ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর শাহাদত সম্পর্কিত তিনটি মতামত

ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর শাহাদতের ঘটনাকে তিনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১- ইবনে শাহ আশুব তার মানাকেবে আহলে বাইত নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন জনগণ মোতাসিমের কাছে বাইয়াত করে তখন সে মদীনার গর্ভনর আব্দুল মালিকে কাছে চিঠি লিখে নির্দেশ দেয় যে, ইমাম জাওয়াদ (আ.)’কে

ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর শাহাদত সম্পর্কিত তিনটি মতামত

এস, এ, এ 

 

ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর শাহাদতের ঘটনাকে তিনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

১- ইবনে শাহ আশুব তার মানাকেবে আহলে বাইত নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন জনগণ মোতাসিমের কাছে বাইয়াত করে তখন সে মদীনার গর্ভনর আব্দুল মালিকে কাছে চিঠি লিখে নির্দেশ দেয় যে, ইমাম জাওয়াদ (আ.)’কে যেন উম্মে ফজল’এর সাথে মদীনাতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যখন ইমাম (আ.) মদীনাতে প্রবেশ করেন তখন সবাই তাকে সম্মান প্রদর্শন করে। মোতাসীম তার দাশ আশনাস’এর মাধ্যমে ইমাম (আ.)’কে বিষাক্ত শরবত প্রেরণ করে। বর্ণিত হয়েছে যে, মোতাসীম ইমাম (আ.) কে দিনে তিনবার বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করে। যেন সে ইমাম (আ.) এর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।

আশনাস ইমাম (আ.)এর কাছে বিষ মিশ্রিত শরবতটি নিয়ে এসে বলে উক্ত শরবতটি খলিফা নিজের হাতে বানিয়েছেন এবং তা বিভিন্ন ব্যাক্তিরাও পান করেছেন এবং খলিফা নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনিও যেন উক্ত শরবতটি পান করেন। তারপরে সে বরফ দিয়ে শরবতটি প্রস্তুত করে ইমাম (আ.) এর কাছে তা উপস্থাপন করে। ইমাম (আ.) বলেনঃ রেখে দাও আমি শরবতটি রাতে পান করবো। তখন আশনাস বলে যে শরবতটি ঠান্ডা পান করুন না হলে বরফটি পানিতে পরিণত হবে। ইমাম (আ.) যতই বিষাক্ত শরবত পান করতে বিলম্ব করছিলেন সে ততই তাকিদ করছিল। অতঃপর ইমাম (আ.) আশনাসের বারবার আবেদনের কারণে অবশেষে বিষাক্ত শরবতটি পান করেন।

আল্লামা সৈয়দ জাফর মোর্তজা আমেলি বলেনঃ হয়তো ইমাম (আ.) কে শহীদ করার জন্য খলিফা তিনবার চেষ্টা করে যেন সে ইমাম (আ.) এর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।

২- আল্লামা মোহাম্মাদ তাকি মাজলিসি (রহ.) তার “জালাউল উয়ুন” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মোতাসীম তার এক লেখককে নির্দেশ দেয় যে, সে যেন ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে নিজ বাসায় দাওয়াত করে এবং তার খাদ্যে যেন বিষ মিশিয়ে দেয়। সেও অনুরুপটি করে। কিন্তু ইমাম (আ.) তার দাওয়াতকে গ্রহণ না করে তাকে বলেনঃ তুমিতো জান যে, আমি তোমাদের উক্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবো না। কিন্তু সে বলেঃ আমার অনুষ্ঠানের মূখ্য উদ্দেশ্যে হচ্ছেন আপনি কেননা উক্ত অনুষ্ঠানে খলিফার একজন মন্ত্রী আপনার সাথে সাক্ষাত করতে আসবেন। অতঃপর ইমাম (আ.) নিজের অনিচ্ছা সত্তেও তার বাসায় যান। যখন ইমাম (আ.) বিষাক্ত খাদ্যটি খান। যখন তিনি বিষের প্রভাবকে তার শরীরে অনুভব করেন। তখন তিনি নিজের ঘোড়াকে আনার নির্দেশ দান করেন। কিন্তু লোকটি তাকে আসতে বাধা দান করে। তখন ইমাম (আ.) তাকে বলেনঃ আমাকে তোমার বাড়ির বাইরে চলে যেতে দাও কেননা এটাই তোমার জন্য মঙ্গলজনক! যখন ইমাম (আ.) নিজ বাড়িতে পৌছান তখন তিনি তার শীররে বিষের যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করেন। তিনি সারা দিন ও রাত্রি ছটফট করতে থাকেন অবশেষে তিনি শাহাদতের অমীয় সুধা পান করেন। ইমাম (আ.)’এর অনুসারীরা ইমাম (আ.)’এর বাড়ির চারিপাশে একত্রিত হয় কিন্তু খলিফা জানাজার নামাজ পড়াবে বলে কাউকে ইমাম (আ.)’এর ঘরের কাছে আসতে দেয়া হয়নি।

