সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১১-১৪

সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১১-১৪

সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১১-১৪ 


সূরা বনী ইসরাইলের ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَيَدْعُ الْإِنْسَانُ بِالشَّرِّ دُعَاءَهُ بِالْخَيْرِ وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا (11)
“মানুষ অকল্যাণ কামনা করে ঠিক সেভাবে, যেভাবে কল্যাণ কামনা করা উচিত ৷ মানুষ বড়ই দ্রুততাপ্রিয়।” (১৭:১১)

কুরআনে কারিমে মানুষের দ্রুততাকামী এবং কৃপণতার মতো অসংখ্য নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে এও বলা হয়েছে যে, এগুলো হচ্ছে প্রশিক্ষণ পাবার সৌভাগ্য বঞ্চিতদের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ মানুষ যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ না পায় তাহলে এইসব বৈশিষ্ট্য তার মাঝে দেখা দেয়। আর এইসব বৈশিষ্ট্য মানুষের পার্থিব জগতের প্রতি মোহেরই বহিঃপ্রকাশ। এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মানুষ যেখানে নিজেদের স্বার্থের পেছনেই বেশি বেশি দৌড়ায় সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কখনো কখনো বিচার বিবেচনা বা প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা না করেই তড়িঘড়ি করে এমন এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে কিংবা এমনসব কাজ করে বসে যেসব তাদের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনে। অথচ সে নিজের জন্যে মঙ্গলজনক ভেবেই কাজটি করেছিল।

এ আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
এক) মানুষ স্বভাবগতভাবে মঙ্গলকামী অর্থাৎ নিজের ভালোটাই কামনা করে। কিন্তু তড়িঘড়ি করার ফলে কিংবা মূর্খতার কারণে অমঙ্গলকে মঙ্গল বলে ভাবে এবং সেটা পাবার জন্যে চেষ্টা চালিয়ে যায়।
দুই. দ্রুততার সাথে এবং তড়িঘড়ি করে কোনো কাজ করলে তা মানুষকে ধ্বংসের রসাতলে নিক্ষেপ করে।

সূরা বনী ইসরাইলের ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ آَيَتَيْنِ فَمَحَوْنَا آَيَةَ اللَّيْلِ وَجَعَلْنَا آَيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِتَبْتَغُوا فَضْلًا مِنْ رَبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ وَكُلَّ شَيْءٍ فَصَّلْنَاهُ تَفْصِيلًا (12)
“দেখ! আমি রাত ও দিনকে (আপন ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার) দু’টি নিদর্শন বানিয়েছি৷ রাতের নিদর্শনকে বানিয়েছি আলোহীন এবং দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকোজ্জ্বল, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ তালাশ করতে পার এবং মাস ও বছরের হিসেব করতে পার। এভাবে আমি প্রত্যেকটি জিনিসকে পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করেছি।” (১৭:১২)

আগের আয়াতে দ্রুততা এবং তড়িঘড়ি করাকে নিরুৎসাহিত করার পর এ আয়াতে বলা হচ্ছেঃ আল্লাহ পাক এই বিশ্বকে প্রজ্ঞা,কৌশল,যথার্থ পরিমাপ ও ছন্দোময়তার সাথে সুশৃঙ্খলভাবে সৃষ্টি করেছেন। রাত এবং দিন সবকিছুই নিজস্ব নিয়মে আসে যায় এবং একটা সুশৃঙ্খল কর্মপ্রক্রিয়া বা নিয়মনীতির ভিত্তিতে, সুপরিমিতভাবে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। তোমাদেরও উচিত সুনির্দিষ্ট হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে নিজেদের জীবন পরিচালনার জন্যে সঠিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা যাতে যথার্থ রুটিরুজি এবং আল্লাহর নিয়ামত লাভে সমৃদ্ধ হতে পার। কিন্তু সৃষ্টিব্যবস্থা সম্পর্কে যদি সঠিক ধারণা ছাড়াই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাহলে কল্যাণ ও মঙ্গলের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্তই হতে হবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলোঃ
এক. ) পৃথিবী যে তার নিজস্ব কক্ষপথে পরিক্রমণ করে এবং দিন ও রাত্রির এই যে আবির্ভাব এই সবই মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর ইচ্ছাতেই হচ্ছে। আর এইসব কর্মকৌশলের মধ্যে মানুষের কল্যাণে ও স্বার্থই নিহিত রয়েছে।
দুই. আল্লাহর রহমত ও কল্যাণই সকল নিয়ামত নাযিলের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। তবু ঐশী নিয়ামতের জন্যে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সূরা বনী ইসরাইলের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا (13) اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا (14)
“কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষের ভালমন্দ কাজের নিদর্শন আমি তার গলায় ঝুলিয়ে রেখে তার জন্য বের করব একটি খাতা, যাকে সে খোলা কিতাবের আকারে দেখতে পাবে৷” (১৭:১৩)
“(এরপর তাকে বলা হবে) তোমার (নিজের) নথি পাঠ কর। আজ তুমি নিজেই তোমার কৃতকর্মের হিসাব নিকাশের জন্য যথেষ্ট।” (১৭:১৪)

মানবজাতিকে কিয়ামতের কথা স্মরণকারী এই আয়াতটি আসলে পূর্ববর্তী আয়াতেরই ধারাবাহিকতা। এই আয়াতের মাধ্যমে বলা হচ্ছে মানুষের জানা উচিত তার কাজের ফল এই পৃথিবীতেই শেষ হয়ে যাবে না যে কারণে সে দুনিয়াবি স্বার্থ চিন্তাতেই ব্যতিব্যস্ত থাকবে কিংবা পার্থিব লক্ষ্যেই সকল কাজকর্ম করে যাবে,বরং ভালো কিংবা মন্দ তার সকল কাজেরই আমলনামা তাকে তাড়া করে ফিরবে, কেননা তার আমলনামা তার ঘাড়ে ঝুলে থাকবে,কখনোই তা পৃথক হবে না। কিয়ামতের দিন এগুলোই তার আমলনামার আঙ্গিকে তার সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে এবং সে তার ঐ কাজের জবাবদিহি করবে। বিস্ময়কর ব্যাপারটি হলো কুরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মানুষের কৃতকর্মের আমলনামা এতো বেশি স্পষ্ট এবং উজ্জ্বল হবে যে, তার ভালো-মন্দ বিচার করতে কোনো আদালত বা বিচারকের প্রয়োজন পড়বে না, নিজেই বুঝতে পারবে তার কাজের ফল কী হবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলোঃ
এক. প্রতিটি মানুষেরই আমল কেবল এই দুনিয়াতেই নয় বরং কিয়ামত পর্যন্ত তার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। পরকালীন সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য তার ঐ আমলের ওপরই নির্ভর করবে।
দুই. মানুষ যা-ই করে বা বলে তা এই পৃথিবীতেই রেকর্ড হয়ে যায় এবং কিয়ামতের দিন এই রেকর্ডই তার সামনে তুলে ধরা হবে।
তিন. কিয়ামতই একমাত্র আদালত যেখানে পাপী তার পাপের কথা অস্বীকার করতে পারবে না।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন