এ কারণে আমি দোয়া করি, যেন মহান আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)’এর ভালবাসায় আামাকে মৃত্যু দান করেন। (আস সেকাত, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৫৬- ৪৫৭)

হাসান বিন আহমাদ মাহলাবি ইমাম রেযা (আ.)’এর ব্যাক্তিত্ব, গুণাবলি এবং খোরাসানের নোওগান নামক একটি শহর সম্পর্কে বলেন: নোওগান হচ্ছে খোরাসানের গুরুত্বপূর্ণ শহর সমূহের মধ্যে একটি। উক্ত শহরে ইমাম রেযা (আ.)’এর কবর রয়েছে। (ওয়াসিলাতুল খাদেম ইলাল মাখদুম, পৃষ্ঠা ২৪২, ২৪৩)

হাকেম নিশাবুরি বলেছেন: আমি আবা বাকর মোহাম্মাদ বিন মোয়াম্মেল থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: একদা আমি আহলে হাদিসের নেতা আবু বকর বিন খাযিমা এবং আবু আলি সাকাফি সহ অন্যান্য নেতাদেরকে দেখেছি যে তারা ইমাম আলি ইবনে রেযা (আ.)’এর কবর যিয়ারত করার জন্য যেতেন এবং সেখানে ক্রন্দন করতেন এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে তার ওসিলা দিয়ে দোয়া চাইতেন। (মুসনাদে ইমাম রেযা (আ.), খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২২)

মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ ইবনে বাতুতা তার ভ্রমণ ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন যে, যখন তিনি মাশহাদে ইমাম রেযা (আ.)’এর মাজারের কাছে পৌছান তখন তিনি এভাবে বর্ণনা করেন যে, আমি যখন মাশহাদে পৌছায় তখন আমি সেখানে ইমাম আলি বিন ‍মূসা বিন জাফর বিন মোহাম্মাদ বিন আলি বিন হুসাইন বিন আলি বিন আবি তালিব (আ.)’এর রওযা যিয়ারত করতে যায়। তিনি ছিলেন একজন মহান ব্যাক্তিত্ব তার মাজারের গম্বুজ ছিল বিশাল এবং অতি নিপুণ কারুকাজ দ্বারা সুসজ্জিত, তার দেয়ালগুলোতে ছিল কাঁচের কাজ করা। তাঁর কবরের উপরে কাঠের বাক্স রাখা ছিল যাতে রুপা দ্বারা কাজ করা ছিল। এভাবে তিনি ইমাম রেযা (আ.)’এর রওযার বর্ণনা দিয়েছেন। লোকজন যখন তাঁর কবরের যিয়ারতের জন্য আসতো তখন বিনয় এবং ভদ্রতার সহিত তাঁর কবরকে উদ্দেশ্যে করে সালাম করতো। (ফাসল নামে কাউসার, পৃষ্ঠা ৪০১)

আতাউল্লাহ বিন ফাযলুল্লাহ সিরাযি বলেছেন: ইমাম আলি রেযা (আ.) লোকজনের সাথে তাদের ভঅষাতে কথা বলতেন। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানি এবং অতিভদ্র ব্যাক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন শ্রেণির লোক বিভিন্ন দেশ থেকে তার মাজারের যিয়ারত করার জন্য আসতো।(রওযাতুল আহবাব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৩, তারিখে আহমাদি, পৃষ্ঠা ৩৬)

এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাক্তিত্বগণ ইমাম রেযা (আ.) সম্পর্কে তাদের মন্তব্যকে বিভিন্ন প্রন্থে উল্লেখ করেছেন। নিন্মে তাদের এবং গ্রন্থের নামকে উল্লেখ করা হলো:

-  

মির মোহাম্মাদ বিন সৈয়দ বুরহান উদ্দিন খোদাওয়ান্দ শাহ।

-  

কাজি মোহাম্মাদ প্রসিদ্ধ হচ্ছে বাহলুল বাহজাত আফনাদি।

-  

গিয়াসুদ্দিন বিন হাম্মাম উদ্দিন শাফেয়ি।

-  

ফাযলুল্লাহ বিন রুযবাহান খুন্জি হানাফি। (মুলহেকাত আহকাকুল হাক, পৃষ্ঠা ২৩৬)

-  

ইবনে এমাদ দামেস্কি হাম্বালি। (মুসনাদে ইমাম রেযা (আ.), খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২২)

-  

যাহাবি। (সিরা আলামিন নোবালা, খন্ড ৯, পৃষ্ঠঅ ৩৯৩)

ইমাম রেযা (আ.) সম্পর্কে উক্ত বিজ্ঞ আলেমদের মতামত থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনি শুধুমাত্র শিয়াদের কাছেই সম্মানিত ব্যাক্তি ছিলেন না বরং তিনি আহলে সুন্নাতের আলেমদের কাছেও ছিলেন সম্মানিত এবং শ্রদ্ধার পাত্র।