শিয়া মাযহাবের ভাবমূর্তি নষ্টের ক্ষেত্রে গোলাতদের ষড়যন্ত্র- ৩

ইমাম (আ.)গণ গোলাতদের দমনের ক্ষেত্রে তাদের অনুসারিদেরকে তাকওয়া এবং পরহেজগারির ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দান করতেন। মোফাযযাল বিন ওমর বলেন যে, আমি ইমাম সাদিক (আ.) থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন: তোমরা ভ্রান্ত চিন্তাধারার মানুষদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখ। কেননা আমাদের

শিয়া মাযহাবের ভাবমূর্তি নষ্টের ক্ষেত্রে গোলাতদের ষড়যন্ত্র- ৩

এস, এ, এ

...পূর্বের আলোচনায় আমরা আমাদের সম্মানিত পাঠকদের অধিক অবগতির জন্য গোলাতদের ষড়যন্ত্রের কিছু কথা উল্লেখ করেছিলাম। আজকে আমরা গোলাতদের অগ্রহনযোগ্যতার ক্ষেত্রে ইমাম (আ.)দের ভুমিকা সম্পর্কে আলোচনা করবো:

ইমাম (আ.)গণ গোলাতদের দমনের ক্ষেত্রে তাদের অনুসারিদেরকে তাকওয়া এবং পরহেজগারির ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দান করতেন। মোফাযযাল বিন ওমর বলেন যে, আমি ইমাম সাদিক (আ.) থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন: তোমরা ভ্রান্ত চিন্তাধারার মানুষদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখ। কেননা আমাদের অনুসারি হচ্ছে তারা যারা নিজেদের ভদ্রতা বজায় রাখে এবং তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আল্লাহর মারেফত অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করে। তারা তাদের উক্ত কর্ম সমূহ আল্লাহর ভয়ে এবং পূণ্য অর্জনের আশায় সম্পাদন করে। (এখতিয়ারে মারেফাতুর রেজাল, পৃষ্ঠা ৩০৬)

ইমাম (আ.) ওয়াজিব আমল সমুহ সম্পাদন এবং হারাম আমল সমূহ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসারিদের উৎসাহ ও উদ্দিপনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম (আ.)গণ তাদেরকে নির্দেশ দিতেন তারা যেন নিজেদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলে  যেন তাদের কারণে ইমাম (আ.)দের সম্মান বৃদ্ধি পায়। ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর অনুসারিদের অবগতির জন্য নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন: যদি কেউ নামাজকে অবহেলা করে তাহলে আমরা আহলে বাইত (আ.)গণ তার শেফায়াত করবো না। (আল কাফি, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৬৯)

ইমাম (আ.)গণ এ ধরণের হাদিস বর্ণনার মাধ্যমে আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারি বিদ্বেষিদের সকল ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্নভিন্ন করা হতো। বর্তমানে ওহাবি নামের ইসলামের শত্রুরা আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিদের বিভিন্ন বিষয়কে শিরকের সাথে তুলনা করে আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিদের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার চেষ্টা করছে।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর এক সাহাবি মোফাযযালকে গোলাতদের উদ্দেশ্যে করে বলেন: হে মোফাযযল! তুমি গোলাতদের সাথে উঠাবসা করো না, তাদের সাথে খাদ্য খেয় না, তাদেরকে তোমার বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না এমন কি তাদের বর্ণিত হাদিসকে অপরের কাছে বর্ণনা করো না। (এখতিয়ারে মারেফাতুর রেজাল, পৃষ্ঠা ২৯৭)

ইমাম (আ.)গণ প্রকাশ্যেভাবে গোলাতদের প্রতি নিজেদের অসন্তুষ্টতা প্রকাশ এবং তাদের প্রতি অভিসম্পাত করতেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আল্লাহ অভিসম্পাত করুন অমুক ব্যাক্তিকে এবং যে তার কারণে মারা যায় এবং যে বেঁচে যায় এবং যার অন্তরে তার প্রতি ভালবাসা রয়েছে। (এখতিয়ারে মারেফাতুর রেজাল, পৃষ্ঠা ২৯৫)

ইমাম (আ.) তাঁদের অনুসারিদেরকে অবগতির জন্য এরূপ আচরণের মাধ্যেমে তাদেরকে বুঝিয়ে দিতেন যে তারা যেন গোলাতদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।

ইমাম (আ.)দের বিরূদ্ধে গোলাতদের ষড়যন্ত্র:

