ইমাম হাসান (আ.) কেন জো’দা বিনতে আশআশকে বিবাহ করেন?

আশআশ-এর কন্যার নাম সম্পর্কে ইতিহাসে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: অনেকেই তার নাম সকিনা, সাআসা এবং আয়েশা বলেও উল্লেখ করেছন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে জোয়দা। (মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৫০)

ইমাম হাসান (আ.) কেন জো’দা বিনতে আশআশকে বিবাহ করেন?

এস, এ, এ

জো’দা বিনতে আশআশের বংশ পরিচিতি:

আশআশ বিন কাইস কেনদি তার গোত্রের একজন প্রভাশালি ব্যাক্তি ছিল। তৎকালিন আরব সমাজে যুগে তার গোত্র অতি পরিচিত ছিল এবং উক্ত গোত্রটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতো। সে যখন রাসুল (সা.)এর মদিনায় হিজরতকালে তার বয়স ছিল ২৫ বছর। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সে তার পিতা কেইস আশজা-এর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মুসলমানদের বিরূদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সে যুদ্ধে পারজিত ও আটক হলে অবশেষে ৩ হাজার উট মুক্তিপণ প্রদানের মাধ্যমে সে মুক্তি লাভ করে।

 অবশেষে সে তার গোত্রের কিছু ব্যাক্তিদের সাথে নিয়ে মদিনায় ফিরে আসে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু রাসুল (সা.)এর ওফাতের পরে কেনদে গোত্রের অনেকেই মুরতাদ হয়ে যায়। কিন্তু আশআশ বিন কাইস মুসলমানদের মাঝে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালি করার লক্ষ্যে সুযোগর সন্ধানে জিবন যাপন করতে থাকে।

এক পর্যায়ে যিয়াদের সৈন্যদের সাথে তার দ্বন্দ বাধে। কিন্তু সেখানে সে আবারও পরাজিত হয়। সে নিজেকে এবং তার পরিবার পরিজনকে রক্ষার জন্য একটি দূর্গে আশ্রয় নেয় এবং দূর্বিসহ অবস্থায় পতিত হয়। অবশেষে সে যিয়াদের কাছে শান্তিপত্র লিখে এবং যিয়াদ তা মেনে নেয়। তার উক্ত কার্যকলাপের জন্য তৎকালিন লোকজন “উরফুন নার” নামে অভিহিত করা হয়। যখন তাকে বন্দি করে মদিনায় আনা হয় তখন খলিফা হজরত আবু বকর তাকে মুক্ত করে দেন এবং স্বিয় বোনের সাথে তার বিবাহ দেন।

খলিফা উসমানের শাসনামলে সে আযারবাইজানে দ্বায়িত্ব অর্জন করে। কিন্তু যখন হজরত আলি (আ.) যখন খেলাফতের পদে আসিন হন এবং জামালের যুদ্ধের পরে তাকে বলেন: তোমার আযারবাইজানের কোষাগারে যা রয়েছে তা আমাকে বুঝিয়ে দাও। যদিও সে সিফফিনের যুদ্ধে হজরত আলি (আ.)এর পক্ষে থেকে মাবিয়ার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু হজরত আলি (আ.)তাকে সেরূপভাবে বিশ্বাস করতেন না।

তার প্রমাণ যখন হজরত আলি (আ.) এর সৈন্য দলের কাছে মাবিয়া নিজের পরাজয়কে অবলোকন করছিল তখন সে আশআশের কাছে পত্র লিখে যেন ইমাম আলি (আ.)কে যুদ্ধকে পরিত্যাগ করে আলোচনা করতে বাধ্য করে। যখন সে হজরত আলি (আ.)কে যুদ্ধ বিরতি দিয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দেয়। তখন ইমাম আলি (আ.) তার উক্ত প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেন। তখন সে কেনদি গোত্রের লোকজনদের মাঝে বক্তব্য দেয়া শুরু করে। মাবিয়া যখন তার উক্ত বক্তব্যর খবর সম্পর্কে অবগত হয় তখন সে কোরআনকে বর্শার মাথায় তোলার নির্দেশ দেয়। এমতাবস্থায় সে ইমাম আলি (আ.)কে বাধ্য করে যেন শাম থেকে এক এবং কেনদি গোত্র থেকে আবু মুসা আশআরিকে নির্বাচন করার পরামর্শ দেয় যে তারা উভয়ে তাদের খলিফাকে খেলাফতের পদ থেকে পদচ্যুত করবে।

