ওহাবি মতবাদঃ ১৬তম পর্ব

ওহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব 'কাশফুশ শাব্‌হাত' নামক গ্রন্থে দাবি করেছেন, 'শাফায়াত' এবং 'তাওয়াসসুল' শির্‌কের প্রকারভেদ। এ কারণে বহু মুসলমানকে মুশরিক বলে অভিহিত করেছে।এই ফের্কার দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের অপরাপর ফের্কার সাথে সম্পূর্ণ পৃথক

ওহাবি মতবাদঃ ১৬তম পর্ব
আল্লাহর অলিদের কাছে শাফায়াত কামনা করতে নিষেধ করার পেছনে সর্বপ্রথম কারণটি হলো এটা শির্‌ক বা অংশীবাদের পর্যায়ভুক্ত। কেননা তাদের বিশ্বাস শাফায়াতের আবেদন আসলে শাফায়াতকারীর পূজা করার মতো বিষয়। অর্থাৎ শাফায়াতের আবেদন করার মধ্য দিয়ে বান্দা আসলে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং এভাবে আল্লাহর একত্ববাদী সত্ত্বার সাথে শরিক করা হয়। ওহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব 'কাশফুশ শাব্‌হাত' নামক গ্রন্থে দাবি করেছেন, 'শাফায়াত' এবং 'তাওয়াসসুল' শির্‌কের প্রকারভেদ। এ কারণে বহু মুসলমানকে মুশরিক বলে অভিহিত করেছে।এই ফের্কার দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের অপরাপর ফের্কার সাথে সম্পূর্ণ পৃথক। মূলত ওহাবিরা শাফায়াতের বিষয়টিকে ভুল বুঝেছে। এদের দৃষ্টিভঙ্গির জবাবে বলা উচিতঃ শাফায়াতের যে কোনো প্রকার আবেদনকে তখনই শির্‌ক বলে পরিগণিত করা যায় যখন শাফি বা শাফায়াতকারীকে 'ইলাহ', 'খোদা', 'সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক' ইত্যাদি বলে মনে করা হয়। কিন্তু আল্লাহর দরবারে প্রকৃত শাফায়াতকারীদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করা শির্‌ক নয়; কেননা শাফায়াতের আবেদনকারী শাফায়াতকারীদেরকে আল্লাহর মনোনীত এবং ঘনিষ্ট বলেই মনে করে, কখনোই তাদেঁরকে খোদা বলে মনে করে না। বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণেই তাদেঁরকে শাফায়াতের উপযুক্ত বলে মনে করে। অপরদিকে ইসলামের শিক্ষায় এসেছে, শাফায়াতকারীগণ কেবল আল্লাহর সম্মতিতেই অমুশরিক গুনাহগারদের জন্যে শাফায়াত করতে পারবেন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ করার এবং মাগফেরাতের আবেদন করতে পারবেন। পবিত্র কোরআনের আয়াতে আমরা দেখবো পয়গাম্বর (সা) এবং অন্যান্য সঠিক শাফায়াতকারীগণের কাছে শাফায়াতের আবেদন মূলত ঐশী মাগফেরাতের জন্যে এক ধরনের দোয়া। আল্লাহর কাছে অলি-আওলিয়া এবং নবীদের অবস্থান ও মর্যাদা যেহেতু নৈকট্যপূর্ণ, সেজন্যে মুসলমানরা তাদেঁর কাছে আবেদন জানায় তাদের জন্যে যেন একটু দোয়া করেন। কেননা তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ পাক নবী আকরাম এবং তাঁর আওলিয়াদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদের মাধ্যমে গুনাহগারদের গুনাহ দূর করেন।
কোরআনের আয়াত প্রমাণ করছে যে, মানুষের পক্ষে নবীজীর ক্ষমা প্রার্থনা করা পুরোপুরি প্রভাবশালী এবং উত্তম। সূরা মুহাম্মাদের উনিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘ওয়াসতাগফির লিজাম্বিকা ওয়ালিল মু'মিনিন'
অর্থাৎ'তোমার এবং ইমানদার নরনারীর ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো!' একইভাবে সূরা তওবার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ 'ওয়াসাল্লি আলাইহিম ইন্না সালাতাকা সাকানুল লাহুম'
অর্থাৎ 'আর তাদের জন্যে তুমি দোয়া করো! নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া হচ্ছে তাদের জন্যে শান্তির কারণ।'
তো যেখানে নবীজীর দোয়া মানুষের জন্যে এতো উপকারী সেখানে তাঁর কাছে মানুষের দোয়া প্রার্থনায় কীসের বাধা! আর দোয়ার আবেদনে শাফায়াতের আবেদন ছাড়া কি অন্য কিছু রয়েছে?
