মদিনা থেকে মার্ভ’এর অভিমুখে ইমাম রেযা (আ.)’এর ঐতিহাসিক সফর

ইরানের ইসলামি ইতিহাসে যে সকল ঘটনা ঘটেছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মদিনা থেকে মার্ভ’এর অভিমুখে ইমাম রেযা (আ.)’এর সফর। উক্ত সফরের কারণে ইরানের মাটি আহলে বাইত (আ.)’এর বেলায়াতের একটি কেন্দ্র বিন্দুতে রূপান্তিরিত হয়।

মদিনা থেকে মার্ভ’এর অভিমুখে ইমাম রেযা (আ.)’এর ঐতিহাসিক সফর

এস, এ, এ

ইরানের ইসলামি ইতিহাসে যে সকল ঘটনা ঘটেছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মদিনা থেকে মার্ভ’এর অভিমুখে ইমাম রেযা (আ.)’এর সফর। উক্ত সফরের কারণে ইরানের মাটি আহলে বাইত (আ.)’এর বেলায়াতের একটি কেন্দ্র বিন্দুতে রূপান্তিরিত হয়।

যদিও ইমাম রেযা (আ.)’এর উক্ত সফরটি ছিল তাঁর ইচ্ছার বিরূদ্ধে। কেননা আব্বাসিয় খলিফা মামুনের জোরাজুরির কারণে ইমাম রেযা (আ.) বাধ্যে হন মার্ভ অভিমুখে রওনা হতে। কিন্তু তিনি তাঁর উক্ত বাধ্যতামূলক সফরের মাধ্যেমে মুসলমানদেরকে সত্য দিশার নির্দেশনা দিয়ে যান।

হজরত আলি ইবনে মূসা (আ.)’এর উপাধি হচ্ছে রেযা। তিনি ১৪৮ হিজরি ১১ই জিলক্বদ মাসে মদিনাতে জন্মগ্রহণ করেন। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৭)

তাঁর পিতার নাম হচ্ছে হজরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)। তবে ইতিহাসে তাঁর মাতার নাম বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে যেমন: নাজমা, সামানা, তুকতাম, উম্মুল বানিন। (আলামুল ওয়ারা, বি আলামুল হুদা, পৃষ্ঠা ৩১২)

ইতিহাসে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম রেযা (আ.)’এর জন্মগ্রহণের পরে তাঁর মাতার নাম রাখা হয় তাহেরা। (মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৬৭)

হজরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)’এর মৃত্যুর পরে ৩৫ বছর বয়সে ইমাম রেযা (আ.)কে ইমামতের গুরুদ্বায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তাঁর ইমামতকাল হচ্ছে ২০ বছর। তাঁর উক্ত ২০ বছরের ইমামতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়  পরিলক্ষিত হয়।

১- হারুনের খেলাফতকালে ১০ বছর ইমামত।

২- আমিনের খেলাফতকালে ৫ বছর ইমামত।

৩- মানুনের খেলাফতকালে ৫ বছর ইমামত। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩০, ৪৪২)

উল্লেখিত তিন খলিফার যুগে ইমাম রেযা (আ.) তাঁর ইমামতকালে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখিন হন। সেই সময়ে শুধু নামমাত্রই ইসলামি হুকুমত প্রচলিত ছিল। কিন্তু ইমাম রেযা (আ.) সে যুগের মানুষের সামাজিক জিবনে যে সকল মতভেদ বা দ্বন্দ ছিল তা সমাধান এবং ইসলামের মহৎ উদ্দেশ্যের কারণে নিজেকে বিলিয়ে দেন।

ইমাম রেযা (আ.)কে স্থলাভিষিক্ত করার ক্ষেত্রে মামুনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে:

ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই যে, আব্বাসিয় খেলাফতের লোকজন “আর রেযা মিন আলে মোহাম্মাদ” উক্ত শ্লোগানের মাধ্যেমে ইরানিদের ভালবাসা এবং আলাভিয়ানদের মন জয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন তারা ক্ষমতায় আসে তখন তারা আলাভি মুসলমানদের উপরে অত্যাচার করা শুরু করে দেয় যেমন নাফসে যাকিয়া, হুসাইন বিন আলি, ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.), ইমাম মূসা কাযিম (আ.)কে শহিদ করে। আর এগুলো ছিল আব্বাসিয় খেলাফতের অন্যতম কালো অধ্যায়। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৭, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮১, আল কাফি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৪, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩৬, মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৩০০, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬)

