জাফর-এ কাযযাবের শেষ পরিণতি

দুঃখজনক হলেও সত্য যে জাফরে কাযযাব ইমাম হাদী (আ.)এর সন্তান হলেও তার অবস্থা ছিল নূহ (আ.)এর সন্তানের ন্যায়। সে তার যুগে “আবুল কারায়েন” নামে সুপরিচিত ছিল। সে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে ইমামতের দাবী করেছিল। কিন্তু ইমাম মাহদী (আ.)এর উপস্থিতির কারণে ত

জাফর-এ কাযযাবের শেষ পরিণতি

এস, এ, এ

দুঃখজনক হলেও সত্য যে জাফরে কাযযাব ইমাম হাদী (আ.)এর সন্তান হলেও তার অবস্থা ছিল নূহ (আ.)এর সন্তানের ন্যায়। সে তার যুগে “আবুল কারায়েন” নামে সুপরিচিত ছিল। সে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে ইমামতের দাবী করেছিল। কিন্তু ইমাম মাহদী (আ.)এর উপস্থিতির কারণে তার দাবী মিথ্যারূপে প্রমাণিত হয় এবং ইতিহাস তার কপালে মিথ্যাবাদির মোহর লাগিয়ে দেয়।

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) রাসুল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: যখন আমার সন্তান জাফর বিন মোহাম্মাদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন আলী আবি তালিব জন্মগ্রহণ করবে তার নাম রাখবে জাফর। কেননা তার পঞ্চম বংশধরে একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম হবে জাফর। সে আল্লাহর তায়ালার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিবে এবং ইমামতের দাবী করবে! সে আল্লাহর কাছে জাফরে কাযযাব এবং অপবাদদানকারী রূপে পরিচিত হবে। তার যোগ্যতা না থাকার পরেও  সে এক ঐশী পদের দাবী করবে। সে তার পিতার অবাধ্যতা করবে এবং নিজের ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করবে এবং যখন আল্লাহর ওয়ালী অন্তর্ধানে চলে যাবে তখন সে তা প্রকাশ করার চেষ্টা করবে।  

নিঃসন্দেহে জাফরে কাযযাবের বিচ্যুতি কারণ সামাজিক অবস্থা এবং তার পিতার অবহেলা এবং লালন পালন ছিল না। বরং এক শ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ লোকজনের সাহচর্য্যর কারণে সে জাফরে কাযযাবে পরিণত হয়। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে দুর্নীতিপরায়ণ লোকজনের সাহচর্য্য মানুষের উপরে খারাপ প্রভাব ফেলে।

শাইখ সাদুক্ব (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, মোহাম্মাদ বিন হাসিম ওরফে সায়াবা-এর কন্যা ফাতিমা বলেন: ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.)এর সন্তান জাফর জন্মগ্রহণের সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। যখন জাফর জন্মগ্রহণ করে তখন ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.) ব্যাতিত সকলেই খুশি হয়েছিল। আমি ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করি হে ইমাম (আ.)! এ সন্তানের জন্মগ্রহণের পরেও কেন আপনি আনন্দিত হননি?!  কেন আপনি দুঃখভারাক্রান্ত?! ইমাম (আ.) বলেন: হয়তো তোমার কাছে বিষয়টা সহজ কিন্তু অচীরেই এ সন্তান মুসলমানদের এক বিশাল অংশকে বিভ্রান্ত করবে।

হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে জাফরে কাযযাবের পথভ্রষ্টতা ইমাম পরিলক্ষিত হয়। শাইখ সাদুক্ব (রহ.) উক্ত ঘটনাবলীকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আলী ইবনে সানান মোসাল্লা বলেছেন: আমার পিতা আমাকে বলেছেন: কুম এবং বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকার লোকজন যারা বিভিন্ন তহবিল এবং সম্পদসমূহ ইমামের কাছে নিয়ে আসতো তারা আমাদের ইমাম আবু মোহাম্মাদ হাসান বিন আলী (আ.) শাহাদতের খবর সম্পর্কে অবগত ছিল না। যখন তারা সামেরায় পৌছায় এবং ইমামের শাহাদতের খবর সম্পর্কে অবগত হয়। তারা লোকজনকে ইমামের ওয়ারিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জাফরে কাযযাবের কথা বলে। তারা এটাও বলে যে, সে চিত্তবিনোদনের জন্য বাহিরে গেছে, সে মদ পান করে এবং গায়েনদের সাথে উঠাবসা করে। উক্ত কথা শোনার পরে তারা একে অপরের সাথে আলোচনা করে এবং বলে যে, ইমাম (আ.) কখন এমন গুণাবলির অধিকারী হতে পারে না। তাদের মধ্যে কিছু লোক বলে চল আমরা ফিরে যায় এবং যাদের সম্পদ তাদেরকে ফেরত দিয়ে দেই। তখন আবুল আব্বাস মোহাম্মাদ বিন জাফর হুমাইররী কুম্মী বলে: অপেক্ষা কর যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। আমরা তাকে পরীক্ষা করবো।

রাভী বলেন: যখন জাফরে কাযযাব সফর থেকে ফিরে আসে তখন তারা জফরের সমীপে উপস্থিত হয়ে তাকে সালামা জানায় এবং তাকে বলে: হে আমাদের নেতা! আমরা কুমবাসী এবং আমদের সাথে অন্যান্য স্থানের শিয়ারাও রয়েছে। আমরা আবু মোহাম্মাদ হাসান বিন আলী (আ.)এর জন্য বিভিন্ন তহবিল ও সম্পদ নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখঅনে এসে শুনতে পাই যে, তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। জাফর বলে: সেই সম্পদগুলো কোথায়? তারা বলে আমাদের কাছে রয়েছে। জাফর বলে সেগুলো আমার কাছে নিয়ে আস। তারা বলে উক্ত সম্পদগুলোর একটি কাহিনী রয়েছে। জাফর জিজ্ঞাসা করে কি কাহিনী? তারা বলে উক্ত সম্পদগুলো হচ্ছে সাধারণ মানুষের তারা তাদের সাধ্যমতো এক দরিহাম দুই দিরহাম করে দিয়েছে এবং সেগুলোকে একটি ব্যাগে ভরে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। যখন আমরা উক্ত ব্যাগটি ইমাম (আ.)এর কাছে নিয়ে আসতাম তখন তিনি দানকারী ব্যাক্তির নামসহ কোনটি তার সম্পদ তা বলে দিতেন। তখন জাফর তাদেরকে বলে তোমরা আমার ভাই সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলছো। কেননা এটা হচ্ছে ইলমে গায়ব যা  শুধুমাত্র আল্লাহ ব্যাতিত আর কেউ বলতে পারে না।

রাভী বলে: তারা জাফরের কাথা শোনার পরে একে অপরের পতি দৃষ্টিপাত করতে থাকে! তখন জাফর তাদেরকে বলে কোথায় সম্পদগুলো আমার কাছে নিয়ে আস। আমরাই হচ্ছি উক্ত সম্পদ সমূহের প্রকৃত অধিকারী। তারা জাফরকে বলে তুমি যদি ইমাম হও তাহলে বিষয়টি আমাদের কাছে প্রমাণ কর। তানাহলে উক্ত সম্পদের এক দিরহামও তুমি পাবে না এবং আমরা সম্পদের মালিকদের আমানত তাদেরকে ফিরিয়ে দিব।

রাভী বলে:জাফর সামেরার খলিফার কাছে তাদেরকে নিয়ে যায়। খলিফা তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বলে: তোমরা সম্পদগুলো জাফরকে দিয়ে দাও। তারা বলে আমরা এত সহজেই সম্পদগুলো তাকে দিতে পারিনা যতক্ষণ না সে আমাদের কাছে কাছে তার ইমাম হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করবে।