৩- আল্লামা মোহাম্মাদ হুসাইন মোজাফফর (রহ.) তার “তারিখে শিয়া” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যেহেতু ইমাম জাওয়াদ (আ.) এর প্রতি খলিফা মোতাসীম বিদ্বেষ পোষণ করতো সেহেতু সে ইমাম (আ.)কে বন্দি করার নির্দেশ দান করে। কিন্তু তারপরেও সে কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে ইমাম (আ.)’কে শহীদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এজন্যই সে ইমাম (আ.)’কে মুক্ত করে দেয় এবং যখন হারুন’এর কন্যা উম্মে ফজল ও ইমাম (আ.)’এর স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি সম্পর্কে মোতাসীম অবগত হয় এবং সে তাকে ইমাম (আ.) কে বিষ প্রয়োগের জন্য নির্দেশ দেয়। উম্মে ফজল ও উক্ত প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় এবং সে মোতাসীম’এর দেয়া বিষ ইমাম (আ.) কে খাওয়ায়।

শেইখ আব্বাস কুম্মী তার “মুনতাহিউল আমাল” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, উম্মে ফজল আঙ্গুরে বিষ প্রয়োগ করে ইমাম (আ.)’এর সামনে উপস্থাপন করে। যখন ইমাম (আ.) উক্ত বিষাক্ত আঙ্গুরটি খান তখন শরীরে বিষের প্রভাবকে উপলব্ধি করেন। তখন উম্মে ফজল তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং ক্রন্দন করতে থাকে। ইমাম (আ.) তাকে বলেনঃ আমাকে বিষ দান করে তুমি ক্রন্দন করছো। মহান আল্লাহর শপথ তুমি এমন এক রোগে আক্রান্ত হবে যার কোন চিকিৎসা থাকবে না। আর ইমাম (আ.)’এর ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ি সে এমন এক রোগে আক্রান্ত হয় যে, সে উক্ত রোগের কারণেই সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

“ইসবাতুল ওয়াসিয়াত” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মোতাসীম এবং জাফর বিন মামুন উভয়ে ইমাম জাওয়াদ (আ.)কে বিষ প্রয়োগের জন্য উম্মে ফজল নির্দেশ দেয়। আর উক্ত অপরাধের পরিণামে জাফর বিন মামুন নেশাগ্রস্থ অবস্থায় কুয়াতে পড়ে যায় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। অবশেষে তার মৃত দেহকে কুয়া থেকে তোলা হয়।

ইমাম জাওয়াদ (আ.)’এর শাহাদতের পরে তার অনুসারীরা তার ঘরের আশেপাশে একত্রিত হয়। কিন্তু খলিফার নির্দেশে কাউকেই তার পবিত্র লাশের কাছে আসতে দেয়া হয়নি। ইমাম (আ.)কে গোসল, কাফনের পরে তার পিতামহ ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর কাছে দাফন করে দেয়া হয়।

হয়তো জনসম্মুখে “ওয়াসেক বিল্লাহ”  ইমাম (আ.)’এর জানাযার নামাজ পড়ায় কিন্তু বিশ্বস্ত রেওয়ায়েত অনুযায়ি তাঁর সন্তান ইমাম আলী নাক্বি (আ.) মদীনা থেকে “তাইয়ুল আরয” করে আসেন এবং তার বাবাকে গোসল দেন, কাফন পরান এবং জানাযার নামাজ শেষে তাকে দাফন করে দেন।