সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ৮৯-৯৩

সব জ্বিন এবং মানুষ মিলে যদি চেষ্টা করে তারপরও কুরআনের মত একটি আয়াতও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর এ আয়াতে আল্লাহ বলেন: কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহ এই কিতাবে মানব জীবনের সঙ্গে জড়িত সব বিষয়কে সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এটি কুরআ

সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ৮৯-৯৩
সূরা বনী ইসরাইলের ৮৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآَنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ فَأَبَى أَكْثَرُ النَّاسِ إِلَّا كُفُورًا (89)
“এই কুরআনে আমি মানুষের জন্য বিভিন্ন উপমা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছি। তবুও বেশিরভাগ মানুষ অকৃতজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।” (১৭:৮৯)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, সব জ্বিন এবং মানুষ মিলে যদি চেষ্টা করে তারপরও কুরআনের মত একটি আয়াতও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর এ আয়াতে আল্লাহ বলেন: কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহ এই কিতাবে মানব জীবনের সঙ্গে জড়িত সব বিষয়কে সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এটি কুরআনের অন্যতম একটি মুজিযা।
এ আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন: অকৃতজ্ঞ মানসিকতার কারণে মানুষ কুরআনের শিক্ষার দিকে মনোযোগ না দিয়ে ধীরে ধীরে আল্লাহর সত্যবাণী কুরআন থেকে মুখ
ফিরিয়ে নেয় এবং সত্যকে অস্বীকার করতে থাকে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. কুরআনের আয়াত বর্ণনা করতে আল্লাহ-তায়ালা বিভিন্ন উদহারণ ও উপমা ব্যবহার করেছেন।
দুই. বেশিরভাগ মানুষ অকৃতজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি সত্যকে অস্বীকার করে। কিন্তু তাতে পবিত্র কুরআনের সত্যতা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। কারণ, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে সংখ্যার আধিক্য বা স্বল্পতা কোনো মানদণ্ড নয়।

সূরা বনী ইসরাইলের ৯০ ও ৯১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا (90) أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْجِيرًا (91)
“এবং তারা বলে, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি থেকে ঝরণাধারা বের করে আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কখনই তোমার প্রতি ঈমান আনব না।” (১৭:৯০)
“অথবা যতক্ষণ না তোমার খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে,যার ভেতর দিয়ে স্রোতসহ নদী বয়ে যাবে (ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করব না)।” (১৭:৯১)

কাফেররা কুরআনের মুজিযাকে অস্বীকার করে রাসূল (সা.)কে বলল : তোমাকে নবী বলে মেনে নিতে পারি যদি তুমি আগের নবীদের মত মোজেযা দেখাতে পার। যদি পার শুষ্ক মাটি থেকে ঝরণা বা নদীর স্রোত সৃষ্টি করে দেখাও।
মুশরিকরা এমন সময় এ দাবি তুলেছিল যখন এ ধরনের কোনো বিধান আল্লাহ ঠিক করে দেননি। আগের নবীরা আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করে নিজেদের রেসালতের প্রমাণ হিসেবে মুজিযা দেখালেও মানুষ যখনই চাইবে তখনই নবী-রাসূলদেরকে তা করে দেখাতে হবে- এমনটি নয়। আগের নবী-রাসূলদের যুগে কোনো কোনো সময় যদিও এ রকম দাবি মেনে নেয়া হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়নের আগে তাদেরকে সতর্ক করে বলা হতো: মুজিযা দেখানোর পর যদি তারা সত্য অস্বীকার করে, তাহলে সে জাতিকে আল্লাহর কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। হযরত সালেহ (আ.)’র জাতিকে এ ধরনের শাস্তি পেতে হয়েছিল।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে :
এক. নবী-রাসূলদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে হেদায়েত করা বা সঠিকপথে পরিচালিত করা। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ নবীদের এ উদ্দেশ্য বুঝতে পারেনি। তারা বাগান, স্বর্ণালঙ্কার ও সম্পদকে শক্তিমত্তা প্রদর্শন ও বড় হওয়ার পাথেয় বলে মনে করে।
দুই. সাধারণ মানুষের অনর্থক আবেদনে কান দেয়া ধর্মীয় নেতাদের উচিত নয়।

