ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ও সমাজ সংস্কার

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর যুগটি ছিল আব্বাসিয় খেলাফতের কঠোরতম যুগ। কেননা সে যুগের তথাকথিত খলিফা তার গোয়েন্দা এবং আমলাদেরকে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর বিরুদ্ধে কড়া নজরদারি করার নির্দেশ দান করেছিল। যেন কোন ভাবেই ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মুসলিম উম্মাহর কোন প্রকা

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ও সমাজ সংস্কার

ইমাম হাসান আসকারি, হাসান আসকারি, সামেরা, খলিফা, খেলাফত, আহমাদ বিন ইসহাক, আবু হাশেম দাউদ বিন কাসেম জাফরি, আব্দুল্লাহ বিন জাফর হুমাইরি, আবু আমরু উসমান বিন সাঈদ আমরি, আলি বিনন জাফর, মোহাম্মাদ বিন হাসান সাফফার

এস, এ, এ

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর যুগটি ছিল আব্বাসিয় খেলাফতের কঠোরতম যুগ। কেননা সে যুগের তথাকথিত খলিফা তার গোয়েন্দা এবং আমলাদেরকে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর বিরুদ্ধে কড়া নজরদারি করার নির্দেশ দান করেছিল। যেন কোন ভাবেই ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মুসলিম উম্মাহর কোন প্রকার খেদমত করতে না পারে। আর এ সুযোগে আব্বাসিয় খলিফা মুসলিম উম্মাহকে বিভ্রান্ত এবং তাদেরকে আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে যেন ইমাম হাসান আসকারি (আ.) কোন ভাবেই সমাজ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ না করতে পারেন। কিন্তু শত প্রতিকুলতা থাকার পরেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) সমাজ সংস্কারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারের কর্মসূচি সমূহ ছিল নিন্মরূপ:

১- ছাত্রদের শিক্ষা দান:

যদিও  ইমাম হাসান আসকারি (আ.)কে রাজনৈতিক চাপের মুখে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও তিনি এমন কিছু ছাত্রদের শিক্ষা দেন যারা মুসলিম উম্মাহর ভ্রান্ত চিন্তাধারার অপনোদন এবং মুসলিম বিশ্বে আহলে বাইতের অনুসারিদের সঠিক পরিচিতি বিস্তারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভুমিকা রেখেছিলেন।  

শেইখ তুসি (রহ.) এর বর্ণনা অনুযায়ি ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর ছাত্রের সংখ্যা ১০০ জনেরও বেশি ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যাক্তিত্ববর্গ ছিলেন আহমাদ বিন ইসহাক, আবু হাশেম দাউদ বিন কাসেম জাফরি, আব্দুল্লাহ বিন জাফর হুমাইরি, আবু আমরু উসমান বিন সাঈদ আমরি, আলি বিনন জাফর, মোহাম্মাদ বিন হাসান সাফফার প্রমূখ। (সিরাহ পিসওয়ায়ান, পৃষ্ঠা ৬২৭, রেজালে শেইখ তুসি, পৃষ্ঠা ৪২৭)

২- লেখকদের উৎসাহিতকরণ:

প্রত্যেক যুগের ইমাম (আ.)দের ন্যায় ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ছাত্র প্রতিপালনের সাথে লেখকদের  উৎসাহিতকরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভুমিকা রাখেছিলেন। দাউদ বিন কাসেম জাফারি বলেন: ‘ইউনুস আল ইকতিন’ এর লিখা “ইয়াউম ওয়া লাইল” ন্মক গ্রন্থটি যখন ইমাম (আ.)এর কাছে উপস্থাপন করলাম তখন তিনি বলেন:

“اَعْطاهُ اللّهُ بِکُلِّ حَرْفٍ نُورا یَوْمَ الْقِیامَةِ”

আল্লাহ তার প্রত্যেকটি নুরানি শব্দের বিনিময় তাকে কেয়ামতের দিন প্রদান করবেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫০, রেজালে নাজ্জাশি, পৃষ্ঠা ৪৪৭)

এছাড়াও যখন ইমাম (আ.)এর কাছে বিভিন্ন লেখনি উপস্থাপন করা হতো এবং যদি তা ঠিক হতো তখন তিনি বলতেন:

“صَحیحٌ فَاعْمَلُوا به”

তা ঠিক আছে এবং তার উপরে আমল কর। (ফালাহুস সায়েল, পৃষ্ঠা ১৮৩)

