কিভাবে ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে শহীদ করা হয়

ইবনে শাহর আশুব তার “মানাকেবে আলে আবি তালিব” নামক গ্রন্থে এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যখন লোকজন মোতাসিমের কাছে বাইয়াত করে।তখন মোতাসিম মদিনার গভর্ণর আব্দুল মালিক’এর কাছে চিঠি লিখে সে যেন উম্মে ফজলের সাথে তার স্বামী ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে বাগদাদের প্রেরণ করে। যখন ইম

কিভাবে ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে শহীদ করা হয়

এস, এ, এ

 

নামঃ মোহাম্মাদ।
উপাধিঃ জাওয়াদ, তাক্বী, মোখতার, মোর্তযা, আলিম।
ডাক নামঃ আবু জাফর সানী, ইবনুর রেযা।
পিতার নামঃ ইমাম রেযা (আ.)।
মাতার নামঃ খিযারান।
জন্ম তারিখঃ ১০ই রজব। 
জন্মস্থানঃ মদীনা মুনাওয়ারা। 
আয়ুঃ ২৫ বছর। 
ইমামতকালঃ ১৭ বছর।
হত্যাকারীঃ ইমামের স্ত্রী উম্মুল ফযল, খলিফা মোতাসিম আব্বাসীর নির্দেশে।
শাহাদতঃ জিলক্বদ মাসের শেষ তারিখে ২২০ হিজরী।
দাফনের স্থানঃ বাগদাদ কাযমাইন।
তাঁর ইমামতকালে খলিফাগণঃ মামুন, মোতাসিম।
সন্তানঃ ৫জন, ২জন ছেলে এবং ৩জন কন্যা।

ইমাম জাওয়াদ (আ.) হচ্ছেন শিয়া মুসলমানদের ৯ম ইমাম। ইতিহাসে তার শাহাদতের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মাসউদির মতে তিনি ৫ই জিলহজ্ব ২১৯ হিজরীতে শাহাদত বরণ করেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত অনুযায়ি তিনি ২২০ হিজরী জিলকদ্ব মাসের শেষের দিকে শাহাদত বরণ করেন। তিনি ২৫ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। তাঁর শাহাদত সম্পর্কে তিন ধরণের মতামত উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম: ইবনে শাহর আশুব তার “মানাকেবে আলে আবি তালিব” নামক গ্রন্থে এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যখন লোকজন মোতাসিমের কাছে বাইয়াত করে।তখন মোতাসিম মদিনার গভর্ণর আব্দুল মালিক’এর কাছে চিঠি লিখে সে যেন উম্মে ফজলের সাথে তার স্বামী ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে বাগদাদের প্রেরণ করে। যখন ইমাম (আ.) বাগদাদের প্রবেশ করেন তখন তাকে বাহ্যিকভাবে সকলের সামনে অভর্থনা  জানানো হয়। অতঃপর মোতাসিম তার দাশ “আশনাস”এর মাধ্যেমে ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর কাছে শরবত প্রেরণ করে। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মোতাসিম ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে শহীদ করার জন্য দিনে তিনবার পর্যন্তও চেষ্টা করেছিল। যেন সে ইমাম (আ.)’এর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।

“আশনাস” শরবতটি নিয়ে ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর কাছে নিয়ে এসে বলে: উক্ত শরবতটি খলিফা বিশেষ করে আপনার জন্য বানিয়েছেন এবং উক্ত শরবতটি আপনার পূর্বে তিনি এবং অনেকজনেই পান করেছে। তিনি আমাকে বলে পাঠিয়েছেন যেন আপনি তা বরফের সাথে মিলিয়ে পান করে করেন। অতঃপর সে বরফ নিয়ে আসে এবং ইমাম (আ.)’এর জন্য শরবত তৈরি করে। ইমাম (আ.) বলেন শরবত রেখে যাও আমি রাতে পান করবো। “আশনাস” ইমাম (আ.) বলে যে বরফ গলে যাওয়ার পূর্বেই তা পান করুন। ইমাম (আ.) যতই শরবতটি পান করার ক্ষেত্রে অজুহাত উপস্থাপন করছিলেন ততই সে ইমাম (আ.)কে জোরালোভাবে আহবান জানাতে থাকে। অবশেষে ইমাম (আ.) উক্ত বিষ মিশ্রিত শরবত পান করেন।

আল্লামা সৈয়দ জাফর মোর্তযা আমেলি বলেন: হয়তো মোতাসিম ইমাম (আ.)কে দিনে তিনবার বিষ দ্বারা শহীদ করার চেষ্টা করে যেন সে ইমাম (আ.)’এর মৃত্যু সম্পর্কে  নিশ্চিত হতে পারে। কেননা রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়নি যে ইমাম (আ.) “আশনাস”এর দেয়া শরবত পান করার কারণে শাহাদত বরণ করেন।

দ্বিতীয়: আল্লামা তাকি মাজলিসী তার জালাউল উয়ুন নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মোতাসিম তার এক বার্তা লেখককে দ্বায়িত্ব দেয় যে, সে যেন আবু জাফর “ইমাম জাওয়াদ”কে নিজের ঘরে দাওয়াত দেয় এবং তাঁর খাদ্যতে যেন বিষ মিশিয়ে দেয়। কিন্তু যখন সে ইমাম (আ.)কে দাওয়াত দেয় তখন তিনি তাকে বলেন: তুমিতো জান যে, আমি তোমাদের জলসাতে উপস্থিত হতে পারবো না বা চাই না। তখন সে তাঁকে বলে আমি শুধুমাত্র আপনাকে বিভিন্ন খাদ্যে দ্বারা আপ্যায়ন করতে চাই। আর আপনার উপস্থিতি আমার ঘরকে আরো বরকতময় করে তুলবে এবং শুধু এটাই না বরং খলিফার উজিরগণও আপনার সাথে দেখা করতে আগ্রহি। অতঃপর ইমাম (আ.) বাধ্যে হয়ে উক্ত লোকটির বাড়িতে যান।

ইমাম (আ.) খাদ্য আহার করার সাথে সাথে বিষের প্রভাব অনুভব করেন। যখন তিনি তাঁর ঘোড়া নিয়ে স্বীয় ঘরের দিকে রওনা হতে চান তখন উক্ত ব্যাক্তিটি তাকে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু তিনি তার প্রতিউত্তরে বলেন আমার এখানে উপস্থিত থাকার চেয়ে প্রস্থান করা তোমার জন্য মঙ্গলজনক! যখন ইমাম (আ.) বাড়িতে পৌছান তখন তাঁর সারা শরীরে বিষের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আর উক্ত অবস্থায় তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বিষের যন্ত্রণায় কাঁতরাতে থাকেন।

তৃতীয়: আল্লামা মোহাম্মাদ হুসাইন মোজাফফর তার “তারিখুশ শিয়া” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর প্রতি খলিফা মোতাসিম যথেষ্ট বিদ্বেষ পোষণ করতো আর এ কারণে সে ইমাম (আ.)কে কারাগারে বন্দি করে। কিন্তু অবশেষে তাঁকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেয়ে আর কোন উপায় সে খুজে পায় না। অবশেষে সে উক্ত উদ্দেশ্যে হাসিলের লক্ষ্যে মামুনের কন্য “উম্মে ফজল” (ইমাম (আ.)’এর স্ত্রীকে যাকে মোতাসিম ইমাম (আ.)’এর উপরে নজরদারী করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল) তাকে মোতাসিম বিষ দেয় যেন সে ইমাম (আ.)’এর খাবারে উক্ত বিষটি প্রয়োগ করে এবং সেও মোতসিমের নির্দেশ অনুযায়ি কাজ করে।

শেইখ আব্বাস কুম্মী তার “মুনতাহিউল আমাল” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “উম্মে ফজল” আঙ্গুরকে বিষাক্ত করে ইমাম (আ.)’এর সামনে উপস্থিত করে। যখন ইমাম (আ.) উক্ত বিষ মিশ্রিত আঙ্গুর খান। তখনই তার শরীরে বিষের  প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তখন উম্মে ফজল ভয় পেয়ে কাঁদতে থাকে। ইমাম (আ.) তাকে বলেন আমাকে বিষ দিয়ে তুমি ক্রন্দন করছো। আল্লাহর শপথ তুমি এমন এক রোগে আক্রান্ত হবে যে তার কোন প্রতিকার থাকবে না। অবশেষে ইমাম (আ.)’এর কথায় প্রমাণিত হয় উম্মে ফজল এমন এক রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়।

মাসউদি তার “ইসবাতুল ওয়াসিয়া” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মোতাসিম এবং জাফর উভয়ে ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর খাবারে বিষ দিতে উম্মে ফজলকে বাধ্যে করে অবশেষে জাফর বিন মামুন নেশাগ্রন্থ অবস্থায় কুয়াতে পড়ে মারা যায় এবং পরে তাকে কুয়া থেকে বাহির করা হয়।

ইমাম (আ.)’এর শাহাদতের পরে অনুসারীগণ তাঁর বাড়ির চারিধারে জমা হয়। যেহেতু মোতাসিম সেখানে উপস্থিত ছিল সেহেতু লোকজনদেরকে তাঁর জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয়া হয়।

অবশেষে ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর পবিত্র দেহকে গোসল ও কাফন পরানোর পরে তার দাদা ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর কবরের পাশে দাফন করে দেয়া হয়।

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর যোগ্য সন্তান ইমাম আলি নাকি (আ.) কারামতের মাধ্যেমে মদিনা থেকে সেখানে আসেন এবং তাঁর বাবা ইমাম জাওয়াদ (আ.) কে গোসল দেন, কাফন পরান, জানাযার নামাজ আদায় করেন এবং দাফন করার পরে আবার তিনি মদীনাতে ফিরে যান।