কিন্তু তারপরেও আব্বাসিয় খেলাফতের ক্ষমতা মানুষের অন্তর থেকে আহলে বাইতের পবিত্র ইমাম (আ.)’দের প্রতি ভালবাসাকে মুছে দিতে পারেনি। বরং তাদের উক্ত ষড়যন্ত্রের বীপরিতে তাঁদের প্রতি মানুষের ভালবাসা আরো বৃদ্ধি পায়। বরং উক্ত ভালাবাসা শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের মধ্যেই সিমাবদ্ধ ছিল না বরং তা খলিফার পরিবার এবং তাদের দরবারের লোকজনের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল যেমন: খলিফা হারুনর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা, খলিফা মনসুরের নাতি এবং আব্বাসিয় খেলাফতের অতি সম্মানিত  নারী ইমাম রেযা (আ.)’এর ইমামতকে মেনে নিয়েছিল।উ যখন হারুনর রশিদ তার স্ত্রীর উক্ত খবরটি জানতে পারে তখন সে তাকে তালাক্ব দেয়ার কসম খায়। (আমালি সাদুক্ব)

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন আব্বাসিয় খেলাফতের লোকজন ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর শাহাদতের খবর কে প্রচার করে তখন মনসুর দাওয়ানেকি’এর পুত্র সুলাইমান তার সন্তান এবং দাশদেরকে নির্দেশ দেয় তারা যেন খেলাফতের উক্ত কাজে তারা বাধা হয়ে দাড়ায় এবং সে নিজেও খালি পায়ে ইমাম (আ.)’এর জানাযায় অংশগ্রহণ করে। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ২২৫)

যখন মনসুর দাওয়ানেকি’এর পুত্র সুলাইমান হারুনর রশিদকে পত্র লিখে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাই তখন হারুনর রশিদ তার চিঠির উত্তরে লিখে জানায় যে, আত্মিয়তার দরদ দখোচ্ছো। আমি শপথ করে বলছি যে, ইমাম (আ.)কে হত্যার কাজটি সিন্দি বিন সাহাক আমার নির্দেশে করেনি। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ২২৫)

সে আরো বলে যে, ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)’এর শাহাদতের মূল কারণ হচ্ছে আলাভি মুসলমানরা। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩৭- ২৪৩, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩২৬)

এখন মূসা কাযিম (আ.)’এর সন্তান ইমাম রেযা (আ.) নিজেকে মুসলমানদের ইমাম বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছে। যেহেতু খলিফা হারুন ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর শাহাদতের কারণে ভয় পেয়েছিল। সেহেতু সে ইয়াহিয়া বিন খালেদ বারমাকি’কে বলে যে, আমরা ইমাম রেযা (আ.)’এর বাবার সাথে যা করেছি তাতে হয়তো তাঁর শিক্ষা হয়নি। আমার মনে চাই তরবারি দ্বারা সকল আলাভি মুসলমানদেরকে হত্যা  করে ফেলি। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৬, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৫)

ইমাম রেযা (আ.) আব্বাসিয় খলিফাদের উক্ত মানসিক অবস্থার সার্বিক সুবিধাকে কাজে লাগায় এবং প্রকাশ্যেভাবে নিজের ইমামতকে প্রকাশ করেন। কেননা তখন আমিন এবং মামুন উভয়েই খেলাফত অর্জনের জন্য একে অপরের রক্তের পিপাসু হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯৮ হিজরি মহরম মাস শেষ হওয়ার ৫ দিন পূর্বে মামুন আমিনকে হত্যা করে খেলাফতকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। (আত তাম্বিয়া ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ৩২৩)

মামুন খেলাফতের মূল কেন্দ্রকে বাগদাদ থেকে মার্ভে স্থানান্তরিত করে। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৫, তাবারি, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫৭৪- ৫৭৫)

কিন্তু উক্ত সময়ে বিভিন্ন স্থানের মুসলমানরা আব্বাসিয় খেলাফতের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধও সংঘটিত হয় যার ফলে হাজার হাজার মুসলমানরা মারা যায়। আর এর ফলে আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিরা বিভিন্ন স্থানে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালি করে তোলে নিন্মে কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করা হলো:

১- বাসরা: আবুল সারায়া যাইদ বিন মূসা বিন জাফর বাসরাতে আব্বাসিয় খেলাফতের বিরূদ্ধে বিপ্লব করে এবং সেখান থেকে আব্বাসিয় সমর্থকদের বের করে দেয় এবং তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। আর এ কারণেই তাকে যাইদুন নার উপাধি দান করা হয়। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, ‍পৃষ্ঠা ৪৮৬)

২- ইয়েমেন: ইব্রাহিম বিন মূসা বিন জাফর (আ.)’এর নেতৃত্বে ২০০ হিজরিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়। তিনিও ইয়েমেন থেকে আববাসিয় সমর্থকদেরকে বিতাড়িত করে। (আল কামেল ফিত তারিখ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩১০, ৩১১)

৩- মক্কা: হুসাইন বিন হাসান আফতাস আলাভি ২০০ হিজরিতে মক্কায় বিপ্লব করেন এবং তা হেজাজ এমনকি সম্পূর্ণ ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মামুন উক্ত বিপ্লবি কর্মকান্ডকে বন্ধ করার জন্য ঈসা বিন যাইদ জালুদিকে প্রেরণ করে যেন সে মিথ্যা অঙ্গিকার দানের মাধ্যেমে  হুসাইন বিন হাসান আফতাস আলাভিকে মামুনের বাইয়াত করতে বাধ্যে করে। (তাবারি, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২৬- ১২৭)

যখন মামুন দেখলো যে আব্বাসিয় খেলাফতের বিরূদ্ধে বিপ্লবকারীদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে রাসুল (সা.)’এর বংশধরের লোকজন। তখন সে ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর পরে বিভিন্ন বিপ্লবকে দমন এবং ইমাম রেযা (আ.)’কে নিজের নখদর্পনে রাখার জন্যে ষড়যন্ত্রের একটি  নীল নকশার পরিকল্পনা করে। আর এ কারণেই খলিফা মামুন ইমাম রেযা (আ.)কে মদিনা থেকে মার্ভে জোরপূর্বক ডেকে নিয়ে আসে। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫, আল কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৫৫)

ইমাম রেযা (আ.)কে পরবর্তি খলিফা পদটি দান করার পিছনে মামুনের বিশেষ কিছু উদ্দেশ্যে ছিল। সে মুসলমানদের কাছে প্রমাণ করতে চাচ্ছিলো যে, ইমাম (আ.)গণ ও খেলাফতের মসনদে বসার ইচ্ছা পোষণ করে কেননা সাধারণ জনগণ জানতো না যে, মামুন ইমাম রেযা (আ.) কে জোরপূর্বক মার্ভে নিয়ে এসেছে এবং তাঁকে জোরপূর্বক পরবর্তি খলিফা হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। যেহেতু ইমাম রেযা (আ.) মামুনের অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পর্কে অবগত ছিল সেহেতু তিনি শর্ত রাখেন যে, তিনি খেলাফতের কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৯, পৃষ্ঠা ১২৯- ১৩০)

মদিনা থেকে মার্ভএর পথে ইমাম রেযা (আ.):

মামুনের নির্দেশের কারণে কারণে ইমাম রেযা (আ.)কে পরিকল্পিতভাবে নিদৃষ্ট পথ দ্বারা মদিনা থেকে মার্ভে নিয়ে আসা হয়। ইমাম রেযা (আ.)কে মদিনা থেকে বাসরা, বাসরা থেকে সুকুল আহওয়ায’এর পথ দ্বারা ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে দিয়ে খোরাসান এবং তারপরে মার্ভে প্রবেশ করানো হয়। মদিনা থেকে মার্ভে আসার জন্য অন্য রাস্তাও সে যুগে ছিল যেমন: মদিনা থেকে কুফা, কুফা থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে রেই, রেই থেকে কুম, কুম থেকে খোরাসান এবং খোরাসান থেকে মার্ভ।

দ্বিতিয় উল্লেখিত রাস্তা থেকে এজন্য ইমাম রেযা (আ.)কে আনা হয়নি  কেননা কুফা এবং কুম হচ্ছে আহলে বাইত (আ.) অনুসারিদের ঘাটি এবং বাগদাদ হচ্ছে আব্বাসিয়দের ঘাটি যারা ছিল ইমাম আলি (আ.)’এর বংশদরদের চরম শত্রু। এমন যেন না হয় যে, তারা হজরত আলি (আ.)’এর সন্তানদের সাথে শত্রুতা থাকার কারণে ইমাম রেযা (আ.)কে হত্যা করে দেয়। আর এ কারণে মামুন প্রথম পথটিকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বলে মনে করে এবং উক্ত পথ দিয়ে ইমাম রেযা (আ.)কে মার্ভে নিয়ে আসে। ইমাম রেযা (আ.)’এর উক্ত সফরকে আমরা ৫ ভাগে ভাগ করতে পারি:

১- মদিনা থেকে বাসরা।

২- বাসরা থেকে ফার্স।

৩- ফার্স থেকে ইয়াযদ।

৪- ইয়াদ থেকে খোরাসান।

৫- ইমাম রেযা (আ.) ও খোরাসান।

খোরাসানে ইমাম রেযা (আ.)এর অবস্থান:

