কেন আহলে সুন্নাতের মতাদর্শের অনুসারীগণ আশুরার দিনে রোজা রাখেন?

কেন আহলে সুন্নাতের মতাদর্শের অনুসারীগণ আশুরার দিনে রোজা রাখেন?

কেন আহলে সুন্নাতের মতাদর্শের অনুসারীগণ আশুরার দিনে রোজা রাখেন?

আশুরা,  আশুরার দিনে রোজা,  ইমাম হুসাইন, কারবালা, মাবিয়া, এজিদ, ইমাম সাদিক্ব,

এস, এ, এ

অভিধানবিদ ও সাহিত্যিকদের মতে আশুরা হচ্ছে মহরম মাসের দশম দিন আবার কেউ কেউ মহরম মাসের নবম দিনকেও আশুরার দিন বলে উল্লেখ করেছেন। (আল আইন, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৯)

কিন্তু শিয়াদের মতে আশুরা হচ্ছে মহরম মাসের দশম দিন। আল্লামা হিল্লি তার “মুনতাহিউল মাতলাব” নামক গ্রন্থের ২ খন্ডের ৬১১ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, মোহাক্কেক কিুম্মি তার গানায়েমুল আইয়াম নামক গ্রন্থের ৬ খন্ডের ৭৮ নং পৃষ্ঠায়, আল্লামা মাজলিসি তার মারাআতুল উকুল, ১৬ খন্ডের ৩৬২ নং পৃষ্ঠায় উক্ত বিষয় সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন অনুরূপভাবে অধিকাংশ আহলে সুন্নাত মতাদর্শের অনুসারীগণ শিয়াদের ন্যায় আকিদা পোষণ করেন এবং ১০ই মহরমকে আশুরার দিন বলে মনে করেন। ইবনে হাজার আসকালানি’এর মতে ইসলামি চিন্তাবিদগণ আশুরার দিন নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে মতভেদের সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদগণ ১০ই মহরমকে আশুরা বলে মনে করেন। (সওমে আশুরা বাইনাল সুন্নাতুন নাবী ওয়া বিদআতুল উমাভিয়া, পৃষ্ঠা ১৬, ফাতহুল বারি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৮)

যাইহোক রমজান মাসে রোজা ওয়াজিব হওয়ার পূর্বে উক্ত দিনে রোজা রাখা হতো যা আশুরার দিনে প্রচলিত ছিল। আর এ কারণে “মোহাক্কেকে নাজাফি” তার ‘জাওয়াহেরুল কালাম’ নামক গ্রন্থের ১৭ তম খন্ডের ১০৭ নং পৃষ্ঠায়, “মোহাক্কেক কুম্মি” তার ‘গানায়েমুল আইয়াম’ নামক গ্রন্থের ৬ খন্ডের ৭৮ নং পৃষ্ঠায় এবং সৈয়দ তাবাতায়ি তার মাদারেক নামক গ্রন্থের ৬ খন্ডের ২৬২ নং পৃষ্ঠায় উক্ত দিনে রোজা ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

অনুরুপভাবে আহলে সুন্নাত মতাদর্শের অনুসারিগণ আবু হানিফা’এর মতো আশুরার দিন রোজা রাখাকে ওয়াজিব বলে মনে করে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ি তার এক বর্ণনামতে আশুরার দিনে রোজা রাখাকে ওয়াজিব এবং অন্যএক বর্ণনামতে উক্ত দিনে রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, রমজান মাসের রোজা ওয়াজিব হওয়ার পরে উক্ত দিনে রোজা রাখার হুকুম মুস্তাহাবে পরিণত হয়েছে। (নাইলুল আওতার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩২৬)

সানআনি আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে বলেন যে, রমজান মাসের রোজা ওয়াজিব হওয়ার পূর্বে উক্ত দিনে রোজা ওয়াজিব ছিল। কিন্তু পরে তা মুস্তাহাব হয়ে যায়। (সুবুলুস সালাম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৬)

আশুরার দিন রোজা সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের অনুসারিগণ দুটি মতামতের অনুসরণ করেন:

১- একদল লোক যারা আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শহিদ হওয়ার কারণে আনন্দ, ফুর্তি করে এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য রোজা রাখে। আমরু বিন আবি ইউসুফ থেকে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন আমি শুনেছি যে, মাবিয়া মেম্বারের উপরে বসে বলছিল যে, আশুরার দিন হচ্ছে ঈদের দিন। সুতরাং যার ইচ্ছা সে রোজা রাখতেও পারে আবার না চাইলে নাও রাখতে পারে। (মোসনাফে আব্দুর রাজ্জাক, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯, হাদীস নং ৭৮৫০)

শারিফে রাযি আশুরা সম্পর্কে বলেন: ইরাকে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদতকে কেন্দ্র করে শোক পালন করা হতো কিন্তু উক্ত দিনে শামে বণি উমাইয়াগণ ঈদ উৎযাপন করতো।

মাক্বরিযি বলেন: মিশরে ফাতেমি হুকুমতকালে আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদতকে কেন্দ্র করে আয়াদারি এবং শোক পালন করা হতো। কিন্তু যখন বণি আইয়ুব ক্ষমতায় আসে তখন তারা উক্ত দিনে গোসল করতো, সুরমা লাগাতো, আমোদ ফুর্তি করতো আর এভাবে তারা শামে অধিবাসীদের অনুসরণ করতো। (আলামুন নোবালা, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪৩ )

সেকাফ বলেন যে, তারা উক্ত কাজগুলো কারবালার ঘটনাকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টার পরেও কারবালার সম্মান অক্ষুন্ন আছে।(সওমে আশুরা বাইনাল সুন্নাতুন নাবী ওয়া বিদআতুল উমাভিয়া, পৃষ্ঠা ১৩৯)

অতএব ঈদ উৎযাপন করা, সুরমা লাগানো, নিজেকে সাজানো, আনন্দ মূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল বণি উমাইয়ার বিদআতি কাজ সমূহের মধ্যে অন্যতম। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন ক্ষমতায় আসে তখন সে বলে যে আমি যদি কারবালাতে থাকতাম তাহলে আমিও কারবালার শহীদদের রক্ত ঝরাতে পারতাম।(ইসতেবসার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫)

আর ওহাবি বা সালাফিরা বণি উমাইয়ার উ্ক্ত আদর্শকে জিবীত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তারা বারবার ভুলে যাচ্ছে যে, তারা তাদের উক্ত কর্ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা রাসুল (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)’এর বিরোধিতা করছে।

জাফর বিন ঈসা ইমাম রেযা (আ.)কে আশুরার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: তুমি কি আমাকে ইবনে মারজানা’এর (ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ) রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করছো? ইবনে যিয়াদের বংশধরগণ ইমাম হুসাইন (আ.)কে হত্যা করার খুশিতে রোজা রাখে। উক্ত দিনটি রাসুল (সা.)’এর বংশধরগণ এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)দের জন্য হচ্ছে একটি অশুভ দিন। আর অশুভ দিনে রোজা রাখা জায়েজ বা শুভ না। রাসুল (সা.) সোমবারে মারা যান সেদিন হচ্ছে মুসলমানদের জন্য একটি অশুভ দিন। আর মুসলমানদের শত্রুরা সোমবার এবং আশুরার দিনটিকে তাদের জন্য অত্যান্ত মোবারক বলে মনে করে।

যখন যোরারে ইমাম সাদিক্ব (আ.)কে আশুরার দিনে রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তিনি তার উত্তরে বলেন: যে আশুরার দিনে রোজা রাখবে তার ভাগ্যে হবে ইবনে যিয়াদের ভাগ্যের ন্যায়। আমি ইমাম (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলোম যে, কি ধরণের ভাগ্যে তিনি বলেন আগুন।(ইসতেবসার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫)

২- অনেক আহলে সুন্নাতের লোকজন মহরম মাসের ফযিলতের কারণে নবম এবং আশুরার দিনে রোজা রাখেন। বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার জন্য আহলে সুন্নাতের মুফতিদের ফতোয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই যে, আলি বিন সুলাইমান মারদাভি যিনি হচ্ছে হাম্বালি মতাদর্শের অনুসারী তিনি বলেন: আশুরার দিন রোজা রাখাকে মুস্তাহাব রোজা সমূহের মধ্যে দ্বিতীয় মুস্তাহাব রোজা বলে মনে করেন তিনি বলেন: আশুরার দিনের রোজা হচ্ছে সারা বছরের কাফফারা স্বরূপ।(আল ইনসাফ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪৪)

মহিউদ্দিন বিন শারাফ নওভি যিনি হচ্ছে শাফেয়ি মতাদর্শের অনুসারী তিনি বলেছেন: ‘আবি কাতাদা’এর বর্ণিত রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে আশুরার দিনে রোজা রাখা হচ্ছে মুস্তাহাব। (আল মাজমু, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪০৬)

মোহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন রাশদ যিনি হচ্ছে মালেকি মতাদর্শের অনুসারী তিনি বলেছেন: আশুরার দিনে রোজা রাখা হচ্ছে মুস্তাহাব। রাসুল (সা.) উক্ত দিনে রোজা রেখেছেন আর তাই উক্ত দিনে রোজা রাখা হচ্ছে উত্তম।

মুসলমানদের কিছু শত্রু যারা রাসুল (সা.) এবং আহলে বাইত (আ.)’এর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য নিজেদেরকে আহলে সুন্নাত বলে দাবী করে। যদিও আহলে সুন্নাতের লোকেরাও তাদেরকে ঘৃণা করেন। কেননা আহলে সুন্নাতের লোকেরা উক্ত দিনে রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলে মনে করেন এবং তারা আশুরার দিনকে উদ্দেশ্যে করে রোজা রাখেন না। বরং তারা হয়তো কোন রেওয়ায়েতে দেখেছেন যে রাসুল (সা.) উক্ত দিনে রোজা রেখেছেন। তাই তারা রোজা রাখেন।  কিন্তু তাই বলে তারা রাসুল (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইত (আ.)’এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণের কারণে রোজা রাখেন না। কিন্তু মুসলমান নামধারি কিছু লোক যারা আশুরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোজা রাখে তারাই জান্নাতুল বাকি’এর কবরস্থানকে ভেঙ্গে সমতল করে দিয়েছে। যে জান্নাতুল বাকিতে শুয়ে রয়েছেন উম্মুল মুমিনিন এবং জলিলুল কদর সাহাবিগণ। প্রকৃতপক্ষে তারা হচ্ছেন ইসলাম এবং মুসলমানদের শত্রু। আর তাই তারা ছোট ছোট বিষয় সমূহকে মুসলমানদের মাঝে বর্ণনা করে বিভেদ সৃষ্টিরর চেষ্টা করে। মানুষের আমল গ্রহণকারী হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আর তাই মুসলমানদের উচিত ইসলামের ছোট ছোট বিষয়কে নিয়ে দ্বন্দ না করে গবেষণা করা উচিত। তাহলেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন হবে।