হুসাইনি আদর্শে পালিত বাগ্মি নারি “হিন্দ”

ইতিহাসের এজিদের স্ত্রী হিন্দ ছিল একটি ইয়াহুদি পরিবারের কন্যা এবং তারা স্বপরিবারে মদিনায় বসবাস করতো। তার বাবার নাম ছিল সুহাইল বিন আমরু। সে জন্মগতভাবেই ইন্দ্রিবৈকল্য রোগে আক্রান্ত ছিল এবং শত চিকিৎসার পরেও সে সুস্থ হচ্ছিল না। অবশেষে তাকে ইমাম আলি (আ.) এর ঘরে

হুসাইনি আদর্শে পালিত বাগ্মি নারি “হিন্দ”

জয়নাব, হিন্দা, শাম, এজিদের স্ত্রী, হজরত জয়নাব, ইমাম হুসাইন, এজিদের প্রসাদ, আব্দুল্লাহ বিন জাফর, মদিনা, কারবালা

এস, এ, এ

হিন্দের পরিচয়:

ইতিহাসের এজিদের স্ত্রী হিন্দ ছিল একটি ইয়াহুদি পরিবারের কন্যা এবং তারা স্বপরিবারে মদিনায় বসবাস করতো। তার বাবার নাম ছিল সুহাইল বিন আমরু। সে জন্মগতভাবেই ইন্দ্রিবৈকল্য রোগে আক্রান্ত ছিল এবং শত চিকিৎসার পরেও সে সুস্থ হচ্ছিল না। অবশেষে তাকে ইমাম আলি (আ.) এর ঘরে শেফাআতের জন্য আনা হয়। ইমাম আলি (আ.) ইমাম হুসাইন (আ.) কে একটি পাত্রে পানি আনতে বলেন। ইমাম হুসাইন (আ.) উক্ত পানির পাত্রটি আনার সময় তাঁর হাতটি পানিতে ডুবে ছিল। ইমাম আলি (আ.) উক্ত পানি দ্বারা হিন্দের পরিবারের লোকজনদের বলেন: তারা যেন হিন্দের সারা শরিরে উক্ত পানিটির ছিটায় এবং মালিশ করে। আর এভাবেই হিন্দ সুস্থ হয়ে উঠে। উক্ত ঘটনার পরে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তার বাবার মৃত্যুর পর থেকেই সে আহলে বাইতের (আ.) খাদেম স্বরূপ সেখানে বসবাস করতে থাকে। ইমাম আলি (আ.) এর শাহাদতের পরে সে ইমাম হাসান, ইমাম হুসাইন (আ.) ও হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর ত্বত্তাবধানে লালিত পালিত হয়। পরে আব্দুল্লাহ বিন আমের হিন্দকে বিবাহ করে।

মাবিয়ার ষড়যন্ত্রের শিকার:

বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে হিন্দ সম্পর্কে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিন্দ ছিল আব্দুল্লাহ বিন আমেরের স্ত্রী। সে ছিল অতি সুন্দর এক রমনি। আর তাই এক দেখাতেই এজিদ তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এজিদ তার বাবা মাবিয়াকে জানায় যে, সে হিন্দের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তখন মাবিয়া আব্দুল্লাহ বিন আমের কে শামে ডেকে পাঠায়। মাবিয়া আব্দুল্লাহ বিন আমেরকে বলে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, বাসরার হুকুমত আমি তোমাকে অর্পণ করবো এবং তুমি যদি বিবাহিত না হতে তাহলে আমার কন্যা “রোমেলা” এর সাথে তোমার সাথে বিবাহ দিতাম। তখন আব্দুল্লাহ বলে হে মাবিয়া! আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই। তাহলে তো আর কোন সমস্যা নাই। তখন সে হিন্দকে তালাক দেয় এবং মাবিয়ার কাছে তালাকনামা উপস্থাপন করে। মাবিয়া তাকে ছলনার মধ্যে রাখে যেন তালাকের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যায়।

অতঃপর মাবিয়া আবু হুরাইরার মাধ্যমে মদিনায় হিন্দের কাছে এজিদের প্রস্তাব প্রেরণ করে। আবু হুরাইরা যখন মদিনাতে প্রবেশ করে তখন ইমাম হাসান (আ.) এর সাথে তার সাক্ষাত হয়। ইমাম (আ.) তাকে জিজ্ঞাসা করে হে আবু হুরাইরা মদিনাতে তোমার আগমণের কারণ কি? তখন সে সকল ঘটনা খুলে বলে এবং আব্দুল্লার প্রেরিত তালাকনামাটি দেখায়। ইমাম হাসান (আ.) মাবিয়ার ষড়যন্ত্রকে বুঝতে পারে। তিনি আবু হুরাইরাকে বলেন: এজিদের প্রস্তাব দেয়ার পরে আমার প্রস্তাবটিও হিন্দকে দিও। যখন আবু হুরাইরা হিন্দকে দুটি প্রস্তাব দেয় তখন হিন্দ তাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার মতে আমার কাকে বিবাহ করা উচিত। তখন আবু হুরাইরা বলে: ইমাম হাসান (আ.)কে। হিন্দ আবু হুরাইরার কথা শুনে ইমাম হাসান (আ.)কে বিবাহ করে। যখন মাবিয়া হিন্দের ঘটনাটি জানতে পারে তখন সে মাবিয়া আব্দুল্লাহ বিন আমের কে শামের প্রাসাদ থেকে বাহির করে দেয়। তখন আব্দুল্লাহ মাবিয়ার ষড়যন্ত্রকে বুঝতে পারে। যেহেতু তার আর কিছুই করার ছিল না সেহেতেু সে আবার মদিনাতে ফিরে আসে। পথিমধ্যে ইমাম হাসান (আ.) এর সাথে তার সাক্ষাত হয়। সে মাথাকে নিচু করে ইমাম হাসান (আ.) এর কাছে দাড়িয়ে থাকে। ইমাম তাকে বলে হে আব্দুল্লাহ! আমি মাবিয়ার ষড়যন্ত্রকে বুঝতে পেরেছিলাম আর তাই হিন্দকে বিবাহ করি যেন আবার তোমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি। আব্দুল্লাহ যার পর নাই আনন্দিত হয় এবং ইমাম হাসান (আ.) এর হাতে শ্রদ্ধাভরে চুম্বন করে।

কিন্তু পরে কিভাবে হিন্দ এজিদের স্ত্রী হয় এ সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এজিদের স্ত্রী হলেও তিনি আহলে বাইত (আ.) দের উদারতা, বাদান্যতা এবং উৎসর্গতার কথাকে ভুলে যায়নি। তার প্রমাণ যখন শামে আহলে বাইত (আ.) কে বন্দি অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তখন এজিদের বিরূদ্ধে যে তার ভুমিকা ছিল তা আজও ইতিহাস নিজের বুকে আগলে রেখেছে।

আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি হিন্দের কৃতজ্ঞতা:

এজিদের স্ত্রী হিন্দের অভ্যাস ছিল যখন কোন বন্দিদের কাফেলা কে আনা হতো তখন সে তাদের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে যেত। যখন আহলে বাইত (আ.)কে শামি বন্দি করে আনা হয় তখন এক রাতে হিন্দা তার খাদেমদের সাথে বন্দিদের কাছে আসে। বন্দিদের একজনকে সে জিজ্ঞাসা করে তোমাদের মধ্যে বয়োজৈষ্ঠ কে? একজন হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে দেখিয়ে দেয়। সে আহলে বাইত (আ.) দের ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনে খাবারগুলো রাখে এবং হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর কাছে আসে তখন হজরত জয়নাব (সা.আ.) তাকে বলেন: তুমি কি জান না যে, আমাদের উপরে সাদকা হারাম? কেন তুমি আমাদের জন্য এ খাবারগুলো এনেছো? তখন হিন্দ জরত জয়নাব (সা.আ.)কে বলে: বিশ্বাস করুন উক্ত খাবারগুলো সাদকা না বরং এটা হচ্ছে মান্নতের খাবার। হজরত জয়নাব (সা.আ,) তাকে জিজ্ঞাসা করেন কিসের মান্নত বা নজর। তখন সে বলে: এক সময় আমি মদিনাতে চরম অসুস্থ ছিলাম। তখন আমাকে ইমাম আলি (আ.) এর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর শেফাআতে আমি সুস্থ হয়ে যায়। তখন থেকে আমি যখন কোন বন্দিদেরকে দেখি তখন তাদের জন্য খাদ্যের ব্যাবস্থা করি। হিন্দ হজরত জয়নাব (সা.আ.)কে জিজ্ঞাসা করে:

হিন্দ: হে বন্দিনি তোমার বাড়ি কোথায়?

জয়নাব (সা.আ.): আমরা মদিনাবাসি।

হিন্দ: আরবেরা সব শহকেই মদিনা বলে। তুমি কোন মদিনাবাসি?

হজরত জয়নাব (সা.আ.): মদিনাতুর রাসুল (সা.)।

হিন্দ উক্ত শব্দটি শোনার পরে আসন থেকে মেনে মাটিতে বসে পড়ে। হজরত জয়নাব (সা.আ.) তাকে জিজ্ঞাসা করেন কেন তুমি এভাবে মাটিতে বসে পড়লে?

হিন্দ: মদিনাতুর রাসুলের সম্মানার্থে।

হিন্দ: হে বন্দিনি! তুমি কি বণি হাশিম গোত্রের কোন খবর জান কি?

জয়নাব (সা.আ.): আমি বণি হাশিম গোত্রেই বড় হয়েছি।

হিন্দ: তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি তুমি কি আমিরুল মুমিনিন (আ.) পরিবারের এবং আমার সম্মানিত শাহজাদি জয়নাব (সা.আ.) এর খবর জান কি?এ কথা শোনার পরে জয়নাব (সা.আ.): আর ধৈর্যর বাঁধ সামলাতে পারলেন না এবং প্রবল আবেগের সাথে ক্রন্দন করে বললেন: যদি তুমি তোমার সেই সম্মানিত শাহজাদিকে দেখ তাহলে কি তাকে চিনতে পারবে? আমিই হচ্ছি সেই জয়নাব!

হিন্দ: হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে জিজ্ঞাসা করে তাহলে আমার মওলা হুসাইন (আ.) কোথায়?

জয়নাব তাকে বলেন: এজিদের প্রসাদে যে কাটা মাথাটি রাখা আছে সেটাই হচ্ছে তোমরা মওলা ইমাম হুসাইন (আ.) এর মাথা।

উক্ত কথাটি শোনার পরে হিন্দ আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যখন সে জ্ঞান ফিরে পায় তখন সে পাগলের ন্যায় খালি পায়ে ক্রন্দনরত অবস্থায় এজিদের দরবারের দিকে ছুটে যায়। এজিদকে উদ্দেশ্যে করে বলে হে মাবিয়ার সন্তান! তুমি রাসুল (সা.) এর সন্তান হুসাইন (আ.)কে হত্যা করেছ এবং তাঁর কাটা মাথাকে আমার ঘরে রেখেছো? এজিদ তার স্ত্রীর উক্ত কথা শোনার পরে নিরুত্তোর অবস্থায় দাড়িয়ে থাকে। অবশেষে হিন্দা এজিদের হুকুমতের পরিধির মধ্যেই সকল বাধাকে উপেক্ষা করেই ইমাম হুসাইন (আ.) এর আযাদারির আয়োজন করে। হিন্দ ক্রন্দনরত অবস্থায় আবার হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলে: হে শাহজাদি জয়নাব! আপানকে এ অবস্থায় দেখার পূর্বে কেন আমি অন্ধ হয়ে গেলাম না। সে আহলে বাইত (আ.) কে তার ঘরে নিয়ে যায় এবং ক্রন্দন শুরু করে বলে হে মারওয়ানি ও সুফিয়ানি নারিরা! আর তোমরা আনন্দ করো না। আল্লাহর শপথ এরা বিদ্রোহি না বরং এরাই হচ্ছে রাসুল (সা.) এর আহলে বাইত এবং হজরত আলি ও ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এর সন্তান সন্ততি। 

সূত্র:

রিয়াহিনুশ শারিয়াহ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৯১।

মাআলিউস সিবতাইন, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৩।

আল ইরশাদ, খন্ড ২।