ইমাম রেযা (আ.)’এর নিশাপুরে অবস্থানের কথা বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। আর “হাদিসে সিলসিলাতুল যাহাব” হচ্ছে উক্ত ঘটনার প্রমাণ স্বরূপ। (আত তৌহিদ, পৃষ্ঠা ২৫)

ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম রেয়া (আ.) যখন নিশাপুরে পৌছান তখন তিনি এক লোকের মালিকানায় তার অনুমতিক্রমে অবস্থান করেন। সেখানে একটি একটি ঝর্ণাধারার সৃষ্টি হয় ইমাম (আ.) উক্ত পানি দ্বারা গোসল করেন এবং নামাজ আদায় করেন। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ১১১)

নিশাপুর থেকে রওনা হওয়ার পরে ইমাম আরেকটি ঝর্ণাধারার নিকটে পৌছান সেখানে একটি পাথর কাঠের তক্তার ন্যায় ছিল। ইমাম (আ.) সেখানে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করেন আর নামাজ আদায়কালে তাঁর পায়ের ছাপ উক্ত পাথরের উপরে থেকে যায় যা আজও পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। (তোহফাতুর রাযাওয়িয়া, পৃষ্ঠা ১৯০)

নিশাপুরের পরে ইমাম রেযা (আ.) তুস শহরের দিকে অগ্রসর হন। তিনি যোহরের সময় দাহ সুরখ নামক গ্রামের একটি পাহাড়ের নিকটে পৌছান। তিনি ওযুর জন্য সামান্য পরিমাণ মাটিকে খনন করলে সেখান থেকেও একটি ঝর্ণার উৎস হয় যা আজও পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ১১৩, যিন্দেগানি ইমাম রেযা, পৃষ্ঠা ২৫৬)

যখন তিনি তুস শহরে প্রবেশ করেন। তখন সেখানে তিনি একটি বাগান দেখতে পান যেখানে খলিফা হারুনর রশিদের কবর ছিল। যেখানে ইমাম রেযা (আ.)কে দাফন করা হবে তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেন। (ইসবাতুল ওয়াসিয়া, পৃষ্ঠা ৩৯১, উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা, বাহরুল ইনসাব, পৃষ্ঠা ১০৪- ১০৭)

যখন ইমাম রেযা (আ.) তুস নগরির পরে সারখাস নামক স্থানে প্রবেশ করেন তখন তাকে বন্দি করা হয়। মামুন দুইটি কারণে ইমাম (আ.)কে বন্দি করার নির্দেশ দেয়।

১- হাদিসে সিলসিলাতুল যাহাব বর্ণনা করার কারণে।

২- নিশাপুরের জনগণের উষ্ণ সম্বোর্ধনা জানানোর কারণে।

কেননা মামুন এমনভাবে ইমাম (আ.)কে মদিনা থেকে মার্ভে নিয়ে আসে যেন কোন শিয়া বা আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিরা তার সানিধ্যে অর্জন করতে না পারে। কিন্তু সে যা চিন্তা করেছিল তার বিপরিতটিই ঘটে আর এ কারণে সে ইমাম (আ.)কে সারখাস নামক এলাকা থেকে বন্দি করার নির্দেশ দান করে। আর নিজের ষড়যন্ত্রকে গোপন করার জন্য সে প্রচার করে যে ইমাম রেযা (আ.) উলুহিয়াত’এর (নিজেকে খোদা বলে দাবি করা) দাবি করেছেন আর এ কারণেই তাঁকে বন্দি করা হয়েছে। আর সে চেয়েছিল এভাবেই মুসলমানদেরকে ইমাম (আ.)’এর কাছ থেকে দূরে রাখেতে। (উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২৬- ৪২৭, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৫৯)

আর এভাবেই মামুন ইমাম (আ.)কে বেলায়াতে আহদি গ্রহণ করার জন্য বাধ্যে করে। যার পরিণাম ছিল শাহাদত। যেভাবে মামুন জনসম্মুখে বেলায়াতে আহদি ইমাম রেয়া উপরে চাপিয়ে দেয় অনুরুপভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে তার হৃদয়জ্বালা মেটাবার লক্ষ্যে ইমাম রেযা (আ.)কে জোরপূর্বক আঙ্গুরের সাথে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে। আর এভাবেই ২০৩ হিজরির ২৯শে সফরে রাসুল (সা.)’এর আরেকজন নির্বাচিত ইমামকে তাঁর উম্মতকে এতিম করে ইহলোকে পাড়ি জমান।