যখন সন্ধিনামায় অঅমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) লিখা হয় তখন মাবিয়ার দলের লোকজন উক্ত শব্দের বিরূদ্ধে অভিযোগ করে। তখন আশআশ হজরত আলি (আ.)এর নামের পূর্বে আমিরুল মুমিনিন শব্দটি মুছে দিতে বাধ্য করে। যখন উভয় পক্ষ থেকে খলিফাকে পদচ্যুত করার প্রস্তাব পাস হয়। তখন মাবিয়ার কুটিলতার কারণে তার দলের লোক তাকে খলিফা পদ থেকে পদচ্যুত না করে তাকে খলিফা হিসেবে স্বিয় পদে বহাল রাখে। অপরদিকে আবু মুসা আশআরি মাবিয়ার কুটিলতার জালে পড়ে হজরত আলি (আ.)কে খলিফা পদ থেকে বিচ্যুত করে। যখন হজরত আলি (আ.) উক্ত অবস্থা দেখেন তখন আবার তিনি মাবিয়ার সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তাব দেন কিন্তু আশআশ বিন কাইস যুদ্ধের প্রতি অনিহার অজুহাতে কুফাতে ফিরে যায়।

অবশেষে হজরত আলি (আ.)কে হত্যার পরিকল্পনায় ইবনে মালজামকে আশআশ বিন কাইস  সহায়তা করে। তার বড় ছেলে মেয়ে সকলেই ছিল আহলে বাইত (আ.)এর শত্রু। কিন্তু তারপরেও যতক্ষণ তারা স্পষ্ট অপকর্মে লিপ্ত হয়নি ততক্ষণ আহলে বাইত (আ.)ও তাদের প্রতি কোন প্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি। আশআশের পরিবার প্রায় তৃতিয় শতাব্দি পর্যন্ত কুফাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিল।

কিভাবে ইমাম হাসান (আ.)এর সাথে জো’দা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়?

আশআশ-এর কন্যার নাম সম্পর্কে ইতিহাসে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: অনেকেই তার নাম সকিনা, সাআসা এবং আয়েশা বলেও উল্লেখ করেছন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে জো’দা।

ইতিহাসে ইমাম হাসান (আ.) এর সাথে জো’দা-এর বিবাহ সম্পর্কে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম আলি (আ.) সাঈদ বিন কাইস হামেদানিকে তার কন্যা উম্মে ইমরান-এর সাথে ইমাম হাসান (আ.)এর বিবাহ দেন। তখন সে ইমাম আলি (আ.) বলে: আমাকে একটু সময় দিন যেন আমি তার সাথে পরামর্শ করতে পারি। যখন সে ইমাম আলি (আ.)এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যেতে থাকে তখন পথিমধ্যে তার ভাই আশআশ বনি কাইসের সাথে সাক্ষাত হয়। সাঈদ আশআশকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করে। তখন আশআশ যেহেতু মুনাফিক ছিল সে সাঈদকে বলে: তুমি কেন হাসানের সাথে তোমার মেয়ের বিবাহ  দিতে রাজি হচ্ছো। তুমি কি জান না যে হাসান একজন গর্বকারি, অহংকারি এবং তাঁর আচার আচরণ ভাল না। তার চেয়ে কি এটা ভাল হবে না যে, তুমি আমার সন্তান মোহাম্মাদের সাথে  তোমার মেয়ের বিবাহ দাও। তারা একে অপরের উপযুক্ত! তখন সে আশআশের ছেলের সাথে নিজের কন্যার বিবাহের পাকা কথা দেয়। এদিকে আশআশ ইমাম আলি (আ.)এর সমিপে এসে জিজ্ঞাসা করে শুনলাম আপনি নাকি সাঈদের ছেলের সাথে হাসানের বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন? কিন্তু তা আর সম্ভব না কেননা সে তার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিবাহ দিবে বলে পাকা কথা দিয়েছে। সে ইমাম আলি (আ.)কে বলে: তবে আপনি যদি সম্মতি দেন তাহলে হাসানের সাথে আমার কন্য জো’দার বিবাহ দেয়ার জন্য আমি প্রস্তুত আছি। আর আমার দৃষ্টিতে তারা একে অপরের উপযুক্ত। তখন ইমাম আলি (আ.) জো’দাকে নিজের পুত্রবধু করতে সম্মতি প্রদান করেন।

অপরদিকে সাঈদ যখন বুঝতে পারে যে আশআশ তার সাথে প্রতারণা করেছে। তখন সে আশআশকে বলে:তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ। তখন আশআশ বলে: তোমার মতো লোকের সাথে এমনটিই হওয়া সমুচিত। কেননা তুমি রাসুল (সা.) এবং হজরত আলি (আ.) এর সন্তানের প্রতি সন্দিহান ছিলে। আশআশ তাড়াতাড়ি তাদের বিবাহ সম্পাদনের আয়োজন শুরু করে দেয়। আর অপরদিকে সাঈদ তার উক্ত ওয়াদা ভঙ্গের কারণে ইমাম আলি (আ.)এর কাছে যেতে লজ্জাবোধ করে। আর এভাবেই ইমাম হাসান (আ.)এর সাথে জোয়দার বিবাহ সম্পন্ন হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে জো’দার সাথে ইমাম হাসান (আ.)এর বিবাহ ছিল রাসুল (সা.)এর বিবাহের ন্যায় একটি রাজনৈতিক বিবাহ। কেননা কুফাতে আশাআশের অনেক প্রভাব ছিল। কিন্তু অবশেষে জো’দা ইমাম হাসান (আ.) কে বিষ দানের মাধ্যমে তার প্রকৃতরূপকে প্রকাশ করে এবং জাহান্নামের রাস্তাকে নিজের জন্য নির্বাচন করে নেয়। মাবিয়াও তার ওয়াদাকে পূর্ণ করে না। এজিদের সাথে জোয়দার বিবাহ দেয় না।

অনেকের মনে প্রশ্নের সঞ্চার হতে পারে যে, কেন ইমাম হাসান (আ.) জো’দার মতো একজন নারিকে বিবাহ করেন? উক্ত প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন আলেমগণ এভাবে দিয়েছেন যে, ইমাম (আ.)গণ কখনও কোন ব্যাক্তিকে গুনাহ করার পূর্বে অপবাদ বা শাস্তি প্রদান করেননি। অনুরূপভাবে বিভিন্ন নবিগণও ইমাম হাসান (আ.)এর ন্যায় তাঁদের স্ত্রীদের কাছ থেকে কষ্ট সহ্য করেছেন যেমন: হজরত নূহ, হজরত লুত, হজরত হুদ, হজরত মোহাম্মাদ (সা.)। সুতরাং ইমাম হাসান (আ.)এর বিবাহের বিষয়টি নতুন কোন বিষয় ছিল না বরং যুগে যুগে বিভিন্ন নবিগণ এধরণের কষ্ট সহ্য করেছেন।

কেন জো’দা বিনতে আশআশ-এর কাছ থেকে কেসাস নেয়া হয়নি?

শাইখ মুফিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যখন ইমাম হাসান (আ.)কে বিষ প্রদান করা হয় এবং বিষের প্রভাবে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুণছিলেন। তখন তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)কে ডেকে বলেন: হে আমার ভাই আমাকে বিষ প্রদান করা হয়েছে আর হয়তো আমি বেশিদিন তোমাদের মাঝে থাকতে পারবো না। আমি জানি কে আমাকে বিষ পান করিয়েছে। কিন্তু আমি তোমার কাছে আবদার করছি যে আমার পরে তার কাছ থেকে আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিও না। কেননা আল্লাহ তায়ালা তার বিচার করবেন।

ইমাম হাসান (আ.)এর পরে জো’দা বিনতে আশআশ:

ইমাম হাসান (আ.)এর পরে জো’দা বিনতে আশআশ আরো দুইজন ব্যাক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। প্রথমজন ইয়াকুব বিন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ। তার থেকে তিনজন পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তন্মধ্যে দুইজন তার পিতার জিবিত অবস্থায় মারা যায়। এজিদের নির্দেশে হাররা নামক হামলায় ইয়াকুব বিন তালহা মারা যায়। তখন জো’দা আবার ইবনে আব্বাসের সন্তান আব্বাস বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আব্বাস থেকে দুটি সন্তান একটি ছেলে মোহাম্মাদ এবং একটি মেয়ে যার নাম ছিল কারিবা। বর্তমানে তাদের আর কোন বংশধর বেঁচে নেই। তবে জো’দা কিভাবে মৃত্যু বরণ করে ইতিহাসে তেমন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।

তথ্যসূত্র:

১- ইবনে শাহর আশুব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০২।

২- বালাযুরি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬৯।

৩- তাবাকাত ইবনে সাআদ, খন্ড৫, পৃষ্ঠা ১২৩।

৪- তারিখে মাসউদি, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৮২।

৫- মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৫০।

৬- তারিখে ইবনে আসাকের, খন্ড ৪, পৃ্ষ্ঠা ২১৬।