হযরত ফাতেমা (আ.)ও নারীর মর্যাদা

হযরত ফাতেমা (আ.)ও নারীর মর্যাদা

হযরত ফাতেমা (আ.)ও নারীর মর্যাদা
মানব জাতিতথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম বা এক বিশেষ নেয়ামত। যুগে যুগে নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে মানুষের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে এ ধর্মেও পূর্ণাঙ্গরূপ মানুষের সামনে উপস্থাপন করাহয়েয়ে। আলাহ তাঁর মনোনীত এ জীবন বিধানকে সকলপ্রকার বিকৃতি ও বিচ্যুতি হতেসংরক্ষিত রেখেছেন।
আলাহর এ বিধানঅনুযায়ী নারী ও পুরুষ সকলই সমান। কাজের ক্ষেত্র, দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিধির মাপে তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মানুষ হিসেবে নারীও পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন সৎকর্মের জন্য অভিন্ন পুরুস্কার ও অভিন্ন অপরাধের জন্য অভিন্ন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তাই মানব ইতিহাসে কিছু সংখ্যক মহীয়সী মহিলাকে দেখা যায় যারা অসংখ্য পূর্ণবান পুরুষদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাবান, যাদের কথা স্বয়ংমহানবী (সা.) পরিরিস্কার ভাবে বলে গেছেন। তাঁরাই হলেন হযরত ফাতিমা (আ.) হযরত খাদিজা (আ.), হযরত মারিয়াম (আ.) ও হযরত আসিয়া (আ.)। হযরত ফাতেমা পৃথিবীও পরকালের নারী কুলের নেত্রী এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে তিনিই সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশ করবেন বলে হাদীসে উল্লেখ আছে ।
হযরত ফাতেমা (আ.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর একমাত্র কন্যা সন্তান যার মাধ্যমে তাঁর বংশধরগণ মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসের মর্মান্তিক ঘটনায় শাহাদত প্রাপ্ত ও জান্নাতের যুবকদের নেতা হযরত ইমাম হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)-এর মা, আল্লাহর নবী (সা.) কর্তৃক ঘোষিত ‘জ্ঞানের দরজা’ হযরত আলী (আ.)-এর স্ত্রী। তাঁর সম্পর্কে প্রিয় নবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ফাতেমা আমার দেহের টুকরা, যে তাকে রাগান্বিত করবে, সে আমাকেই রাগান্বিত করল। -সহীহ রোখারী
নবী করিম (সা.) তাঁর আদরের কন্যার নামরাখেন ফাতিমা, যার অর্থ ‘যাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে’ যেহেতু তিনি অন্য সমস্- নারী থেকে মর্যাদার অধিকারী, তাই তাকে এ নাম দেয়া হয়েছে। হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: তিনি (হযরত ফাতেমা (আ.)) যাবতীয় নৈতিক ও চারিত্রিক অপকৃষ্টতা থেকে দূরে ছিলেন, আর এ কারণেই তাঁকে ফাতিমা বলা হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্বের গুণাবলীর কারণেই তিনি বিভিন্ন উপাধির অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন, সিদ্দিকাহ্‌ (সত্যবাদিনী), মুবারাকাহ্‌ (বরকতময়ী), তাহেরাহ্‌ (পবিত্র), জাকিয়াহ্‌ (পরিশুদ্ধতার অধিকারী), রাজিয়া (সন্তুষ্ট), মারজীয়াহ্‌ (সন্তোষপ্রাপ্ত), মুহাদ্দিসাহ্‌ (হাদীস বর্ণনাকারী) ও যাহরা (প্রোজ্বল)। ইতিহাস বিদ ও মুফাসসিরগণ হযরত ফাতেমা (আ.)-এর আরো বহু উপাধির কথা বললেও তিনি ফাতিমা যাহ্‌রা নামেই সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। মুফাসসিরদের মধ্যে অনেকের মতেকুরআন মজীদের সুরা কাওসার-এর অন্যতম অর্থ হচ্ছে হযরত ফাতেমা (আ.)। কাওসার বলতে একই সাথে হাশরের ময়দানে হাউজে কাওসার ও নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে। নবী করিম (সা.)-এর কোন জীবিত পুত্রসন্তান না থাকায় মক্কার কাফেররা তাকে ‘আবতার বা নির্বংশ বলে বিদ্রূপ করতো। কারণ তৎকালীন আরবে কন্যা সন্তানকে কোন গুরুত্ব দেয়া হত না। এ বিদ্রূপের জবাবে আল্লাহপাক সুরা কাওসারের মাধ্যমে তারই প্রিয় নবীকে জানিয়ে দেন যে, কোন জীবিত পুত্রসন্তান না থাকলেও হযরত নবী করিম (সা.)