আর একারণেই আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর প্রায় ১৬ জন ছাত্র লেখনির কাজে নিজেকে নিমগ্ন রাখে এবং তারা প্রায় ১১৪টি গ্রন্থ সমাজকে ‍উপহার স্বরূপ ‍উপস্থাপন করে। উক্ত গ্রন্থ সমূহের মধ্যে আলি বিন হাসান ফাযযাল ৩৬ টি গ্রন্থ, মোহাম্মাদ বিন হাসান সাফফার ৩৫ টি গ্রন্থ, আব্দুল্লাহ বিন জাফর হুমাইরি ১৯ টি গ্রন্থ, আহমাদ বিন ইব্রাহিম ৭টি গ্রন্থ এং হারুন বিন মুসলিম ৬ টি গ্রন্থ লিখেন। (আয যারিয়া, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৯)

অনুরুপভাবে যে সকল রেওয়ায়েত বর্ণনাকারি যারা ইমাম (আ.) থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করতেন তাদের সংখ্যা ছিল ১০৬ জন। (আয যারিয়া, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৩- ২৯৭, আসনায়ি ব মুতুনে হাদিস, পৃষ্ঠা ৭৭)

৩- ইমাম হাসান আসকারি (আ.)এর লেখনি:

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) তার অনুসারিদের লেখনির প্রতি উদ্বুদ্ধ করার সাথে নিজেও যথেষ্ট পত্র ও গ্রন্থ লিখেছেন। যা ছিল তাঁর যুগ এবং পরবর্তি প্রজন্মের জন্য একটি হেদায়েতের আলোকবর্তিকা স্বরূপ। নিন্মে তার লেখনি কিছু উপমা স্বরূপ উল্লেখ করা হলো:

-  তাফসিরুল কোরআন।

-  আল মানকেবাত।

-  পত্র সমূহ।

তিনি পত্র আদান প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত তার অনুসারিদের সমস্যার সমাধান করতেন উক্ত স্থান সমূহ ছিল: কুফা বাগদাদ, নিশাবুর, কুম, আওয়ে, মাদায়েন, খোরাসান, ইয়েমেন, রেই, আযারবাইজান, সামেরা, জারজান, বাসরা ইত্যাদি। (সিরাতে পিশওয়ায়ান, পৃষ্ঠা ৬৩২, হায়াতুল ইমামে আসকারি, পৃষ্ঠা ২২৩)

৪- ভ্রান্ত চিন্তাধারার অপনোদন:

উক্ত বিষয়টি ছিল প্রত্যেকটি যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা যদি একটি সমাজের ভ্রান্ত চিন্তাধারার অপনোদন না করা হয়। তাহলে উক্ত সমস্যাটি হয়তো পরবর্তি প্রজন্মেও প্রচলিত থেকে যেতে পারে। আর এ কারণেই প্রত্যেকটি ইমাম (আ.)গণ উক্ত বিষয়টিকে অত্যান্ত গুরুত্ব দিতেন। উদাহরণ স্বরূপ:

যখন ইমাম হাসান আসকারি (আ.) কারাগারে ছিলেন তখন এক বছর অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন অনেক ইসলামি আলেমগণ বৃষ্টি প্রার্থনার বিশেষ নামাজ আদায় করেন। কিন্তু তারপরেও বৃষ্টির কোন চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু যখন এক খৃষ্টানদের পাদ্রি বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য বিশেষ নামাজ পড়ে তখন বৃষ্টি শুরু হয়। উক্ত ঘটনাটি মুসলমানদের লজ্জা ও অসম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) উক্ত পাদ্রির ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করেন ও মুসলিম উম্মাহর মুখকে উজ্জল করেন।

৫- ভ্রান্ত আকায়েদের মোকাবেলা:

বিদআত সমূহ:

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) বিদআত উচ্ছেদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভুমিকা পালন করেন। বিদআতি লেখক ও গবেষকদের বিরূদ্ধে ইমাম (আ.) অত্যান্ত কঠোর ভুমিকা পালন করেন যেমন “ইসহাকে কেনদি” যে একটি গ্রন্থ রচনা করে যার নাম দেয় ‘তানাকুয হায়ে কোরআন’ ইমাম তার ভ্রান্ত চিন্তার অপনোদন করেন। (মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪২৪)

এছাড়াও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) সে যুগের সমাজ সংস্কারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যান কিন্তু সে যুগের তথাকথিত খলিফা তার পথের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তারপরেও ইমাম (আ.) থেমে থাকেননি বরং তিনি তার সকল চেষ্টা দ্বারা সর্বদা সমাজের উন্নয়নের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ছিলেন।