মেলাল ওয়ান নেহাল নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম (আ.)দের অনেক বড় বড় সাহাবিদেরকে যারা ছিলেন আহলে বাইত (আ.)দের বিশ্বস্ত এবং প্রকৃত অনুসারি। তাদেরকে গোলাত মতাদর্শের অনুসারির মতো অপবাদ দ্বারা পরিচয় করানো চেষ্টা করা হয়েছে যেমন: যুরারা, হেশাম বান হাকাম, ইউনুস বিন আব্দুর রহমান। অথচ তাঁরা বিভিন্ন বাতিল ফেরকা সমূহের সাথে মুনাযেরা বা আলোচনা করতেন এবং বিভিন্ন বিষয় যেমন: আকায়েদ, শিয়া  পরিচিতি এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দানের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রতিরক্ষা করতেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ গোলাত মতাদর্শের অনুসারিরা আহলে বাইত (আ.) এবং তাদের সাহাবিদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করতো।

যুরারা বিন আয়ানে তামিমি যে ছিল বাতিল ফেরকার একজন অনুসারি তাকে ইমাম (আ.)’এর সাহাবি যুরারা’এর নামের সাথে মিলিয়ে ইমাম (আ.)’এর সাহাবির ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কেননা শিয়া রেজাল শাস্ত্রে যুরারা হচ্ছেন একজন বিশ্বস্ত ব্যাক্তিত্ব। কাশশি যুরারা সম্পর্কে বলেছেন: ইমাম বাকের ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’এর ছয়জন বিশ্বস্ত সাহাবি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যুরারা। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: যদি যুরারা না থাকতো তাহলে হয়তো আমার বাবার অনেক হাদিস বিলিন হয়ে যেত। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২১৮- ২১৮)

“وَالسَّابقُونَ السَّابِقُونَ * أُولَئِکَ الْمُقَرَّبُونَ”

 (সুরা ওয়াকেয়া, আয়াত নং ১০- ১১ ) ইমাম (আ.) উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেছেন যে, যুরারা, আবু বাসির, মোহাম্মাদ বিন মুসলিম’এর মতো ব্যাক্তিরা হচ্ছে উক্ত আয়াতের বাস্তব নমুনা স্বরূপ। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২৫)

অনুরূপভাবে হেশাম বিন হাকাম ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক ও  ইমাম কাযিম (আ.)’এর সাহাবি। তিনি কালাম শাস্ত্রে ছিলেন অত্যান্ত পারদর্শি। তিনি তার যুগে অনেক বিজ্ঞ পন্ডিতদেরকে কালাম শাস্ত্রের দ্বারা পরাস্থ করেছেন। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১৭, ২৭৬)

হেশাম বিন হাকাম ইমামতের পক্ষপাতি থাকার কারণে হারুনর রশিদ তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয় এবং একারণে সে লুকিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে। তাকে আটক করার জন্য ইমাম কাযেম (আ.)কে কারাগারে থাকার আটকে  রাখা হয়। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২৭৮)

ইমাম রেযা (আ.) হেশাম বিন হাকাম সম্পর্কে বলেছেন যে, আল্লাহ যেন হেশাম বিন হাকামের উপরে নিজের রহমত নাযিল করুন কেননা সে হচ্ছে একজন সৎ ব্যাক্তি। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২৯৪)

ইমাম সাদিক (আ.)’এর আরেকজন সাহাবি যার নাম ছিল মোফাযযল বিন উমার জোফি কুফি। তার নামে “মুফাযযালি”  নামক ফেরকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তিনি বাতিল ফেরকার প্রতিষ্ঠাতা হতেন তাহলে কখনই ইমাম জাফর সাদিক, কাযিম এবং রেযা (আ.) তার প্রশংসা করতেন না। তার সত্যবাদিতার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, ইমাম সাদিক (আ.) তার তৌহিদ সম্পর্কিত পুস্তক লেখার জন্য নির্দেশ দেন এবং বর্তমানে তাঁর লেখা “তৌহিদে মোফাযযল” নামক পুস্তকটি মুসলমানদের কাছে সুপরিচিত একটি পুস্তক। (মোজামে রেজালুল হাদিস ওয়া তাফসিলে তাবাকাতির রেওয়ায়েত, খন্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৩০৩)

গোলাতরা ইমাম (আ.) এবং শিয়া মাযহাবের ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে ইমাম (আ.) এবং তাঁর সাহাবিদের প্রতি অপবাদ দানের মাধ্যমে ইমাম (আ.)দের এবং শিয়া মাযহাবের ভাবমূর্তি নষ্ট করার বৃথা চেষ্টা করতো।