ঈদে যাহরা বা “উমর কুশি” উৎযাপনের ইতিহাস

ঈদ মানুষের জীবনে নিয়ে আসে অনাবিল আনন্দ। আর সেই ঈদকে কেন্দ্র করে সকল মুমিনরা এক স্থানে সকল ভেদাভেদকে ভুলে একত্রিত হয় এবং তাদের ঈমানী খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তেমননি একটি ঈদের নাম ঈদের যাহরা। যা সকল মুসলমানদের উৎযাপন করা উচিত। কিন্তু শুধুমাত্র আহলে বাইত (আ.)এ

ঈদে যাহরা বা উমর কুশি উৎযাপনের ইতিহাস

এস, এ, এ

 

ঈদ মানুষের জীবনে নিয়ে আসে অনাবিল আনন্দ। আর সেই ঈদকে কেন্দ্র করে সকল মুমিনরা এক স্থানে সকল ভেদাভেদকে ভুলে একত্রিত হয় এবং তাদের ঈমানী খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তেমনি একটি ঈদের নাম ঈদের যাহরা। যা সকল মুসলমানদের উৎযাপন করা উচিত। কিন্তু শুধুমাত্র আহলে বাইত (আ.)এর অনুসারীরাই তা উৎযাপন করে থাকেন।

 

ঈদের যাহরা বা উমর কুশি নিয়ে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে কেউ বলেন: উক্ত ঈদটি উৎযাপন করা ঠিক না, আবার কারো মতে কোন অসুবিধা নাই। আর তাই ঈদে যাহরা উৎযাপনের কারণ তার ইতিহাস সম্পর্কে আজকে আমরা আলোচনা করবো।

 

ঈদে যাহরা সম্পর্কে ভুল চিন্তাধারার অপনোদন:

প্রকৃত পক্ষে ঈদে যাহরা আহলে বাইত (আ.)দের শত্রুদের বিনাশকে কেন্দ্র করে উৎযাপন করা হয়ে থাকে এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন। সুতরাং উক্ত ঈদে ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামত সম্পর্কে আমাদের বেশী আলোচনা করা উচিত। যেন উক্ত মাহফিল দ্বারা আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ইমাম (আ.)এর ফযিলত ও তাঁদের ইমামত সম্পর্কে আরো বেশী অবগত হতে পারি।

 

আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হাসান মুস্তাফাভি যিনি একজন কোরআন ও নৈতিকতার ওস্তাদ। তিনি উক্ত ঈদকে কেন্দ্র করে উৎযাপিত অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলেছেন: ঈদে যাহরা বা ওমর কুশি যা আহলে বাইত (আ.)এর অনুসারীগণ উৎযাপিত করে থাকে তাদের উদ্দেশ্য উমর ইবনে খাত্তাব না বরং তাদের উদ্দেশ্যে হচ্ছে উমর ইনে সাআদ, যে ছিল কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার একজন খলনায়ক। ঘটনাক্রমে উমর ইবনে খাত্তাব এবং উমর ইবনে সাআদ দুইটি নামের মধ্যে উমর নামটি সদৃস্যপূর্ণ থাকার কারণে অনেকই মনে করেন যে আহলে বাইত (আ.)এর অনুসারীগণ হজরত উমর ইবনে খাত্তাবের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানটি উৎযাপন করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে উক্ত ধারণাটি হচ্ছে ভুল। কেননা যদি আমরা হজরত উমরের মৃত্যর ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে ইতিহাসে হজরত উমরের মৃত্যুবরণের ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত উমরের ত্বত্তাবধানে অয়োজিত কমিটির বৈঠক চলার সময় পঞ্চাশ জন সৈনিকের একটি দলকে ভবনের বাইরে পাহারা দেয়ার রাখার জন্য তিনি নিযুক্ত করেন। বৈঠক চলাকালানী সময়ে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ জানান যে, তারা উমরকে হামলা করার জন্য ব্যবহৃত ছুরিটি দেখেছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ জানান যে, তিনি হরমুজান, জাফিনা ও পিরুজকে হামলার এক রাত আগে সন্দেহজনকভাবে কিছু আলোচনা করতে দেখেন। তাকে দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং একটি ছুরি মাটিতে পড়ে যায় যা উমরের উপর হামলা করার জন্য ব্যবহৃত ছুরির অবিকল ছিল। আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর নিশ্চিত করেন যে, হামলার কয়েকদিন আগে তিনি এই ছুরিটি একবার হরমুজানের কাছে দেখেছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, মদীনায় বসবাসরত পারসিয়ানরা এই হামলার জন্য দায়ী। এতে উমরের সন্তান উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর উত্তেজিত হয়ে মদীনার পারসিয়ানদের হত্যা করতে উদ্যত হন। তিনি হরমুজান, জাফিনা ও পিরুজের মেয়েকে হত্যা করেন। মদীনাবাসীরা তাকে আরও পারসিয়ানদের হত্যা করা ক্ষেত্রে বাধা দেয়। হজরত উমর এ সংবাদ জানতে পেরে উবাইদুল্লাহকে বন্দী করার নির্দেশ দেন এবং বলেন যে, পরবর্তী খলিফা উবাইদুল্লাহর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।

আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে হিজরী ২৩ সনের ২৭ জিলহজ্জ বুধবার ৬৪৪ সালের ৩ নভেম্বর মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর ৭ নভেম্বর উসমান ইবনে আফফান তৃতীয় খলিফা হিসেবে তার উত্তরসুরি হন। দীর্ঘ আলোচনার পর বিচারে সিদ্ধান্ত হয় যে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে না এবং এর পরিবর্তে তাকে রক্তমূল্য পরিশোধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। উমরের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার সন্তানের মৃত্যুদন্ড জনসাধারণকে ক্ষিপ্ত করে তুলতে পারে এমন আশঙ্কায় উবাইদুল্লাহর শাস্তি হ্রাস পায়।

 

আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হাসান মুস্তাফাভি বলেন: ঈদে যাহরাকে কেন্দ্র করে আমাদের এমন কিছু করা বা বলা উচিত না যার ফলে মুসলমানদের মাঝে বিভেদের সৃষ্টি হয়।

অনেকে আবার মনে করেন যে, ৯ই রবিউল আওয়ালকে কেন্দ্র করে রোফেয়াল ক্বালাম নামক হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। অনেকে মনে করেন যে, হাদীসটির বিষয়বস্তু হচ্ছে উক্ত দিনটিতে কোন প্রকার কাজের গুনাহকে লিপিবদ্ধ করা হবে না। (আর যারা প্রকৃত মুমিন তারা কখনও পাপ কাজে লিপ্ত হয় না)।

অথচ পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে:

সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে। (সুরা ক্বাফ, আয়াত নং ১৮)

উল্লেখিত হাদীসটি এই আয়াতের সাথে সামন্জস্যপূর্ণ না। সুতরাং এর মূল্য কতটুকু হতে পারে তা আর বলার অবকাশ রাখে না।

অনেকে উক্ত অনুষ্ঠানে সাব (গালমন্দ করা) উচ্চারণ করে থাকেন যা মোটেও উচিত না। তবে এক্ষেত্রে আমরা বর্তমান ইসলামের শত্রুদের প্রতি লানত প্রেরণ করতে পারি।

(سب): এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে গালমন্দ করা, অবাঞ্চিত কথাবার্তা বলা, যা ইসলামের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।  لعن: এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে অভিসম্পাত করা, খোদার রহমত ও মাগফেরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য দোয়া করা।

 

৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠান আয়োজনের দর্শন:

আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হাসান মুস্তাফাভি বলেন: সন ২৬০ হিজরী ৯ই রবিউল আওয়াল হচ্ছে শিয়াদের ১২তম ইমাম ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন। কেননা ইমাম হাসান আসকারী (আ.)কে ৮ই রবিউল আওয়াল তারিখে শহীদ করা হয় এবং তাপরে ৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম মাহদী (আ.) ৫ বছর বয়সে ইমামতের পদমর্যাদায় অধিষ্টিত হন। অনেকই হয়তো চিন্তা করবেন যে, এটা কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমরা যদি ইমামতের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.) ৮ বছর বয়সে এবং ইমাম আলী নাক্বি (আ.) ৬ বছর বয়সে ইমামতের পদে আসীন হন। ইমাম রেযা (আ.) তাঁর হতে বর্ণিত রেওয়ায়েতে পবিত্র কোরআন থেকে উল্লেখ করেছেন যে, হজরত ইয়াহিয়া (আ.) ৯ বছর বয়সে এবং হজরত ঈসা (আ.) শৈশবে নবুওয়াত লাভ করেন। সুতরাং শৈশবে ইমামতের পদে আসীন হওয়া নতুন কোন বিষয় না। সুতরাং উক্ত দিনে মুমিনদের শেষ ইমামের ইমামতের প্রথম দিনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা শরীয়াগত দিক থেকে কোন সমস্যা নেই।

 

কেন উক্ত ঈদকে ঈদে যাহরা নামে অভিহিত করা হয়?

আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হাসান মুস্তাফাভি বলেন: এই ঈদকে ঈদে যাহরা নামে অভিহিত করার দুটি কারণ রয়েছে:

১- ৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম মাহদী (আ.) ইমামতের পদে আসীন হন এবং ইমামতের পৃষ্ঠপোষক হজরত ফাতিমা যাহরা (আ.)এর বংশের শেষ ইমাম যার কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছিলেন। সেই ইমামের ইমামত অর্জনের দিন।

২- হজরত ফাতিমা (সা.আ.)এর প্রাণপ্রিয় সন্তান ইমাম হুসাইন (আ.)এর হত্যাকান্ডের খলনায়ক উমর ইবনে সাআদকে এই তারিখে হত্যা করা হয়। উমরে সাআদ হজরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)এর প্রাণপ্রিয় সন্তান ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তার বংশধরকে এজিদের নির্দেশে নিঃশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিল এবং তাদের মর্মান্তিকভাবে শহীদ এবং শিশু ও নারীদেরকে বন্দি করেছিল। সে পাপী উমর ইবনে সাদের মৃত্যকে কেন্দ্র করে উক্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে খুশির অনুষ্ঠান সম্পর্কে অপপ্রচারের উৎ:

আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হাসান মুস্তাফাভি বলেন: প্রাচীনকাল থেকেই ইসলামের শত্রুরা ইসলামে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর উক্ত শত্রুরাই ৯ই রবিউল আওয়ালে এমনকিছু কাজ করে যার মাধ্যমে শিয়া ও সুন্নীর মাঝে দ্বন্দের সৃষ্টি হয়। তারা প্রচার করে যে, শিয়ারা উক্ত দিনে মুসলমানদের খলিফা হজরত উমর ইবনে খাত্তাবকে অবঞ্চিত কথার্বাতা বলে। আসলে কি তাই?  বরং শিয়ারা উমর ইবনে সাআদ যে, ইমাম হাসাইন (আ.)কে হত্যা করে এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে বন্দি করে এজিদের দরবারে উপস্থিত করেছিল। উমর ইবনে সাআদের হত্যাকে কেন্দ্র করে আনন্দ উৎযাপন বা খুশির অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।

 

কেন ৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে খুশির অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো?

অনেকের মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতে পারে যে, কেন ৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে খুশির অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো। কেউ যদি মনে করে যে, উক্ত দিনটি হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন তাহলে এক্ষেত্রে কয়েকটি মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: ৪ঠা রবিউল আওয়াল তিনি শাহাদত বরণ করেন। তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে যে তিনি ৮ই রবিউল তারিখে শাহাদত বরণ করেন এবং ৯ই রবিউল আওয়াল হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন।  ইমাম আলী (আ.) হতে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যেখানে তিনি বলেছেন: পৃথিবীর সৃষ্টিকূলের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দৃষ্টিপাত করেন এবং আমাদেরকে নির্বাচন করেন এবং আমাদের জন্য শিয়াদেরকে নির্বাচন করেন যেন তারা আমাদেরকে সাহায্যে করে, আমাদের আনন্দে আনন্দিত হয়, আমাদের দুঃখে দুঃখিত হয় এবং নিজেদের মাল ও জানকে আমাদের জন্য উৎসর্গ করে। তারা আমাদের হতে এবং আমরা তাদের হতে।

 

ঈদে যাহরা উৎযাপন সম্পর্কিত ইতিকথা:

ঈদে যাহরা প্রকৃপক্ষে মুমিনদের জন্য একটি খুশির দিন কেননা উক্ত দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)এর  হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী উমর ইবনে সাআদকে হত্যা করা হয় এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন। বিভিন্ন মারাজা-এ তাক্বলিদ এবং আলেমগণ উক্ত অনুষ্ঠানে কোন প্রকারের অবাঞ্চিত কথাবার্তা এবং আচরণ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। সুতরাং আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন ইসলামের শত্রুরা উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে যেন কোন প্রকারের ষড়যন্ত্র করতে না পারে। উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কোন কথাবার্তা বলা বা আচরণ করা উচিত না যাতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়।

 

তথ্যসূত্র:

১- মেসবাহে কাফআমী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৩।

২- বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫০, পৃষ্ঠা ৩৩১, ৩৩৫, খন্ড ৫২, পৃষ্ঠা ১৬, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ২৮৭।

৩- মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৮- ২৯।

৪- কামাল উদ্দিন, শাইখ সাদুক্ব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭৩।

৫- আল গ্বিবা, পৃষ্ঠা ২৭৩।

৬- যাদুল মাআদ, অধ্যায় ৮, পৃষ্ঠা ২২৫।

৭- যাওয়ায়েদুল ফাওয়ায়েদ,  অধ্যায় রবিউল আওয়াল।