খলিফ তাদেরকে বলে:তোমরা কিরূপ প্রমাণের আশাবাদী? তারা বলে ইমাম (আ.) অর্থের পরিমাণ এবং প্রদানকারীর বর্ণনা দিতেন। অতঃপর আমরা সম্পদগুলো তাঁকে প্রদান করতাম। আমরা একাধিকবার তাঁর কাছে এসেছি এবং তিনি আমাদের সাথে অনুরূপ ব্যাবহার করতেন। যদি ইনি প্রকৃত ইমাম হয়ে থাকেন তাহলে তাঁর ভাইয়ের ন্যায় অর্থের পরিমাণ এবং প্রদানকারীর নাম উল্লেখ করেন। আমরা তাকে অর্থ দিয়ে ফিরে যাব।

জাফর খলিফাকে বলে: হে আমীরুল মুমিনিন! তারা আমার ভাই সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলছে। কেননা এটা হচ্ছে অদৃশ্যের জ্ঞান। খলিফা জাফরকে বলে এরা হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধি। খলিফার কথায় জাফর দোদুল্যমান অবস্থায় পড়ে যায় এবং কোন জবাব দিতে পারে না। তারা খলিফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শহরের বাহিরে চলে আসে। তখন একজন দাশ তাদের নাম উল্লেখ করে ডাকে তখন তারা উক্ত দাশকে জিজ্ঞাসা করে তুমিই কি তাহলে ইমাম? দাশটি তাদেরকে বলে আমি তোমাদের মওলার দাশ। তোমরা কি তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে চাও না। তখন তারা উক্ত দাশের সাথে রওনা হয়। অবশেষে আমরা ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর সমীপে উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম জানায়। আমরা সেখানে ইমাম মাহদী (আ.)এর সাথে সাক্ষাত করি। অতঃপর তিনি আমাদেরকে বলেন: তাদের ব্যাগে কত দিনার রয়েছে এবং তা কারা দান করেছে। আমরা ইমাম হাসান আসকারী (আ.)কে তহবিল হস্তান্তর করে কুমে ফিরে আসার অনুমতি চাইলে তিনি আবুল আব্বাস মোহাম্মাদ বিন জাফরকে একটি কাফন এবং হুনুত প্রদান করেন। আমরা ফিরে আসার সময় হামেদানে পৌছানোর পরে আবুল আব্বাস মারা যায়। আমরা তাকে ইমামের দেয়া কাফন পরিয়ে দাফন করে দেই। তারপর থেকে আমরা ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর কাছে জনগণের দেয়া সম্পদগুলো ইমামের কাছে পৌঁছে দিতাম।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে জাফর খলিফাকে বিশ হাজার দিরহাম দিয়ে বলে: আপনি আমাকে আমার ভাইয়ের পরে ইমাম রূপে স্বীকৃতি প্রদান করুন। তখন খলিফা তাকে বলে: তুমি যদি তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর ন্যায় মর্যাদার অধিকারী হও তাহলে আমার স্বীকৃতির আর প্রয়োজন নাই। আর যদি এমনটি না হয় তাহলে আমার এক্ষেত্রে কিছুই  করার নেই।

 

ইমামতের পদের আকাঙ্খায় জাফর কাযযাব:

জাফর কাযযাব ইমামতের পদ অর্জনের জন্য একাধিক পন্থা অবলম্বন করে।

১- নিজেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর স্থলাভিষিক্ত রূপে জনগণের কাছে উপস্থাপন করে।

২- ইমামের জানাযার নামাজ পড়ানোর জন্য উপস্থিত হয়।

৩- খলিফার স্মরণাপন্ন হয় যেন সে তাকে ইমামরূপে স্বীকৃতি প্রদান করে।

 

উত্তেজনা সৃষ্টিকারী জাফরে কাযযাব:

জাফরে কাযযাব যখন দেখতে পায় যে ইমাম মাহদী (আ.) ইমাম হাসান আসকারী (আ.) জানাযার নামাজ পড়ানোর জন্য উপস্থিত হয়েছে। তখন সে তার প্রকৃত চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং রাষ্ট্রে উত্তেজনা সৃষ্টির লক্ষ্যে খলিফাকে ইমাম মাহদী (আ.)এর উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত করে। খলিফা হাসান আসকারী (আ.)এর ঘরে অনুসন্ধান চালানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু তার পূর্বেই ইমাম মাহদী (আ.) আল্লাহর নির্দেশে অন্তর্ধানে চলে যান।

 

জাফরে কাযাবের শেষ পরিণতি:

শিয়া বর্ণনামতে জাফরে কাযাবের শেষ পরিণতি সম্পর্কে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে:

১- জাফরে কাযযাব তার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইমামতের মিথ্যা দাবী করে বেড়াতো।

২- আবার কারো মতে সে ইমামতের মিথ্যা দাবী করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং অবশেষে সে তওবা করে। শিয়ারা তার নাম পরিবর্তন করে রাখে জাফরে তায়েব (তওবাকারী জাফর)।

শাইখ কুলাইনী (রহ.) মোহাম্মাদ বিন উসমান আমরী হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: ইমাম মাহদী (আ.) তাঁর এক চিঠিতে জাফর সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে জাফরের অবস্থা হচ্ছে হজরত ইউসুফ (আ.)এর ভাইদের ন্যায় যারা অবশেষে তওবা করেছিল এবং তাদের তওবা কবুল করা হয়েছিল।

 

জাফরের সন্তান সন্ততি:

ইতিহসের বর্ণনামতে জাফরের তিনটি সন্তান ছিল। দুইজন ছেলে ইয়াহিয়া ও ইব্রাহিম এবং একজন মেয়ে যার নাম ছিল বারিহা। বারিহা ছিল একজন অনুগ্রহশীল নারী। ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.)এর নাতী মোহাম্মাদ বিন মূসা মোবারাকা বারিহাকে বিবাহ করেন।বারিহা কুম নগরীতে মৃত্যু বরণ করেন। বর্তমানে অবস্থিত মূসা মোবারাকার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

ইব্রাহিম কুম থেকে চলে যায় এবং ইয়াহিয়া হামযা বিন মূসা ইবনে জাফরের কবরের কাছে জীবনযাপন শুরু করে।তিনি আমীন উদ্দিন আবুল কাশেম বিন মাহযিয়ার এর কন্যা শাহরবানাভিয়ে কে বিবাহ করেন। তার থেকে তিনটি সন্তান তথা: আবু জাফর, ফাখরুল ইরাক্ব এবং সাতিইয়া জন্মগ্রহণ করে। উক্ত তিন সন্তান হতে অধিক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এ কারণে তাদেরকে “সাওফিইয়া” নামকরণ করা হয়। তাদের মধ্যে অনেকই আলেম, কোরআনের হাফেয এবং কুলক্রমজ্ঞ রূপে পরিচিতি অর্জন করেন।

 

তথ্যসূত্র:

১- তামামুন নেয়ামা, খন্ড ১, অধ্যায় ১, হাদীস নং ২, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২১, খন্ড ২, অধ্যায় ৪৩, হাদীস নং ২৬, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮৩, হাদীস নং ৪।

২- পেযুহিস দার যিন্দেগী ইমাম মাহদী (আ.), পৃষ্ঠা ২৪৭।

৩- আল গ্বিবা, পৃষ্ঠা ২৯০, পৃষ্ঠা ২৮৯, হাদীস নং ২১।

৪-মুন্তাহিুল আমাল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬১।

৫- দায়েরাতুল মাআরেফ তাশাইয়ু, খন্ড ৫।

৬- তারিখে কুম, পৃষ্ঠা ৫৮৩।

৭- আল শাজারাতুল মোবারাকা ফি আনসাবুত তালিবিয়া, পৃষ্ঠা ৯২।

৮- কুমুল মোকাদ্দেসা