সূরা কাহাফ; আয়াত ৫৪-৫৬

এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার: এক. কুরআন মানুষকে সুপথ দেখানোর জন্য নানা ব্যক্তি ও জাতির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে এবং উপমাও ব্যবহার করেছে। দুই. যার মধ্যে সত্যকে মেনে নেয়ার মানসিকতা নেই সে সত্য বক্তব্যের মোকাবেলায় বিতর্ক করতেই থাকবে। তাকে যতই উপমা বা দৃষ

সূরা কাহাফ; আয়াত ৫৪-৫৬
সূরা কাহাফের ৫৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآَنِ لِلنَّاسِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا (54)
“নিঃসন্দেহে আমরা এ কুরআনে মানুষের জন্য (সত্যকে স্পষ্ট করতে) সব ধরনের দৃষ্টান্ত বিবৃত করেছি;কিন্তু মানুষ তো সবচেয়ে বেশি বিতর্কপ্রিয়।”(১৮:৫৪)

খোদায়ী বিধান অস্বীকার করে চলার কুফরি প্রবণতার জবাবে এ আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: মানুষ যাতে শিক্ষা নিতে পারে এবং সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত হয় সে জন্য আমি অতীতের অনেক জাতির তিক্ত ও মধুর ঘটনা তুলে ধরেছি। কিন্তু অনেকেই সত্যের মোকাবেলায় বিতর্ক তুলছে ও সত্যকে মানছে না। তারা কোনো যুক্তি-প্রমাণ ছাড়াই তর্ক করছে। এভাবে তারা তাদের বিবেককে প্রবোধ দেয়ার বা শান্ত করার ও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার ব্যাপারে অজুহাত দেখাতে পারবে বলে মনে করে।

এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. কুরআন মানুষকে সুপথ দেখানোর জন্য নানা ব্যক্তি ও জাতির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে এবং উপমাও ব্যবহার করেছে।
দুই. যার মধ্যে সত্যকে মেনে নেয়ার মানসিকতা নেই সে সত্য বক্তব্যের মোকাবেলায় বিতর্ক করতেই থাকবে। তাকে যতই উপমা বা দৃষ্টান্ত দেয়া হবে সে ততই তর্ক করতে থাকবে।

সূরা কাহাফের ৫৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى وَيَسْتَغْفِرُوا رَبَّهُمْ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ قُبُلًا (55)
“যখন মানুষের কাছে পথনির্দেশ আসে তখন তাদের বিশ্বাস করার ও তাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছাড়া আর কী বাধা থাকতে পারে যে, তারা প্রতীক্ষা করেছে তাদের সাথে তাই ঘটুক যা পূর্ববর্তী জাতিদেরসাথে ঘটে গেছে অথবা তারা খোদায়ি শাস্তি বা আযাবকে সামনে আসতে দেখে নিক।”(১৮:৫৫)

এ আয়াতে কাফেরদের গোঁড়ামি বা একগুঁয়েমির জবাবে আল্লাহ বলছেন, এক শ্রেণীর কাফের সত্যকে জানা ও বোঝার পরও তা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। সত্যের সামনে একমাত্র যে বিষয়টি তাদের বিনম্র করতে পারে তা হল পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলোর পরিণতি ভোগ করা যাতে তারা বুঝতে পারে যে, তাদের ধ্বংস এগিয়ে আসছে, কিংবা আকাশ ও জমিনে আল্লাহর শাস্তি নেমে আসতে দেখে সত্যের প্রতি ঈমান আনা। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, শাস্তি আসতে দেখার পর ঈমান আনার কোনো মূল্য নেই। কারণ, এ ধরনের ঈমান বা বিশ্বাস স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয় বরং অনিবার্য ধ্বংস দেখে বাধ্য হয়ে ঈমান আনা।
এ আয়াতে একটি সতর্কবাণী ও একটি সুসংবাদ পাশাপাশি দেয়া হচ্ছে। হুঁশিয়ারি হচ্ছে এটা যে, যদি সত্যের মোকাবেলায় প্রতিরোধ কর তাহলে তোমরাও অতীতের জাতিগুলোর ভাগ্য তথা ধ্বংস বরণ করবে। আর সুসংবাদ হল যদি অতীত অন্যায়ের ব্যাপারে তওবা বা অনুশোচনা কর তাহলে আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন।

এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. মহান আল্লাহ মানুষকে সুপথ দেখানোর জন্যই নবী-রাসূল ও আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই অজুহাত বা আপত্তি তোলার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন যে, সুপথ পাওয়ার কোনো মাধ্যম বা পথ ছিল না।
দুই. পাপের জন্য তওবা করা বা অনুশোচনা করা খোদায়ী শাস্তি থেকে মুক্তির বা পরিত্রাণের পথ।
তিন. সব সময়ই উপদেশ, হুঁশিয়ারি ও যুক্তি-প্রমাণ প্রদর্শন কার্যকর নয়। তাই কখনও কখনও শাস্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে।

সূরা কাহাফের ৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَمَا نُرْسِلُ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَيُجَادِلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ وَاتَّخَذُوا آَيَاتِي وَمَا أُنْذِرُوا هُزُوًا (56)
“আমরা তো রাসূলগণকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়ে থাকি। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তারা মিথ্যার ওপর নির্ভর করে বিতণ্ডা করে, যাতে এর মাধ্যমে সত্যকে স্থানচ্যুত করতে পারে। অথচ তারা আমার নিদর্শনাবলি ও যে বিষয়ে ভীতি প্রদর্শিত হয়েছে সেগুলোকে উপহাসের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং আমার নিদর্শনসমূহ ও যার সাহায্যে তাদের সতর্ক করা হয়েছে তাকে বিদ্রুপের বিষয়বস্তুরূপে পরিণত করতে পারে।”(১৮:৫৬)

এ আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলছেন: হে নবী! কাফেরদের কুফরি যেন আপনাকে কখনও দুঃখিত না করে। সতর্ক করা ও সুসংবাদ দেয়া ছাড়া আপনার অন্য কোনো দায়িত্ব নেই। আর সত্যকে মানা বা না মানার স্বাধীনতা মানুষকে দেয়া হয়েছে। তাই কেউ কেউ স্বাধীনতার অপব্যবহার করে আল্লাহকে অস্বীকার করবে বা তার নির্দেশ অমান্য করবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়াও তারা সত্যকে নির্মূল করে মিথ্যাকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে চায়।

খোদাদ্রোহীদের অন্যতম রীতি হল, কুরআনের আয়াত ও মুমিনদের উপহাস করা। বিশেষ করে যেসব আয়াতে মানুষকে পুনরুত্থান বা বিচার দিবসের সুসংবাদ ও দোযখের আগুনের ভয় দেখানো হয়েছে সেইসব আয়াত নিয়ে বিদ্রুপ করে থাকে কাফের মুশরিকরা। তারা এইসব সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বলে, পরকাল থেকে কি কেউ এমন সংবাদ দিয়েছে যে তোমরা দোযখের আগুনের ভয়ে দুনিয়ার আনন্দ ও ভোগ-বিলাস বর্জন করছ।

এ আয়াত থেকে মনে রাখা দরকার:
এক. মানুষকে সুপথ দেখানোই নবী-রাসূলদের কাজ। মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করা তাঁদের কাজ নয়।
দুই. বিতর্ক ও উপহাস করা খোদাদ্রোহীদের রীতি। যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ নয়।
তিন. আমরা যেন কখনও ধর্মীয় বিধি-বিধানকে উপহাস না করি। তাই আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় অত্যন্ত সাবধান হওয়া উচিত। ধর্মীয় বিধি-বিধানকে উপহাস করা খোদায়ী নিদর্শনকে উপহাস করারই শামিল। কুরআন এ ধরনের কাজকে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছে।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান

 

 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন