রেনেসাঁর কবি ইকবাল-১৩

রেনেসাঁর কবি ইকবাল-১৩

রেনেসাঁর কবি ইকবাল-১৩


পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে,ইকবালের দৃষ্টিতে মানব মুক্তির একমাত্র পথ হলো ধর্মকে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরা। আর তা সম্ভব হবে কেবল নিজেকে জানার মাধ্যমে। ইকবালের মতে এই নিজেকে চেনার মাধ্যমে আল্লাহকে চেনার পথ এবং আধ্যাত্মিকতার সত্য-সঠিক পথের সন্ধান মেলে। নিজেকে চেনার বিষয়টি ইকবাল লাহোরীর চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু। ইকবাল তাঁর বহু রচনায় এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন যে,মুসলিম জাতির জন্যে নবীজীর অনুসরণ একটি অনিবার্য বিষয়। সর্বপ্রকার চিন্তা-ভাবনায় তাঁরি অনুসরণ করা উচিত। ইকবালের চিন্তা-চেতনা বা প্রবণতা আধ্যাত্মিক। অপরাপর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের মতো কবি ইকবালও মনে করেন অন্তরই হলো আল্লাহর ফয়েজ বা অনুগ্রহ লাভ করার কেন্দ্র।
چه مي پرسي ميان سينه دل چيست
خرد چون سوز پيدا كرد، دل شد
دل از ذوق تپش دل بود، ليكن
چو يك دل از تپش افتاد گل شد
বরে মাঝে অন্তর কী জানতে চাও!
যুক্তি বা বুদ্ধিমত্তা জ্বলেপুড়ে হলো অন্তর
সে ছিল হৃদয়ের স্পন্দনে স্পন্দিত,কিন্তু
যখন পড়ে গেল নীচে ,কাদা হয়ে গেল
ইকবাল তাঁর সকল লেখাতেই সেই সূফিবাদের বিরোধিতা করেছেন, যেই সূফিবাদ জীবন থেকে পলায়নের কথা বলে। না, কেবল বিরোধিতাই করেন নি বরং তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন জীবন থেকে পলায়নকামী সূফিবাদ মুসলমানদের অবয়ের দিকে নিয়ে যায় এবং রাসূলে খোদার নীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
ইকবালের অধ্যাত্মবাদ ছিল সামাজিক। তাঁর দৃষ্টিতে সামাজিক জীবনের স্বরূপকে যে উপো করে কিংবা গুরুত্বহীন মনে করে সে সমাজচ্যুত হবার উপযুক্ত। সে কারণেই সূফিদেরকে অর্থাৎ যারা খানকায় অবস্থান করা বা ঘরকুনে থাকার বিষয়টিকে প্রচার করে বেড়ায় তাদেরকে ইকবাল ভর্ৎসনা করেছেন। ইকবালের মতে ইসলাম তার আবির্ভাবকাল থেকেই একটা সামাজিক,পার্থিব এবং দৈশিক ধর্ম ছিল। কোরআনে বর্ণিত যেসব নীতি বা অধিকারের কথা রয়েছে,তাতে মানব জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি এবং মানুষের পূর্ণতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা রয়েছে।
ইকবাল পাশ্চাত্য দর্শনের অনুকরণ করাকেই মুসলিম জাতির অবয় বা অচলাবস্থার কারণ বলে মনে করেন। ইসলাম হলো ধর্মীয় এবং নীতি-নৈতিকতার সংকলন। কেবল তাই নয় ইসলাম হলো মানুষের সামাজিক জীবনের জন্যে একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। ইসলাম সর্বকালীন অর্থাৎ সর্বকালেই এবং পৃথিবীর সর্বত্রই এই ধর্ম মানুষের সার্বিক জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্যে উপযোগী। ইকবাল মানুষের গড়া সকল মতাদর্শ যেমন পুঁজিবাদ,সমাজতন্ত্র,জাতীয়তাবাদ ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এইসব মতবাদ মানুষকে একে অপরের কাছ থেকে আলাদা করেছে এবং মানবতার ভিত্তিমূলে এইসব মতবাদ ফাটল ধরিয়েছে।
ইকবাল ইসলামকে সার্বজনীন একটি জীবন বিধান বলে মনে করতেন। ইসলাম কোনো একটি গোত্র , গোষ্ঠি বা জাতির কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ভাষাভাষী লোকজনের ধর্ম নয়। বরং ইসলাম হচ্ছে বিশ্বমানবতার মুক্তির ধর্ম। তাই ইসলামের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই,ইসলাম বিশ্বজনীন। ইকবাল কেবল মুসলিম ঐক্যকেই ইসলামী শাসনের মূল ভিত্তি বলে মনে করেন। পবিত্র কোরআন এবং রাসূলে খোদার নির্দেশনায় ঐক্যের যে শিক্ষা রয়েছে তাই পারে মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে। কারণ ইসলামের শিক্ষা সবসময়ই মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক অনৈক্যের পথকে রোধ করেছে। তবে নতুন করে ইসলামী ঐক্যের যে আদর্শের কথা বোঝানো হচ্ছে তা পাশ্চাত্য এবং ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে। খ্রিষ্টিয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদী এই ঐক্যের ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইকবাল যখন জামালুদ্দিন আসাদাবাদীর ইসলামী ঐক্য বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হলেন,তখন তিনি জামালুদ্দিনের ঐ চিন্তার প্রভাবে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। জামালুদ্দিনের আসাদাবাদীর ইসলামী ঐক্যের ঝাণ্ডা কবি ইকবাল ভারতে ওড়ালেন।
ইকবাল সবধরনের বর্ণবাদকে ঘৃণা করতেন এবং এই বর্ণবাদকে তিনি যুদ্ধ-সংগ্রামসহ সকল প্রকার মন্দ কাজের কারণ বলে মনে করতেন। কবি ইকবাল সূরা এখলাসের ব্যাখ্যা শিরোনামে লেখা একটি কবিতায় সকল মুসলমানকে ঐক্যের আহ্বান এবং নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধ দূর করারও আহ্বান জানান। কারণ তিনি ঐক্যকে সমগ্র মানবতার বিশেষ করে মুসলমানদের মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করতেন।
آنكه نام تو مسلمان كرده است
از دوي سوي يكي آورده است
خويشتن را ترك و افغان خوانده اي
واي بر تو آنچه بودي مانده اي
দ্বৈতের লক্ষ্য একমুখী বলে
তুমি মুসলমান শিরোপা পেলে
নিজেকে বলো যদি তুর্কি কিবা আফগান
হায়রে কপাল,পূর্বাবৎ তুমি অপরিবর্তমান।
সূত্রঃ ইরান বাংলা রেডিও