মদিনায় রাসুলের (সা.) হিজরত ও ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা

ইসলামের পূর্বে দিন - তারিখ গণনার জন্য আরবদের এমন কোন ঐতিহাসিক উৎস ছিল না যাকে কেন্দ্র করে তারা কয়েক দশক বা শতাব্দীকে চিহ্নিত করতে পারত। অবশ্য তারা তারিখ গণনার জন্য এক দশক বা কয়েক দশকের মধ্যে ঘটমান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহকে উৎস করে তা কেন্দ্রিক সাময়িক তারিখ

মদিনায় রাসুলের (সা.) হিজরত ও ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা
ইসলামের পূর্বে দিন - তারিখ গণনার জন্য আরবদের এমন কোন ঐতিহাসিক উৎস ছিল না যাকে কেন্দ্র করে তারা কয়েক দশক বা শতাব্দীকে চিহ্নিত করতে পারত। অবশ্য তারা তারিখ গণনার জন্য এক দশক বা কয়েক দশকের মধ্যে ঘটমান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহকে উৎস করে তা কেন্দ্রিক সাময়িক তারিখ গণনা করত।
যেমন আবরাহামের হাতি বাহিনীর মাধ্যমে মক্কা শহর হামলা ও কাবা ঘর সংস্কারের বছর যা “হাতির বছর” নামে খ্যাত, কয়েক যুগ পর্যন্ত তারিখ গণনার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে হযরত মোহাম্মাদ (সা.) এর নবুওয়তের সময় যখন তিনি আরকামের বাসায় যান, তা তারিখ গণনার উৎস হিসেবে পরিণত হল।
পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহর (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মদিনায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। কোরানের দৃষ্টিতে হিজরতের গুরুত্ব ও ইসলামের উন্নয়ন -সম্প্রসারণে হিজরতের মূল পটভূমিকার জন্য পরবর্তীতে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিণত হয়। আর মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে আমরা দু’টি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করতে পারি। প্রথমত: রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ ও দ্বিতীয়ত: শরিয়তগত ও এলাহী দৃষ্টিকোণ। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিজরতের পর মদিনায় ইসলামের একটি শক্তিশালী - নিরাপদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী সমাজে এক নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কারণে হিজরত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবং শরিয়তগত ও এলাহী দৃষ্টিকোণ থেকে যেহেতু হিজরতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ হয়েছিল, তাই এটি একটি শরিয়তি দায়িত্ব ছিল, আর যদি কেউ বিনা কারণে মক্কায় অবস্থান করতো তাহলে বিনা কারণে এই অবস্থান তার জন্য গোনাহ বিবেচিত হত, তাই শরিয়তি দিক থেকেও হিজরত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আর উপরোক্ত কারণসমূহ হিজরতের বিষয়টিকে ইসলামী বর্ষ পঞ্জিকার সূচনা হওয়ার বিষয়টিকে যথাযথভাবে অনুমোদন করে।
কিন্তু সঠিক কখন থেকে হিজরত ইসলামী বর্ষপঞ্জির উৎস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে তা সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকের মতে প্রায় হিজরতের ১৭'তম বর্ষে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর বিভিন্ন কারণে ইসলামী ইতিহাসের সূচনা নির্ধারণের জন্য ইসলামী বর্ষপঞ্জি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।  এ বিষয়টি যখন বিভিন্ন লোকের মাঝে উত্থাপন করা হল তখন প্রত্যেকেই এ বিষয়ে নিজ নিজ প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এক দল নবী করিমের (সা.) জন্ম দিবসকে, কিছু লোক রাসুলুল্লাহর (সা.) নবুওয়ত প্রাপ্তির দিবসকে আবার কেউ কেউ রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যু দিবসকে বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে প্রস্তাব করে। এরই মাঝে আমিরুল মোমিনিন হযরত আলী (আ.) রাসুলুল্লার (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দিনটিকে ইসলামী ইতিহাস ও বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে প্রস্তাব করেন এবং এই প্রস্তাবটিই গৃহীত হয়। আর এ দৃষ্টিভঙ্গিটি “আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া” বইয়ের ৭'ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩ ও ৭৪ এবং ইবনে জওযি’র লেখা“তারিখে ওমার ইবনে খাত্তাব” এর ৭৫ ও ৭৬ নং পৃষ্ঠা এবং “তাহযিবুত তারিখ ইবনে আসাকের” এর ১'ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২ ও ২৩ এবং “আল কামেল” (ফিত তারিখ) এর ১'ম খণ্ড, ১০ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে। অপর পক্ষে অনেকের মতে, যার মধ্যে ইবনে শাহাব যোহরি অন্যতম এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা প্রবেশের শুরুতেই ইসলামী বর্ষপঞ্জি সূচনা নির্ধারণের জন্য নির্দেশ দেন এবং তা কার্যকর করেন। আর এ দৃষ্টিভঙ্গির স্বপক্ষে যে যুক্তিসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে তা হচ্ছে:
১। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বছর মদিনায় প্রবেশ করেন সে বছরই হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হয় এবং ওই বছরই আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর জন্ম গ্রহণ করে। (মোস্তাদরাক আল হাকেম, ৩'য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩ ও ১৪; মাজমাউয যাভায়েদ, ১'ম খণ্ড, ১৯৬ নং পৃষ্ঠা; (তারিখ) তাবারি, ২'য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৯ ও ৩৯০)।
২। যোহরির মত অনেক ইতিহাসবিদদের মতে হিজরতের প্রথম বছরের রবিউল আউয়াল মাসে স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশেই হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়। আর এই মতটি বিভিন্ন বইতে যেমন: ফাতহুল বারি, ৭'ম খণ্ড, ২০৮ নং পৃষ্ঠা; আত তানবিহু ওয়াল আশরাফ, পৃষ্ঠা: ২৫১; তারিখে তাবারির ২'য় খণ্ড, ৩৮৮ নং পৃষ্ঠা (দারুল মা'আরিফ হতে প্রকাশিত); এবং তারিখুল খামিস এর ১'ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং ৩৩৮ এ বর্ণিত হয়েছে।
৩। ইতিহাসবিদ সাখাভির মতে “সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা করে সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে, ‘তারিখে দামেস্ক’ নামক বইতে ইবনে আসাকের আনাস (ইবনে মালেক) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রবেশের সময়ই বর্ষপঞ্জি ছিল, আসহায়ি থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে হিজরতের প্রথম বছরেই রবিউল আউয়াল মাসে বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়। (আল আ’লানু বিত তাওবিখ লিমান ইয়াযুম্মুত তারিখ, পৃষ্ঠা: ৭৮)।
৪। রাসুলুল্লাহর (সা.) সময়ের  চিঠিপত্র ও বিভিন্ন দলিল প্রমাণ বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, যাতে হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তারিখ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আর এ বিষয়টি প্রমাণিত করে যে রাসুলুল্লাহর (সা.) সময়ই হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হয় এবং হযরত ওমর হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রতিষ্ঠাতা নন। আর উল্লেখিত এ চিঠিপত্র ‘শারিফুস সাহিহ মিন সিরাতুন নাবী (সা.)’ নামক বইয়ের ৪'র্থ খণ্ডে সংগৃহীত করা হয়েছে; পাঠকবৃন্দ প্রয়োজনে সেখানে দেখতে পারেন।
বিশিষ্ট গবেষক জনাব আল্লামা জাফর মোর্তজা আমলি হিজরি বর্ষপঞ্জি স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সা.) সময় তাঁর হাতেই সূচনা হয় এ ভিত্তিতে উপরোক্ত ও অন্যান্য যুক্তি প্রমাণের উল্লেখ করার সাথে এ বিষয় টি উপস্থাপন করেন যে, দ্বিতীয় খলিফার যুগে যে বিষয়টি সম্পর্কে পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করা হয়, তা হচ্ছে হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস রবিউল আউয়ালের পরিবর্তে মুহররম মাস নির্ধারণ করা। কেননা হিজরি বর্ষপঞ্জির উৎস ও তার সূচনাকাল সম্পর্কে দ্বিতীয় খলিফার যুগে কোন প্রকার মতপার্থক্য ছিল না। কেননা এ কাজটি স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সা.) সময়ই স্বীকৃতি লাভ করেছিল।