-কে এমন এক কন্যা সন্তান দান করা হয়েছে যে কাওসার বা আধিক্যের প্রতিমূর্তি যার মাধম্যে সর্বধিক সংখ্যক উত্তম পুরুষ সৃষ্টি হবে। এবং যারা মানব জাতির সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করবেন। আর রোজ হাশরের ময়দানেও আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় নবীকে হাউজে কাওসার দান করবেন, যার রহমতের পানি তিনি নিজ হাতে তাঁর অনুসারীদেরকে পান করিয়ে পরিতৃপ্ত করবেন। বলা বাহুল্য ইসলামের দুশমনরা যারা আলাহর নবীকে নির্বংশ বলে উপহাস করত আজ তারাই বরং সময়ে ব্যবধানে নির্বংশও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর নকবী পাক (সা.)-এর পবিত্র বংশধারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে থাকবে।
হযরত ফাতেমা (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব তো তা-ই যেমনটি একজন স্নেহময় পিতা হিসেবে দুনিয়ার সর্বশেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যাকে নিজ হাতে গড়েছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি গড়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ সমাজের আর্দশনেত্রী হিসেবে। শুধুমাত্র ইলম (জ্ঞান), আমল (জ্ঞানের অনুশীলন), খোদাভীতি, শালীনতা, পবিত্রতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেই যে তিনি নারী কুলের আদর্শ ছিলেন তা নয়, বরং কন্যা, স্ত্রী, মা, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে মানব ইতিহাসের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আলোক বার্তিকা হয়ে থাকবেন। তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর মতান্তরে ২২ বছরের স্বল্পকালীন জীবদ্দশায় বিচ্ছুরিত সুবিশাল ব্যক্তিত্ব হাজার হাজার বছরমানুষকে হেদায়াতের পথ নির্দেশনা দান করবে।
সন্তানদেরলালন-পালনসহ গোটা সংসারের সকল কাজইতিনি নিজ হাতে করতেন। শ্রান্তি-ক্লান্তিও নিকটপরাজিত না হয়ে তিনি নারী সমাজকে নিয়মিত দীনি জ্ঞান দান করতেন। বস্তুত তাঁর শিক্ষা ও নির্দেশনার কারণেই মদীনার নারী সমাজের মধ্যে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সৃষ্টি হয়, যে বিল্পব তাদেরকে পার্থিব ভোগ সর্বস্বতা হতে মুক্ত করে খোদামুখী জীবন ধারার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছিল।
পুরুষদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে নিজেদেরকে সজ্জিত করার হীন মানসিকতা ও প্রচেষ্টা হতে গোটা নারী সমাজকে তিনি পবিত্র কওে তোলেন। প্রসংগত বলা যেতে পারে যে, এমন এক সময় ও পরিবেশে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন যখন নারীকে মানুষবলে গন্য করা হত না। পুরুষের ভোগের সামগ্রী হয়ে হাত বদলের একটা পণ্য ছিল সে। তখনকার সমাজে মেয়ে সন্তানকে গোটা পরিবারেরজন্য গানি ও অপমানের বোঝা মনে করা হত। এমনকি একটা ভয়াবহও নষ্ট সমাজে তিনি নারীদের মর্যাদা, অধিকার ও ব্যক্তিত্বকে পুরুষদের সমকক্ষ করে তোলেন। এমন কি অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদেও শিক্ষক হিসেবেও তিনি নিজকে প্রমাণিত করেছেন। অনেক সাহাবী (রা.) তাঁর নিকট থেকে সরাসরি হাদীসের বর্ণনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় বলা প্রয়োজন। নারী প্রগতির তথাকথিত স্বর্ণযুগেও মূলত নারীর হাতে-পায়ে নিত্য নতুন বেগীর ব্যবস্থাকরা হচ্ছে। প্রগতির চটকদার বুলিতাদেরকে নতু নতুন দুর্গতির ফাঁদে ফেলছে। অধিকাং ক্ষেত্রেই আজও নারীরা পণ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে বিজ্ঞাপন মডেল, সন্দরী প্রতিযোগীতা ইত্যাদি সব নিকৃষ্ট আয়োজন অতীতের মত এখনও বিকৃত রুচির পুরুষদেরই শয়তানী মগজের ফসল। এরাইএকদিন নারীদের মানব সমাজ বর্হিভূতমনে করত। তাদেরকে ভূত-পেত্নী বলে বিবেচনা করত। তাদের বিকৃত রুচির পরিতৃপ্তিরজন্য নারী নামের পুতুল কিভাবে সাজানো দরকার, তাদের ভোগের প্রাসাদ হিসেবে কিভাবে তার উৎকৃষ্ট ব্যবহার করা যায় এসব নষ্ট চিন্তা ও পরিকল্পনাকে তারা নারী অধিকার, নারী মুক্তি ইত্যাদির সুশোভন মোড়কে বাজারজাত করছে। অথচ শুরু হতেই নারীকে দিয়েছে তার সম্মান, পুরুষের সমান মর্যাদা। হযরত ফাতেমা (আ.)-এর জীবন হলো এ মর্যাদারই প্রতীক।