ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদত সম্পর্কিত বিভিন্ন মতামত

ইমাম বাকের (আ.) ছিলেন আহলে বাইত (আ.)’এর ৫ ম ইমাম। তার বাবা ইমাম জয়নুল অবেদিন এবং তাঁর মা ছিলেন ফাতিমা বিনতে হাসান (আ.)। তিনি মদিনা মুনাওয়ারাতে শুক্রবার ১লা রজব ২৭ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন।

ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদত সম্পর্কিত বিভিন্ন মতামত

আহলে বাইত, ইমাম বাকের, বাকের, ইমাম বাকের শাহাদত, মদিনা, হেশাম বিন আব্দুল মালিক, জান্নাতুল বাকি, ইমাম, বাকের (আ.),

এস, এ, এ

ইমাম বাকের (আ.) ছিলেন আহলে বাইত (আ.)’এর ৫ ম ইমাম। তার বাবা ইমাম জয়নুল অবেদিন এবং তাঁর মা ছিলেন ফাতিমা বিনতে হাসান (আ.)। তিনি মদিনা মুনাওয়ারাতে শুক্রবার ১লা রজব ২৭ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম বাকের (আ.)’এর  যুগের খলিফাগণ ছিল ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক, সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক, ওমর বিন আব্দুল আযিয, ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিক, হেশাম বিন আব্দুল মালিক। উল্লেখিত খলিফারা অনেকেই ইমাম বাকের (আ.)কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে এবং ইতিহাসকে বিকৃত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। আর তাই ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যাক্তিত্বদের জন্ম এবং মৃত্যু তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়।

ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদতের বছর নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণের মতভেদ রয়েছে। নিন্মে ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদত সম্পর্কিত বিভিন্ন মতামত উল্লেখ করা হলো:

১- ইমাম বাকের (আ.) ১১১ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন।(মাআরাসারাল আনাফা ফি মাআলেমিল খেলাফা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫২)

২- ইমাম বাকের (আ.) ১১৩ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। (মেরআতুল জেনান, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৭)

৩- ইমাম বাকের (আ.) ১১৪ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন।(তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৩৮, উসুলে কাফি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭২, তারিখে কুম, পৃষ্ঠা ১৯৭, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫৬, দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৯৪, তাজুল মাওয়ালিদ, পৃষ্ঠা ১১৮, মানাকেব, খন্ড ৩৪, পৃষ্ঠা ২১০, সিরে আলামুন নোবালা, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪০৯, আনওয়ারুল বহিয়া, পৃষ্ঠা ১১২৬, তারিখে ইবনে খালদুন, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩, উমদাতুত তালেব, পৃষ্ঠা ১৩৮, সাযরাতুয যাহাব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৯)

৪- ইমাম বাকের (আ.) ১১৫ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। (কামেলে ইবনে আসির, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮০)

৫- ইমাম বাকের (আ.) ১১৬ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। (আল মোখতাসার ফি আখবারিল বাশার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৩, তাতেম্মাতুল মোখতাসার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৮)

৬- ইমাম বাকের (আ.) ১১৭ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২০, তাযকেরাতুল খাওয়াস, পৃষ্ঠা ৩০৬, আল ফুসুলুল মুহেম্মা, পৃষ্ঠা ২২০, আখবারুদ দোয়ালওয়া আসারিল আওয়াল, পৃষ্ঠা ১১, নুরুল আবসার, পৃষ্ঠা ৬৬)

৭- ইমাম বাকের (আ.) ১১৮ হিজরিতে শাহাদত বরণ করেন। (কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২২, ওয়াফিয়াতুল আয়ান, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৪, তাতেম্মাতুল মুখতাসার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৮, আয়ানুশ শিয়া, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৫০)

ইতিহাসের পাতায় ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদতের বছর নিয়ে মতভেদ থাকলেও বিষ দ্বারার যে তাকে শহিদ করা হয়েছিল এ সম্পর্কে তেমন কোন মতভেদ নেই। (সাওয়ায়েকুল মোরেকা, পৃষ্ঠা ২১০, এহকাকুল হাক, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৫৪, মাসিরুল আহযান, পৃষ্ঠা ২৪৪)

কিছু রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে ইমাম বাকের (আ.)’এর ঘোড়ার উপরে বসার স্থানে বিষ লাগিয়ে দেয়া হয়। আর উক্ত বিষের প্রভাবে ইমাম বাকের (আ.) শাহাদত বরণ করেন। (আল খারায়েজুল জারায়েহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০৪, মাদিনাতুল মাআজিয, পৃষ্ঠা ৩৪৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ৩২৯, মুসতাদরাকে ওসায়েল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১১)

ইতিহাসে ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি সম্পর্কেও বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে। নিন্মে বিভিন্ন ব্যাক্তি যাদেরকে ইতিহাস ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি বলে চিহ্নিত করেছে তারা  হচ্ছে নিন্মরূপ:

-  হেশাম বিন আব্দুল মালেক ছিল ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি। (মেসবাহে কাফআমি, পৃষ্ঠা ৫২২, মাআসেরুল এনাফা ফি মাআলেমুল খেলাফা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫২)

