হুসাইন (আ.): ইসলামী বিপ্লবের উত্তাল আগ্নেয়গিরি

হুসাইন (আ.): ইসলামী বিপ্লবের উত্তাল আগ্নেয়গিরি

 ইসলামী বিপ্লবের উত্তাল আগ্নেয়গিরি

১৩৭৪ বছর আগে এই দিনে অর্থাত ৬১ হিজরির নয়ই মহররম কুফায় ইয়াজিদের নিযুক্ত কুখ্যাত গভর্নর ইবনে জিয়াদ ইমাম হুসাইন (আ.)’র ছোট্ট শিবিরের ওপর অবরোধ জোরদারের ও হামলার নির্দেশ দেয়। ইয়াজিদের সেনা সংখ্যাও ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং দশই মহররমের দিনে তা অন্তত ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়।

ইমাম হুসাইন (আ.) নয়ই মহররমের বিকালের দিকে এক দিনের জন্য যুদ্ধ পিছিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন যাতে দশই মহররমের রাতটি শেষবারের মত ইবাদত বন্দেগিতে কাটানো যায়। ইয়াজিদ বাহিনীর প্রথমে রাজি না হলেও পরে এ প্রস্তাবে রাজি হয়। বিকালেই হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) নিজ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। সঙ্গীরা আবারও তাঁর প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন।

নয়ই মহররম কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি অর্জনের সর্বশেষ দিন। এই পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর প্রায় ১০০ জন সহযোগী। আর এ জন্যই তাঁরা ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন।
কারবালা বিপ্লব মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের এক অনন্য বিপ্লব। এ বিপ্লবে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে মানুষের শ্রেষ্ঠ কিছু গুণের সর্বোত্তম প্রকাশ এবং বীরত্ব ও ন্যায়নীতির পরিপূর্ণ সৌন্দর্য, তেম্নি অন্যদিকে ফুটে উঠেছে শয়তান ও পশু-শক্তির দানবিকতা আর পাশবিকতার চরম প্রকাশ। একদিকে ফুটে উঠেছে খোদা-প্রেমের চরম প্রকাশ আর অন্য দিকে কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব তথা অধঃপতন আর বিবেকহীনতার সর্বগ্রাসী সয়লাবের নিদর্শন।

কারবালার কালজয়ী মহা-বিপ্লব নানা শিক্ষার এক বিশাল সূতিকাগার ও মানুষ হিসেবে তথা খোদার প্রতিনিধি বা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আশরাফুল মাখলুকাত) হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করার শিক্ষা লাভের এক অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়।

খোদা-প্রেম, ইমামের আনুগত্য, আন্তরিকতা, মানবতা, নৈতিকতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব, সত-কাজের আদেশ, অসত কাজে নিষেধ, আত্মত্যাগ, মুক্তিকামীতা, দায়িত্বশীলতা, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, সময়োচিত পদক্ষেপ বা সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহারের মত বিষয়গুলো কারবালার কালজয়ী বিপ্লবে প্রবাদ-তুল্য আদর্শ বা শিক্ষা হিসেবে ফুটে উঠেছে।

কারবালায় বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র ও নিষ্পাপ বংশধর বা আহলে বাইতের সদস্যদের ওপর জুলুম অত্যাচারের যে নারকীয় বর্বরতা চালানো হয়েছিল তার জন্য কারা দায়ী ছিল? যারা মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি সম্মান, মর্যাদা ও ভালবাসা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন তাঁদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ করার এমন মহা-ট্র্যাজেডি ঘটানোর দুঃসাহস কিভাবে অর্জন করেছিল মুসলিম নামধারী রাজতান্ত্রিক উমাইয়া শাসকরা?

এই উমাইয়া শাসকদের ও তাদের অনুসারীদের এতটা অধঃপতন কি হঠাত করেই ঘটেছিল না পর্যায়ক্রমে ইসলামের ওপর এমন মহা-বিপর্যয় নামিয়ে আনার সুপরিকল্পিত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল মুসলিম সমাজের পূর্ববর্তী কোনো কোনো শাসকের নানা ধরনের অদূরদর্শী পদক্ষেপের মাধ্যমে?

কারণ, আমরা এর আগেও ইতিহাস দেখেছে, কিভাবে মজলুম হতে হয়েছে হযরত আলী (আ.)'র মত সর্বোত্তম চরিত্রের মহাপুরুষকে। একদল তথাকথিত অতি-ধার্মিক বা ধর্মান্ধ তাকে বলেছিল কাফির। তিনি যখন কুফার মসজিদে ধর্মান্ধ খারেজি আততায়ীর আঘাতের ফলে শহীদ হয়েছিলেন তখন বিস্ময়ে হতবাক মুয়াবিয়ার শাসনাধীন অঞ্চলে অপপ্রচারণার শিকার অনেক মুসলমান বলেছিল, আলী মসজিদে কেন গিয়েছিল, সে কী তাহলে নামাজও পড়ত?!!!

ইতিহাস এও দেখেছে, কিভাবে বিষ প্রয়োগে শহীদ করা হয়েছিল হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-কে। কিভাবে মুসলিম সমাজে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল নানা গৃহযুদ্ধ। তাই এটা স্পষ্ট যে কারবালায় মুসলিম সমাজের যেসব চরম দুর্বলতা, বিচ্যুতি ও অধঃপতনের চিত্র ফুটে উঠেছে তা রাতারাতি বিচ্যুতির কোনো ঘটনা ছিল না। যদি ইমাম আলী (আ.)-কে কিংবা তাঁর পর ইমাম হাসান (আ.)-কে আদর্শ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বাধা দেয়া না হত তাহলে কারবালার প্রয়োজন হত না। (সংক্ষিপ্ত বাজনা)

উমাইয়ারা কেবল কারবালাতেই পাশবিক শক্তির চরম প্রকাশ ঘটায়নি। কারবালার পর তারা পবিত্র মক্কা ও মদিনার মুসলমানদের ওপরও পাশবিকতার এক বিভতস অধ্যায় চাপিয়ে দিয়েছিল। মদিনায় ইয়াজিদ বাহিনীর গণ-ধর্ষণ চলেছে দিনের পর দিন। এসবের কিছুই ঘটতো না যদি ইসলামকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দেয়া হত।

আসলে শিশু ইসলামের বিকাশের ও সার্বিক অগ্রযাত্রার পাশাপাশি শয়তানি শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেনি। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের পরই তারা বুঝতে পেরেছিল যে, প্রকাশ্য বিরোধিতার মাধ্যমে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে রোখা অসম্ভব। বরং ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখতে হলে ভেতর থেকে ইসলামের নামেই এর মধ্যে ঘটাতে হবে নানা ধরনের বিকৃতি সাধন। এ জন্যই বিশ্বনবী (সা.) বলেছিলেন, আমি ভয় করি না কাফিরদেরকে, আমি ভয় করছি তোমাদের সম্পদ ও প্রাচুর্যকে, ভয় করছি মুনাফিকদেরকে।

মহান আল্লাহর রাসূল সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও বিশ্বস্ততার জন্য আল-আমিন উপাধি পাওয়া সত্ত্বেও আরবের নেতৃবৃন্দ ও তাদের বিপুল সংখ্যক অনুসারী মহানবী (সা.)’র দাওয়াতকে ২৩ বছর পর্যন্ত প্রতিরোধ করেছে সরাসরি। আর বিশ্বনবী(সা.)’র যোগ্য প্রতিনিধিরা বিনা বাধায়, বিনা কষ্টে বা ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়াই ইসলাম ও ঈমানের সত্যিকারের রূপ তুলে ধরতে পারবেন- এটা ভাবাও যায় না।

আসলে মুনাফিক, কুচক্রী ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের ষড়যন্ত্রে ও তাদের সৃষ্ট বিষাক্ত পরিবেশের কারণেই বিশ্বনবী (সা.)’র হিজরতের প্রায় ৪০ বছর পরই ইসলামের নামে চালু হয় রাজতন্ত্র। ভোগবাদও গোত্রবাদসহ জাহিলি যুগের নানা প্রভাব আবারও প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে ওঠে যে একজন মদ্যপায়ী, ব্যভিচারী, জুয়াড়ি ও পুরোপুরি ফাসিক চরিত্রের এক ব্যক্তি ইসলামী খেলাফতের কর্ণধার হয়ে বসে।

কিন্তু ইয়াজিদ ও তার দলবলের প্রকাশ্য পাপাচার দেখেও একমাত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ছাড়া কেউ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে বা প্রকাশ্যে কথা বলতেও সাহসী হয়নি। এর কারণ, সে যুগে উমাইয়া শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা ইসলামের লেবাস পরেই ইসলামের বারোটা বাজানোর আয়োজন পাকাপোক্ত করছিল। ইসলামের এমন দুর্দিনে যিনি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সত্যের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে প্রকৃত ইসলামকে আবারও জাগিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই বিশ্বনবী (সা.)’রই মহান নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)।

দুঃখজনক বিষয় হল, মুসলিম বিশ্বের অনেকেই আজও কারবালা বিপ্লবের প্রকৃত ঘটনা, লক্ষ্য, গুরুত্ব এবং ইসলামের প্রকৃত নেতৃবৃন্দ ও অযোগ্য নেতৃবৃন্দের পরিচয় ভালভাবে জানেন না। ইসলামের ইতিহাসের অনেক বাস্তবতাকেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে হাজার হাজার বা লাখ লাখ মিথ্যা হাদীস ও বিকৃত ইতিহাস প্রচারের মাধ্যমে। ফলে অনেকেই মনে করেন মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক যদি জালিমও হয় তবুও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নাজায়েজ। তাই ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার সঙ্গীরা যে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়েছেন তার জন্য তাঁরাই দায়ী! বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে ইরাকের কুফার দিকে যেতে অনেক সাহাবীই নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কেন তাদের নিষেধ না শুনে সেদিকে গেলেন? কিংবা রাজা-বাদশাহরা পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি তা তারা যত অযোগ্য বা ফাসিকও হন না কেন! কিংবা কেউ বলেন, আল্লাহ অশেষ ক্ষমাশীল ও দয়ালু তাই ইয়াজিদের মত জালিমকেও ক্ষমা করে দিতে পারেন। অথবা ইয়াজিদের প্রতি অসম্মান করা যাবে না, কারণ তাতে তার পিতাসহ যেসব সাহাবী ইয়াজিদকে সমর্থন জানিয়ে ‘ভুল’ করেছেন বা কথিত ইজতিহাদে ‘ভুল’ করেছেন তাদেরও অসম্মান করা হবে! অথচ এই শ্রেণীর মানুষ ভুলে যান বুখারি ও মুসলিম শরীফের এই হাদীস যেখানে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন :

“কিয়ামতের দিন আমার সাহাবিদের মধ্যে হতে একটি দলকে (অথবা বলেছেন আমার উম্মতের মধ্য হতে একটি দলকে) আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাদেরকে হাউজে কাওসার হতে দূরে সরিয়ে দেয়া হবে বা সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। তখন আমি বলব: হে আমার প্রভু! এরা আমার সাহাবি। মহান আল্লাহ উত্তরে বলবেন: আপনার পরে পরে এরা যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে আপনি অবগত নন। তারা তাদের পূর্বাবস্থায় (অজ্ঞতা তথা জাহেলিয়াতের যুগে) প্রত্যাবর্তন করেছিল।”
( বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৯৪, ১৫৬ পৃ, ২য় খণ্ড, ৩২ পৃ, মুসলিম শরীফ ৭ম খণ্ড, পৃ-৬৬)

কেউ কেউ ডাহা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে বা এ ধরনের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে বলেন, ইয়াজিদ তো ইমাম হুসাইন (আ.)-কে হত্যাই করেননি, বরং তাঁকে হত্যার জন্য ইবনে জিয়াদকে তিরস্কার করেছেন এবং কেঁদেছেন! অনেকেই ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদতের জন্য কেবল কুফাবাসীদের অসহযোগিতাকেই দায়ী করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, মুসলিম বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলো থেকে কেনো ইমামের (আ.) আন্দোলন ও তাঁর কাফেলার প্রতি সহযোগিতা করা হয়নি?

বিশ্বনবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে উম্মতের ‘নাজাতের তরী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি উম্মতকে তাঁর আহলে বাইতের চেয়ে আগ বাড়িয়ে না চলার কিংবা তাঁদের পথ বাদ দিয়ে অন্য কারো পথ অনুসরণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইমাম হুসাইন (আ.) আমাদেরকে এটা শিখিয়ে গেছেন যে সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। ইয়াজিদের মত দুরাচারী ব্যক্তির শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন: তোমরা কি দেখছ না যে, আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকারগুলো ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু তোমরা নীরব রয়েছ ও আল্লাহকে ভয় করছ না। অথচ তোমাদের বাপদাদার সঙ্গে করা কিছু অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হলে তোমরা কান্নাকাটি কর। অন্যদিকে রাসূল (সা.)’র সঙ্গে করা অঙ্গীকারগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে দেখেও তোমরা এ বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছ না।” ইমাম হুসাইন (আ.)-কে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল কেউ কেউ। কিন্তু স্বাধীনচেতা ইমাম বলেছিলেন, সারা বিশ্বও যদি আমার জন্য অনিরাপদ হয় তবুও ইয়াজিদের কর্তৃত্ব মেনে নেব না।

ইমাম কারবালা ময়দানে বিভ্রান্ত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তোমাদের যদি ধর্ম নাও থাকে, অন্তত স্বাধীনচেতা হও। তিনি আরো বলেছিলেন: দূর হোক অপমান, কিংবা অপমান আমাদের সয় না।

বিশ্বনবী (সা.)’র হাদীসে বলা হয়েছে, যারা জালেম শাসক ও যারা আল্লাহর ঘোষিত হারামকে হালাল করে তাদের ব্যাপারে কেউ যদি নীরব থাকে এবং কোনো প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া না দেখায় তাহলে তারও স্থান হবে ওই জালেম শাসকের জায়গায় তথা জাহান্নামে।

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) লক্ষ্য করেন যে, ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বিলুপ্তির ব্যবস্থা করছে উমাইয়া রাষ্ট্র-যন্ত্র। তাই ইসলামকে রক্ষার ও মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য এগিয়ে আসেন এই মহান ইমাম। তিনি নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

“আপনারা জেনে রাখুন যে এরা (বনি উমাইয়ারা) সব সময়ই শয়তানের সঙ্গী। তারা আল্লাহর নির্দেশ ত্যাগ করেছে এবং প্রকাশ্যে ফ্যাসাদ বা দুর্নীতি ও অনাচার করে যাচ্ছে। তারা আল্লাহর বিধানকে নিষিদ্ধ করেছে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। তারা আল্লাহ যা নিষিদ্ধ বা হারাম করেছেন সেসবকে হালাল বা বৈধ করেছে এবং আল্লাহ যেসবকে হালাল করেছেন সেসবকে হারাম করেছে।”

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) আরো বলেছেন, “হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমাদের পক্ষ থেকে যা হচ্ছে তা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলও আমাদের লক্ষ্য নয়। বরং তোমার দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখা, তোমার ভূখণ্ডে সংস্কার আনা ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের স্বস্তি দেয়ার জন্যই আমরা কিয়াম করেছি যাতে ধর্মের ফরজ বিষয় ও বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা হয়।”

খোদা-প্রেমের অনন্য ও চরম প্রকাশ কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের আরেকটি বড় লক্ষণীয় দিক। কারবালা বিপ্লবের মহান রূপকার ও মহানায়ক ইমাম হুসাইন (আ.) শাহাদতের গুল-বাগিচায় গড়ে তুলেছেন খোদা-প্রেমের অমর মহাকাব্য।

লাইলি-মজনুর কল্পিত প্রেমের নানা ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা হল এমন যে, একবার লাইলি নাজর বা মানত হিসেবে দুধ বিতরণের ব্যবস্থা করে। অন্য অনেকের মত মজনুও দুধ নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াল। মজনু প্রিয়তমার কাছ থেকে দুধ নেয়ার জন্য দামী পাথর-খচিত একটি দর্শনীয় বাটি বা জ'ম নিয়ে এসেছিল। কিন্তু লাইলি মজনুর সেই চমতকার বাটিটি দেখে তাকে তিরস্কার করে ও তা মাটিতে ছুঁড়ে মেরে ভেঙ্গে খান খান করে ফেলে। লাইনে জড়ো হওয়া ব্যক্তিরা মজনুর এ অবস্থা দেখে তাকে পরিহাস করে বলল: দেখলে! যে লাইলির প্রেমে তুমি এমন পাগল সে তোমাকে কোনো পাত্তাই দেয় না, তোমার বাটিরও এমন অবমাননা করল!
মজনু বলল, আমি যা বুঝতে পারছি তা তোমরা বুঝতে পারনি। এই বাটি ভাঙ্গার মাধ্যমে সে আমাকে বরং ভালভাবেই গুরুত্ব দিয়েছে।
আসলে ওই জ'ম বা বাটি ভেঙ্গে দিয়ে লাইলি এটাই বলতে চেয়েছে, আমাকে ভালবাস না এইসব বাটিকে ভালবাস? আমি যদি তোমার প্রতিটি মুহূর্তের ধ্যান ও স্বপ্ন হতে না পারি তাহলে তুমি তো খাঁটি প্রেমিক নও, এইসব বাটি প্রেমের পথে বাধা।

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)ও খোদা-প্রেমের চেতনা নিয়ে নিজের প্রাণসহ সব কিছু আল্লাহর পথে উজাড় করে দিয়েছিলেন কারবালায়। তিনি তাঁর সন্তান-রূপ বাটি শিশু আলী আসগর (আ.) ও যুবক সন্তান আলী আকবর (আ.)সহ দুনিয়া প্রেমিকদের দৃষ্টিতে লোভনীয় সবকিছুই আল্লাহর রাহে উতসর্গ করেছেন। মহান আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি চরম সন্তুষ্টি আর সর্বোচ্চ প্রেমময় আগ্রহ ও শত্রু বাহিনীর বিপুল শক্তি বা সংখ্যার বিশালত্বের প্রতি ভ্রক্ষেপহীনতা ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর সঙ্গীদের দিয়েছে অনন্য খোদা-প্রেমিকের সম্মান। তাই তাঁরা যুদ্ধে বাহ্যিকভাবে জয়ী না হয়েও হয়েছেন বিজয়ী এবং শাহাদতের মাধ্যমে জুলুমের বিরুদ্ধে অর্জন করেছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়। আসলে যারা তাঁদের সব-কিছুকে ও সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোকে আল্লাহর জন্য পরিপূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে উতসর্গ করেন, আল্লাহ নিজেই তাঁদের হয়ে যান। তাই তাঁরা হন মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত এবং বিশেষ করে খোদা-প্রেমিক, মানবতাবাদী, মুক্তিকামী ও সত্য-প্রেমিক মানুষ তাদের জন্য অশ্রু বিসর্জন করতে অথবা তাদের প্রেমিক হতে গর্ব অনুভব করেন।

ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর মহান সঙ্গীদের মধ্যে সমন্বিত হয়েছিল প্রেমিক ও সংস্কারকদের যুক্তি। একজন সংস্কারক ও একজন আধ্যাত্মিক রহস্যবাদী প্রেমিকের ব্যক্তিত্ব যখন একদেহে লীন হয়ে যায় তখন সেখানে জন্ম নেয় একজন শহীদ। ইমামের শহীদ সঙ্গীরা ছিলেন এই প্রক্রিয়ারই ফসল। ইমাম হুসাইন (আ.) তো তাদেরকে রাতের আধাঁরে আত্মীয়দের হাত ধরে একে-একে পালিয়ে যাওয়ারও অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা ইমামের সঙ্গে থেকেই শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করতে চেয়েছেন। ইমাম অবশ্য এটাও বলেননি, অসম জিহাদের জন্য কারবালায় তাঁর সঙ্গে থেকে লড়তে আগ্রহী সঙ্গীদের অবস্থান করা হবে বোকামি, হারাম বা আত্মঘাতী ততপরতা মাত্র। তাঁদের কেউ কেউ ইমামের জন্য বহুবার শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলে গেছেন। যেমন, ইমামের একজন সঙ্গী এই পবিত্র জিহাদের জন্য ৭০ বার জ্বলে পুড়ে ছাই হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। অন্য একজন বলেছিলেন, ইস্ আমি যদি ক্রমাগত এক হাজার বার নিহত হতাম! যদি আমার হাজারটি প্রাণ থাকতো তাও আমি কুরবানি করতাম ইমাম হুসাইন (আ.)'র জন্য। তাই বিশুদ্ধ হৃদয়ের সেই সঙ্গীরা ছাড়া কারবালায় ইমাম (আ.) যদি একাই শহীদ হতেন তাহলে এই বিপ্লব এতটা প্রাণবন্ত হত না ও এর প্রভাবও এত সর্বাত্মকভাবে সফল এবং চিরন্তন হত না।

ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সঙ্গীদেরকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধার্মিক ও বিশ্বস্ত সঙ্গী বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি নিজে বলেছিলেন, প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর যে কোনো পরিস্থিতিতে আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। অর্থাত তিনি মনে করতেন সত্যের পথে এগুতে গিয়ে যা কিছু ঘটে তার সবই ভাল।

নেককার ব্যক্তি পরিণতির তোয়াক্কা না করেই সব পরিস্থিতিতে সচেতনভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করে যান। এই পথে যদি ভালো কিছু ঘটে বা বিজয় অর্জিত হয় তাহলে যেমন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন, তেম্নি অপ্রীতিকর কিছু ঘটলেও নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করেন না। ঠিক এ জন্যই ইমাম হুসাইন (আ.) ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে হাসিমুখে তাঁর জীবন দানের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনে সুসময় ও দুঃসময়-দুইই তিনি দেখেছেন। ভালো দিনগুলোতে তথা শৈশবে তিনি নানা বিশ্বনবী (সা.)'র কোলে বসতেন ও তাঁর কাঁধে চড়েছেন। এক সময় তিনিই ছিলেন মুসলিম জাহানে সবার প্রিয় শিশু। সেইসব দিনের জন্য তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আর বর্তমান দুঃখ-দুর্দশার জন্যও তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।

কারণ, এর মধ্যেই রয়েছে তাঁর ও ইসলামের মহা-কল্যাণ। তিনি জানতেন তাঁর ও সঙ্গীদের শাহাদত একদিন মানুষকে জাগিয়ে তুলবে। বিবেকের দংশনে ক্ষত-বিক্ষত অনেক শত্রুও বলবে, নবী (সা.) পরিবারের সঙ্গে তো দূরের কথা কোনো সাধারণ মানুষের সঙ্গেও এমন বর্বর আচরণ করা ঠিক হয়নি। মানব ইতিহাসে যেন এমন বর্বরতা আর না ঘটে। আর জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে সঙ্গে সঙ্গে বিজয় না আসলেও নৈতিক বিজয়ের পথ ধরে বড় বিজয়ও একদিন আসবেই। এভাবে কারবালা বিপ্লব হয়ে গেছে জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুম ও দুর্বলদের অসম-সাহসী লড়াইয়ের এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

সূত্রঃ ইরান রেডিও