হাদিসের কেতাবগুলোতেও শাফায়াত শব্দটি 'দোয়া' অর্থেই বেশিরভাগ ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি সহিহ বোখারির লেখক ইমাম মোঃ বোখারি তাঁর গ্রন্থেও 'শাফায়াত' শব্দটিকে দোয়া হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন 'যখনই লোকজন ইমামের কাছে আবেদন জানিয়েছে তাদের জন্যে বৃষ্টি কামনা করতে,তাদের আবেদন তো প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়।' এ কারণে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফায়াত বা দোয়া কামনা করা অবৈধ নয়।
শাফায়াত মানে যে দোয়া তার পক্ষে আরো সুস্পষ্ট অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। হাদিসটি ইবনে আব্বাস রাসূলে খোদা (সা) এর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। বলা হয়েছেঃ 'যখনই কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করে এবং তার জানাযার নামাযে এমন চল্লিশজন মুসল্লি অংশ নেয় যারা আল্লাহর সাথে কাউকে কখনো শরিক করে নি, আল্লাহ ঐ মৃত ব্যক্তির জন্যে তাদের শাফায়াত গ্রহণ করেন।'
সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিস এটি। মৃত ব্যক্তির জন্যে অমুশরিক চল্লিশ জনের শাফায়াত মানে আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তির জন্যে রহমত এবং মাগফেরাত কামনা করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতএব শাফায়াতের স্বরূপ যদি হয় দোয়া করা, তাহলে এই দোয়ার আবেদন করাটা কেন শেরেক হিসেবে পরিগণিত হবে?
শাফায়াতের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে ওহাবিদের আরেকটি কারণ বা দলিল হলো তারা বিশ্বাস করে মুশরিকরা যে আল্লাহর একত্ববাদী সত্ত্বার সাথে অন্যদেরকে শরিক করেছিল অর্থাৎ শির্‌ক করেছিলো, তাদের ঐ শিরকের কারণ ছিল মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াত কামনা। পবিত্র কোরআনেও এই বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা ইউনূসের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "আর তারা অর্থাৎ মূর্তিপূজকরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছু বস্তুর পূজা করে যেগুলো না তাদের কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারে, আর না পারে তাদের কোনো উপকার করতে; আর তারা বলেঃ এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের জন্যে সুপারিশকারী....।"
এই আয়াতকে সামনে রেখে ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীরা বলেনঃ একারণেই নবী করিম (সা) এবং আল্লাহর অলি-আওলিয়াদের কাছে যে-কোনো ধরনের শাফায়াত কামনা করা মূর্তির কাছে মুশরিকদের শাফায়াত কামনা করার শামিল।
সালাফিয়াদের এই আকিদা বিশ্বাসের জবাবে বলতে হয় নবী-রাসূলগণের কাছে শাফায়াত কামনা করা আর মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানো-এই দুয়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যটি হলো মুশরিকরা মূর্তিগুলোকে তাদের খোদা বলে মনে করতো। খোদা মনে করার কারণেই তারা মূর্তিগুলোর কাছে শাফায়াত কামনা করতো। কিন্তু যিনি একজন মুসলমান তিনি আল্লাহর অলি আওলিয়াকে কোনোভাবেই খোদা বলে মনে করেন না। মনে করেন আল্লাহর কাছে মর্যাদার অধিকারী এবং তাঁর খুব নিকটবর্তী একজন বান্দা হিসেবে। আর সে জন্যেই তাদেঁর কাছে শাফায়াত বা দোয়ার আবেদন জানান একজন মুসলমান। কেননা মুসলমানরা বিশ্বাস করেন নবী করিম (সা), উপযুক্ত মুমিন ব্যক্তিগণ, শাহাদাত লাভকারীগণ এবং ফেরেশতাগণ আল্লাহর দরবারে শাফায়াত করার অধিকারের মর্যাদাপ্রাপ্ত। সেজন্যেই মুসলমানগণ দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় জগতেই আল্লাহর দরবারে শাফায়াতকারী হিসেবে তাঁদের কাছে দোয়ার আবেদন জানায়।
সূত্রঃ ইন্টারনেট