হজরত কাসিম বিন হাসান (আ.) কিভাবে শাহাদত বরণ করেন?

হজরত কাসিম (আ.)এর পিতার নাম ছিল হজরত হাসান মুজতবা (আ.) এবং মাতার নাম ছিল রোমেলা, নুফাইলা বা নাজমা বলে উল্লেখিত হয়েছে। ইতিহাসের কোথাও তাঁর জন্মতারিখ নিদৃষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে যে তিনি ৪৮ হিজরি ৫ই রমজান মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। হজরত কাসিম

হজরত কাসিম বিন হাসান (আ.) কিভাবে শাহাদত বরণ করেন?

এস, এ, এ

হজরত কাসিম (আ.)এর পিতার নাম ছিল হজরত হাসান মুজতবা (আ.) এবং মাতার নাম ছিল রোমেলা, নুফাইলা বা নাজমা বলে উল্লেখিত হয়েছে। ইতিহাসের কোথাও তাঁর জন্মতারিখ নিদৃষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে যে তিনি ৪৮ হিজরি ৫ই রমজান মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। হজরত কাসিম (আ.) ইমাম হাসান (আ.)এর মৃত্যুর ২-৩ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। আর এ কারণে তিনি তাঁর জিবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন এবং ইমাম হুসাইন (আ.)এরতত্ত্বধানে লালিত পালিত হন। তিনি দেখতে ইমাম হাসান (আ.)এর সদৃশ্য ছিলেন। আর এ কারণে যখন ইমাম হুসাইন (আ.) তার ভাইয়ের কথাকে স্মরণ করতেন তখন তিনি হজরত কাসিমের চেহারার প্রতি লক্ষ্য করতেন এবং তাঁকে অতিরিক্ত আদর ও স্নেহ করতেন। তিনি হজরত কাসিম (আ.)কে নিজের কোলে নিয়ে আদর করতেন। হজরত কাসিম দেখতে এতই সুন্দর ছিলেন যে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে চাঁদের ‍টুকরার সাথে তুলনা করতেন। ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে এতই বেশি ভালবাসতেন যে তাঁকে নিজের সন্তান বলে ডাকতেন।

সন ৫০ হিজরিতে যখন ইমাম হাসান (আ.)কে জোওদা বিন আশআশ বিষ প্রদান করে এবং ইমাম হাসান (আ.) বুঝতে পারেন যে তিনি আর বাঁচবেন না তখন তিনি তাঁর আত্মিয় স্বজনদেরকে ওসিয়ত করা শুরু করেন এবং হজরত কাসিমকে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)এর হাতে সপে দেন। তখন থেকে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিরূদ্ধে মাবিয়ার ষড়যন্ত্রকে দেখছিলেন।

ইমাম হুসাইন (আ.)ও কখনও হজরত কাসিম (আ.)কে এক মূহূর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দেননি। এমনকি মদিনার পরিবেশ কলুষিত হয়ে গেলে যখন তিনি মক্কার অভিমুখে রওনা হন তখনও তিনি ইমাম হাসান (আ.)এর পরিবার পরিজনকে নিজের সাথে নিয়ে যান। যখন হুসাইনি কাফেলা কারবালার মরূ প্রান্তরে পৌছায় তখন হজরত কাসেম (আ.)এর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর।

 আবু হামযা সোমালি ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন: আশুরার রাতে যখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সাহিবেদের বলছিলেন যে এজিদি বাহিনিরা হচ্ছে আমার রক্তের পিপাষু আমি তোমাদের উপর থেকে আমার বাইয়াতকে তুলে নিচ্ছি। তোমরা রাতের অন্ধকারে এখান থেকে চলে যাও।  কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)এর সঙ্গিদের মধ্যে আর কেউ ইমাম হুসাইন (আ.)কে ছেড়ে যায়নি। তখন তাদের মধ্যে থেকে হাসানের তনয় হজরত কাসিম (আ.) চাচা হুসাইন (আ.)কে জিজ্ঞামা করেন হে চাচা! আগামিকাল কি আমাকেও তারা হত্যা করবে। ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর উত্তরে বলেন: হ্যা আগামিকাল আমাদের সবাইকে তারা হত্যা করবে। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) হজরত কাসিম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করেন মৃত্যু সম্পর্কে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি কি? হজরত কাসিম (আ.) বলেন: আমার কাছে মৃত্যু হচ্ছে মধুর চেয়েও মিষ্টি। আশুরার দিন যখন হজরত কাসিম (আ.)এর ভাই আবু বকর শাহাদত বরণ করেন তখন ইমাম হুসাইন (আ.) এর কাছে এসে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চায়। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাকে বুকে টেনে নেন এবং উভয়েই ক্রন্দন করতে থাকেন। অতঃপর যখন তিনি তাঁর বাবা ইমাম হাসান (আ.)এর হাতের লিখা ওসিয়তনামাটি ইমাম হুসাইন (আ.) কাছে  নিয়ে আসেন। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর ভাইয়ের লেখা চিঠিটি নিয়ে স্বিয় চোখে স্পর্শ করেন এবং তাতে চুম্বন করেন।  যখন তিনি চিঠিটি খুলেন তখন তিনি দেখেন যে তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)কে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন আমার এ হাদিয়াটি তুমি কবুল করি নিও। অবশেষে তিনি হজরত কাসিম (আ.)কে রণক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি দেন।

আবু মাখনাফ হামিদ বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেছেন হুসাইনি তাবু থেকে যখন হজরত কাসিম (আ.)যুদ্ধের জন্য বাহির হয়ে আসলেন তখন মনে হচ্ছিল যে চাঁদের টুকরা ন্যায় একটি বালক রণভুমি এসেছে। তার পরণে ছিল নরম জামা এবং তার পা ঘোড়ার তুলনায় ছিল বেশ ছোট আর এ কারণে তাঁর পা ঘোড়ার রেকাব পর্যন্ত পৌছায়নি। কিন্তু হজরত কাসিম ছোট হলেও কি হবে তিনি যে হায়দারে কাররারের নাতি ছিলেন তা তিনি সকলের কাছে স্পষ্ট করে দেন। তার সাথে লাড়ায় করতে আসা ৩৫জন এজিদি সৈন্যকে তিনি হত্যা করেন। যুদ্ধরত অবস্থায় আমরু বিন সাঈদ বিন নোফাইল আযাদি নামক এক ব্যাক্তি হজরত কাসিমের দিকে এগিয়ে যায় এবং তার মাথার উপরে তরবারি দ্বারা আঘাত করে। হজরত কাসিম উক্ত আঘাতের কারণে মাটিতে পড়ে যায় এবং ইমাম হুসাইন (আ.)কে সহায়তার জন্য আহবান জানায়।

হামিদ বলে: ইমাম হুসাইন (আ.) বাজ পাখির ন্যায় তড়িৎ গতিতে হজরত কাসিমকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে। ইমাম হুসাইন (আ.) এজিদি সৈন্য বাহিনির সারিকে ছত্রভঙ্গ করে বাঘের ন্যায় তরবারি দ্বারা আমরুর উপরে হামলা করেন। আমরু তাঁর তরবারির আঘাতকে প্রতিহত করার জন্য স্বিয় হাতকে ব্যাবহার করলে তার হাত কুনই থেকে কেটে পড়ে যায়। তখন এজিদি বাহিনিরা ইমাম হুসাইন (আ.)এর উপরে চর্তূদিক থেকে হামলা করে আমরুকে একদিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যেই হজরত কাসিম (আ.) ছোট কোমল দেহটি ঘোড়ার পায়ে পিষ্ঠ হয়ে যায়।

যখন এজিদি বাহিনিরা পিছনে সরে যায় এবং ধুলাময় পরিবেশ শান্ত হয় তখন ইমাম হুসাইন (আ.) দেখেন যে তার ভাইয়ের প্রাণপ্রিয় সন্তানের দেহ কারবালার মরু প্রান্তরে ছিন্ন ভিন্ন অবস্থায় লুটিয়ে রয়েছে। অতঃপর ইমাম হুসাইন (আ.) তার দেহকে মাটি থেকে তুলে নিজের কোলে রাখেন এবং এজিদি বাহিনির প্রতি অভিসম্পত করেন। যখন তিনি হজরত কাসিমের লাশকে তাবুর দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন যে কাসিমের পা ঘোড়ার রেকাবে স্পর্শ করছিল না সেই কাসিমের পা মাটির সাথে স্পর্শ করছিল। অতঃপর তাঁর পবিত্র দেহকে ইমাম হুসাইন (আ.)তাবুর কাছে নিয়ে আসেন এবং অন্যান্য শহিদদের পাশে রেখে দেন। বর্তমানে তার কবর কারবালাতে রয়েছে।