-  ইব্রাহিম বিন ওয়ালিদ ছিল ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি। (সাবায়েকুয যাহাব, পৃষ্ঠা ৭৪, দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৯৪, মানাকেবে ইবনে শাহর আশুব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২১০, আল ফুসুলুল মুহেম্মা, পৃষ্ঠা ২২০, আনওয়ারুল বাহিয়া, পৃষ্ঠা ১২৬)

-  যায়দ বিন হাসান ছিল ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি। (ফেরাকুশ শিয়াম পৃষ্ঠা ৬১)

ইমাম বাকের (আ.) বণি উমাইয়ার শাষক হেশাম বিন আব্দুল মালেক’এর যুগে জিবন যাপন করতেন। আর হেশাম বিন আব্দুল মালে ‘এর  শাষনকাল ছিল ১০৫ হিজরি থেকে ১২৫ হিজরি পর্যন্ত। ঐতিহাসিকগণ ইমাম বাকের (আ.)’এর সর্বশেষ শাহাদতের বর্ষকে ১১৮ হিজরি বলে উল্লেখ করেছেন। (আখবারুদ দোওয়াল ওয়া আসারুল আওয়াল, পৃষ্ঠা ১১১)

যদিও বাহ্যিকভাবে উল্লেখিত মতামতগুলোতে দ্বন্দ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ইতিহাস এবং রেওয়ায়েতের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করলে বুঝতে কষ্ট হবে না যে কে তার হত্যাকারি। ইমাম বাকের (আ.)’এর হত্যাকারি যে একজন ছিলেন এমনটি নাও হতে পারে বরং ইতিহাসের উল্লেখিত সকল ব্যাক্তিই তার শাহাদতের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখতে পারে।

যেহেতু হেশাম বিন আব্দুল মালিক ছিল আহলে বাইত (আ.)দের শত্রুদের মধ্যে একজন এবং ইমাম বাকের (আ.) তার যুগেই জিবন যাপন করতেন সেহেতু হেশাম ইমাম বাকের (আ.)কে হত্যা করার লক্ষ্যে অন্যান্যদেরকে নিজের সহায়তার কাজে ব্যাবহার করে।

ইমাম বাকের (আ.) শাহাদত বরণের পরে তাঁকে তাঁর বাবা ও তাঁর বাবার চাচা ইমাম হাসান বিন আলি (আ.)’এর পাশে দাফন করা হয়। (ফেরাকুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ৬১, উসুলে কাফি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭২, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫৬, দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৯৪, আলামুল ওয়ারা, পৃষ্ঠা ২৫৯, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২৭, তাযকেরাতুল খাওয়াস, পৃষ্ঠা ৩০৬, মেসবাহে কাফআমি, পৃষ্ঠা ৫২২, সুযুরাতিয যাহাব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৯)

 কুলাইনি তার সহিহ সনদে যোরারে থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদা ইমাম বাকের (আ.) বলেন: আমি একদা স্বপ্ন দেখি যে, আমি পাহাড়ের চুড়ার উপরে দাড়িয়ে আছি আর লোকেরা পাহাড়ের চতূর্দিক থেকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ পাহাড়টি বড় হয়ে যায় এবং সকল মানুষেরা সেখান থেকে ছিটকে পড়ে যায় এবং সেখানে আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না। আর উক্ত ঘটনাটি ৫ বার ঘটে। উক্ত ঘটনাটি শুনার পরে আমার মনে হচ্ছিল যে হয়তো ইমাম (আ.) তাঁর শাহাদতের খবর সম্পর্কে আমাকে অবগত করছেন। উক্ত স্বপ্নটি দেখার পাঁচ দিন পরেই ইমাম শাহাদত বরণ করেন।

কুলাইনি বর্ণনা করেন যে, ইমাম বাকের (আ.) ৮০০ দিরহাম তার মৃত্যুর পরে তাযিয়া,আহাজারি মাতমের জন্য ওসিয়ত করে যান। ইমাম সাদিক (আ.) বলেন যে, আমার বাবা আমাকে বলেন: হে জাফর! উক্ত অর্থ দ্বারা কিছু ক্রন্দনকারির সাথে চুক্তি কর যেন তারা হজের মৌসুমে মিনাতে ১০ বছর ধরে আমাকে  শহিদ করার দুঃখে ক্রন্দন করে যেন সকলেই বুঝতে পারে যে, কে আমাকে শহিদ করেছে।

কুলাইনি বর্ণনা করেন যে ঘরে ইমাম বাকের (আ.) শাহাদত বরণ করেন ইমাম সাদিক (আ.)  প্রত্যেক রাতে সে ঘরে বাতি জালিয়ে রাখতেন।

শেইখ আব্বাস কুম্মি ইমাম বাকের (আ.)’এর শাহাদতের তারিখ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন: ইমাম বাকের (আ.) ৭ ই জিলহজ, রোজ সোমবার ১১৪ হিজরিতে ৫৭ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন এবং তাঁর পবিত্র দেহকে মদিনার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। (সোগনামে আলে মোহাম্মাদ, মুনতাহিউল আমাল)