 হিজরি বছরের প্রথম মাস কি হবে এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত উপস্থাপিত হয়েছিল, যেমন: রজব মাস ও রমজান মাস ইত্যাদি। তবে যেহেতু মুহররম মাস হজ্জ অনুষ্ঠানের পর ছিল তাই এ দৃষ্টিভঙ্গি গৃহীত হল এবং হযরত ওমরের নির্দেশেই মুহররম মাস হিজরি বছরের প্রথম মাস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
যাইহোক উপরোক্ত সকল দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের সার সংক্ষেপ হচ্ছে এই যে, রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনেই বিভিন্ন ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে হিজরত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) এটিকে স্থায়ীভাবে ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন কিনা সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে।
এখানে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করবো এবং তার উপর ভিত্তি করে তৃতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবো। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হচ্ছে যে, “যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন তখন কোন বর্ষপঞ্জি ছিল না, কিন্তু তাঁর মদিনায় প্রবেশের দু'তিন মাস পর থেকে জনগণ বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা শুরু করে -নিয়মমাফিক এটি রাসুলুল্লাহর (সা.) হিজরত ছিল- আর এই বর্ষপঞ্জি রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যু পর্যন্ত বলবত ছিল অতঃপর এতে ব্যাঘাত ঘটে এবং হযরত আবু বকরের সম্পূর্ণ খিলাফতকাল ও হযরত ওমরের খেলাফতের প্রথম চার বছর সময় পর্যন্ত কোন বর্ষপঞ্জি ছিল না, অতঃপর বর্তমান হিজরি বর্ষপঞ্জি বিধিবদ্ধ করা হয়।
এখন ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদিসের উপর ভিত্তি করে তৃতীয় যে দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রদান করা যায় তা হচ্ছে উপরোক্ত দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়, এমনটি যে, হিজরত হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে রাসুলুল্লাহর (সা.) সময়ই স্বীকৃতি লাভ করে, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম সমাজে বিভিন্ন ঘটনাবলী ও মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় এ বিষয়টি গাফিলতি ও উদাসীনতার স্বীকার হয় এবং দীর্ঘসময় পর হযরত ওমরের খিলাফতকালে বিভিন্ন বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ও ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা অনুভব হওয়ায়, পুনরায় এ বিষয়টি উত্থাপিত হয় এবং সাহাবিদের মতামতের ঐক্যের ভিত্তিতে হিজরি বর্ষপঞ্জির পূনঃসূচনা হয়। সুতরাং হিজরত কখন থেকে ইসলামী ইতিহাস ও বর্ষপঞ্জির উৎস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে সে সম্পর্কে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করা যেতে পারে:
১। এটি হিজরতের প্রথম বর্ষে এবং স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে স্বীকৃতি লাভ করে।
২। হিজরতের ১৭'তম বর্ষে দ্বিতীয় খলিফা কর্তৃক পরামর্শের ভিত্তিতে ও আমিরুল মোমিনিন হযরত আলী (আ.) এর প্রস্তাব অনুযায়ী হিজরত হিজরি বর্ষপঞ্জির উৎস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
৩। সর্বপ্রথম এটি রাসুলুল্লাহর (সা.) সময় স্বয়ং তাঁর নির্দেশেই স্বীকৃতি লাভ করে কিন্তু পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পর তা বিভিন্ন কারণ বশত উদাসীনতার স্বীকার হয় এবং দ্বিতীয় খলিফার আমলে আমিরুল মোমিনিন হযরত আলী (আ.) এর প্রস্তাবে মদিনাতে রাসুলের (সা.) হিজরত পুনরায় ইসলামী বর্ষপঞ্জির উৎস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
 
সূত্রসমূহ:
১। সিরেয়ে রাসুলে খোদা (সা.), রাসুল জাফারিয়ান।
২। আস সাহিহ মিন সিরাতিন নাবিয়িল আ’যাম, ৪'র্থ খণ্ড, আল্লামা জাফর মোর্তজা আমলি।
৩। সাইয়েদুল মুরসালিন, ১'ম খণ্ড, আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানি।
 
সূত্রঃ ইন্টারনেট