সূরা বনী ইসরাইলের ৯২ ও ৯৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন :
أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلًا (92) أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولًا (93)
“অথবা তুমি যেমনটি বলে থাক, সে অনুযায়ী আকাশকে আমাদের উপর খণ্ড-বিখণ্ড করে নিক্ষেপ কর, কিংবা আল্লাহ ও ফেরেশ্‌তাদেরকে আমাদের সামনে আনো।” (১৭:৯২)
“অথবা তোমার (নিজের) জন্য একটি স্বর্ণ নির্মিত ঘর তৈরি কর, অথবা তুমি আকাশে উঠে যাও, কিন্তু তোমার আকাশে ওঠার বিষয়টিতেও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস স্থাপন করব না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের প্রতি এক কেতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পড়বো। (হে রাসূল!) আপনি বলুন- মহান পবিত্র আমার প্রতিপালক এবং আমি তো একজন প্রেরিত মানব (বা দূত) মাত্র।” (১৭:৯৩)

আগের আয়াতে শত্রুদের অনর্থক অজুহাত সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আর এ আয়াতে তাদের আরেকটি অযৌক্তিক দাবি তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলছে: যে আযাবের কথা তুমি বলছো তা আকাশ থেকে আমাদের উপর পাঠাও যাতে আমরা ধ্বংস হয়ে যাই। অথবা যে আল্লাহ ও ফেরশতার দাবি তুমি কর এবং বল যে, তারা তোমার কাছে ওহী নিয়ে আসে তাদেরকে আমাদের সামনে এনে দেখাও। অথবা তুমি নিজে আসমানে উঠে যাও এবং সেখান থেকে কোনো কিতাব বা চিঠি নিয়ে এসো যা আমরা পড়ে দেখতে পারি।

রাসূল (সা.) তাদের এ বেয়াদবি ও অযৌক্তিক দাবির উত্তর এক কথায় দিয়ে দেন। তিনি বলেন: আমিও তোমাদের মত একজন মানুষ। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমিও তার একজন বান্দা। শুধুমাত্র পার্থক্য হল, আল্লাহ আমাকে রেসালাতের দায়িত্ব দিয়েছেন যাতে তাঁর বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। আমি যা কিছু বলছি তা তোমাদের কল্যাণের জন্য বলছি। আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কিছুই চাই না।

মুজিযা হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসম্ভব নয়। কিন্তু এ পৃথিবীতে সাধারণত তা প্রাকৃতিকভাবে ঘটে না। কিন্তু কাফেরদের কিছু চাওয়া ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই অসম্ভব। যেমন তারা বলতো, আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে তাদের কাছে এনে দেখাতে হবে। কিন্তু আল্লাহ বা ফেরেশতার কোনো আকৃতি নেই এবং আমাদের চোখ আকৃতিসম্পন্ন বস্তুই শুধু দেখতে পায়। এমনকি অনেক বস্তুগত প্রভাবও আমরা দেখতে পাই না। যেমন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও চুম্বকীয় শক্তি উভয়ই বস্তুগত শক্তির প্রভাব। কিন্তু এসব শক্তি চোখ দিয়ে দেখা সম্ভব নয়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. বহু মানুষের আক্‌ল বা বুদ্ধি হচ্ছে তাদের চোখের দেখা পর্যন্তই। তারা যা কিছু সামনে দেখতে পায় শুধুমাত্র সেগুলোকেই বিশ্বাস করে। যদিও পৃথিবীতে বহু সত্য বিষয় রয়েছে যা চোখে দেখা যায় না।
দুই. নবী-রাসূলরা নিজে থেকে কিছুই করেন না। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন। আর আল্লাহ কখনও উদ্দেশহীন নির্দেশ দেন না।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান