হযরত আনাস ইবনে হারেস (রা.)-এর আত্মত্যাগ

হযরত আনাস ইবনে হারেস (রা.)-এর আত্মত্যাগ

হযরত আনাস ইবনে হারেস (রা.)-এর আত্মত্যাগ

হজরত আনাস ইবনে হারেস (রা.) ছিলেন লম্বা, সুঠাম দেহ, মিষ্টি চেহারা, বলিষ্ঠ বাহু ও সাদা চুলের অধিকারি। সাদা ও লম্বা লম্বা ভ্রুগুলো অনেক সময় তাঁর চোখের সামনে এসে পড়ত। দেহ খানিকটা সামনের দিকে বাঁকা হয়ে গেলেও তাঁর দৃষ্টি ছিল যেমন প্রখর, তেমনি শক্তিও ছিল প্রচুর। সে যুগে আনাস বিন হারেস কাহেলীকে চেনে না এমন মানুষ কুফায় পাওয়াই ছিল ভার। সবার কাছেই তিনি ছিলেন সম্মানের পাত্র।

মুশরিকরা তাঁর শান-শওকতপূর্ণ চেহারা দেখে যেমন ভয় পেত, তেমনি তাঁর বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে গর্ববোধ করত। তাঁর গায়ে যে পুরনো ক্ষতের চিহ্নগুলো রয়েছে তার সাথে মিশে আছে যুদ্ধের ময়দানে লড়াইয়ের  অসংখ্য স্মৃতি। ক্ষমা ও দানশীলতার দিক থেকে তিনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তবে তাঁর নামের সাথে যত বিশেষণই লাগানো হোক না কেন, তারপরও মনে হয় যেন তাঁর গুণের তুলনায় প্রশংসা অনেক কম হয়ে যাচ্ছে।  এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন ইসলামী সভ্যতায় এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

আনাস কেবল মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাহাবীই ছিলেন না, একই সাথে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.), রাসূলের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এরও সঙ্গী ছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘায়ুই তাঁকে ইসলামের ইতিহাসে মহান ব্যক্তিদের কাতারে স্থান করে নেওয়ার সুযোগ এনে দেয়। তিনি বদর ও হুনাইনের যুদ্ধে রাসুলের পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন। একইসাথে তিনি আবু আবদিল্লাহ হুসাইন (আ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। তিনি ইমামদের অনুসরণ করাকে রাসূলের প্রতি অনুসরণ বলে মনে করতেন। আর এ কারণেই তিনি ইমাম হুসাইনের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

এ অবস্থায় আনাস যখন মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর শোনার পর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যান। স্মৃতির পাতায় ভেসে আসে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) এবং ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-এর যুদ্ধের কথা। তিনি ভুলতে পারছেন না আম্র ইবনুল আসের ষড়যন্ত্রের কথা, ভুলতে পারছেন না আবু সুফিয়ানের বিদ্বেষ ও শত্রুতার কথা।

মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সাথে সাথেই ইয়াযীদকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা ঘোষণা করা হলো। সে সময় ইয়াযীদ সাধারণ জনগণকে তার প্রতি আনুগত্য আদায়ে বাধ্য করার চেষ্টা করল।

এসব ঘটনা তাঁকে মারাত্মকভাবে ব্যথিত করে। মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর কুফার জনগণ অসংখ্য চিঠি লিখে ইমাম হুসাইনকে খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করে। চিঠির ভাষাগুলো ছিল এরকম : ‘হে আবা আবদিল্লাহ আল-হুসাইন! এখন তো আর মুয়াবিয়া বেঁচে নেই। আমাদের আবেদন, আপনি হবেন আমাদের খলিফা। আমরা আপনার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে চাই।’

ইমাম হুসাইন (আ.) মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠালেন কুফার জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ও তাদের থেকে আনুগত্যের শপথ নেওয়ার জন্য। প্রথম দিকে হাজার হাজার মানুষ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইমামের এই বিশেষ দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

আনাস ইবনে হারেস,  মুসলিম বিন আকীলের এই শাহাদাতের ঘটনা দেখে এতই মর্মাহত হন যে, তিনি আর নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওয়ানা হন। কিন্তু পথিমধ্যে তাঁর মনে পড়ে যায় মহানবী (সা.)-এর একটি বাণী। যেখানে তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমার প্রিয় দৌহিত্রকে ‘কারবালা’ নামক স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে। ঐ সময় পর্যন্ত যারা বেঁচে থাকবে তারা যেন তাকে সহযোগিতা করে।’ একথা মনে পড়ার সাথে সাথেই তিনি পথ পরিবর্তন করে কারবালার উদ্দেশে রওয়ানা হন এবং বহু কষ্ট স্বীকার করে শেষ পর্যন্ত কারবালার পথে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সৈন্যদলে যোগ দিতে সমর্থ হন। ইমামের সঙ্গীরা আনাস বিন হারেস কোহেলীকে দেখে খুব খুশি হন। ইমামকে পেয়ে আনাসের মন প্রশান্তিতে ভরে যায়।

ইমাম হুসাইন তাঁর সঙ্গীদেরকে নির্দেশ দেওয়া মাত্রই তাঁরা ঘোড়া ও উটের পিঠ থেকে নেমে কারবালার প্রান্তরে তাঁবু স্থাপন করেন।

আশুরার রাত। সকল সঙ্গী-সাথি ইমামকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছেন। কারণ, এক মুহূর্তের জন্যও তাঁদের এই প্রিয় নেতা চোখের আড়াল হোন তাঁরা তা ভাবতেও পারছিলেন না। ঐ সময় ইমাম হুসাইনের সঙ্গীরা অত্যন্ত করুণ ভাষায় ইমামের প্রতি তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন। ইমাম তখন তাঁদের একেক জনের চেহারার দিকে তাকিয়ে বলছিলেন : ‘তোমাদের মতো এত উদার ও বিশ্বস্ত সঙ্গী আমি আর দেখিনি।’ ঐ রাতে সবাই একসাথে নামায আদায় করে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন যাতে সকাল পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের প্রভুর সাথে সংযুক্ত থাকেন।

আশুরার দিন, ইমাম হুসাইনের সকল সঙ্গী যুদ্ধের পোশাক পরে আবু আবদিল্লাহ আল-হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত হলেন। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সেনাদলের ওপর উমর ইবনে সাদ কর্তৃক তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে দুপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু হলো। এ এক কঠিন মুহূর্ত। যখন যুদ্ধক্ষেত্র কিছুটা শান্ত হয়ে এল এবং উভয় পক্ষের সৈন্যরা হতাহতদের সরিয়ে নিচ্ছিল তখন ইমাম হুসাইন (আ.) আনাসকে বললেন : ‘এই অত্যাচারী ও পাষণ্ডদের গিয়ে বল তারা যেন তাদের ভুল সংশোধন করতে পারে।’ আনাস সাথে সাথে ইমামের নির্দেশ মতো ময়দানে হাজির হলেন। যখন তিনি উমার ইবনে সাদের কাছে পৌঁছলেন তখন সাদ তাঁকে প্রশ্ন করল : ‘কেন আমাকে সালাম করছ না? তোমরা কি আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী ও কাফের মনে করছ?’ আনাস বললেন : ‘কিভাবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর নবীর পথে আছ, যখন তোমরা নবীর প্রিয় দৌহিত্রকে হত্যা করতে প্রস্ত্তত হয়েছ?’ উমর ইবনে সাদ মাথা নিচু করে বলল : ‘আল্লাহর শপথ! আমি জানি রাসূলের প্রিয় দৌহিত্র হুসাইনকে হত্যা করার শাস্তি দোযখ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নির্দেশ আমাকে মানতেই হবে।’

এরপর আনাস ইমাম হুসাইনের অনুমতি নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইমাম হুসাইন আনাসের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসজল নয়নে বললেন : ‘হে আল্লাহ! তুমি আনাসকে কবুল করো।’ অবশেষে আনাস যুদ্ধ করতে করতে ইমামের সামনে শাহাদাতের স্বর্গীয় সুধা পান করলেন।

সূত্র: কাউসার বিডি.কম