আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)'এর শাহাদত ও ইরানের পরাজয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)'এর শাহাদত ও ইরানের পরাজয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)'এর শাহাদত ও ইরানের পরাজয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

এস, এ, এ

hussain, mohammad, imam mahdi, সিফফিন, জামালের যুদ্ধ, নারওয়ানের যুদ্ধ, খলিফা, খেলাফত, ইমামত, আলী, সিদ্দীক, ফারুক, মোর্তযা, বদর, ওহদ, খন্দক, খায়বার, বণী Shia, Sunni, Islam, Quran, Karbala, najaf, kufa, mashad, samera, madina, makka, jannatul baqi, kazmain, ali, Fatima, hasan, সাকিফা, বণী সায়াদা, সাহাবী, হিজবুল্লাহ, ইসরাইল, ড্রোন, বিমান, হাসান নাসরুল্লাহ , লেবানন, ইরান,  চীন, মালয়েশিয়া,  স্যাটেলাইট, কুয়ালালামপুর, বেইজিং, ভিয়েতনাম, মার্কিন, গোয়েন্দা, ইরাক, সিরিয়া, মিশর, আল কায়েদা, তাকফিরী, ইখওয়ানুল মুসলেমিন, বাংলাদেশ, ভারত, জিহাদ, ফিলিস্তিন, ইহুদি, গাজা, শহীদ, জিহাদ, ক্ষেপণাস্ত্র, দূতাবাস, সৌদি আরব , কুয়েত, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, আমেরিকা, ভিয়েনা, পরমাণু, বাহারাইন, আফগানিস্থান, থাইল্যান্ড, হজরত ফাতিমা, মার্জিয়া, সিদ্দিকা, মোহাদ্দেসা, বাতুল, উম্মে আবিহা, যাহরা, মুবারেকা, যাকিয়া, তাহেরা, রাযিয়া, জিহাদুন নিকাহ, পোপ, পাদ্রি, বাইতুল মোকাদ্দাস, ওহাবী, সালাফি, মুফতি, ড্রোন, পাকিস্থান, এজিদ, মাবিয়া, আবু সুফিয়ান, আলী আকবর, হুসাইন, শাবান, আমল, শবে বরাত, রমজান,
সিরিয়ায় আম্মার (রা.)'র মাজার
আজ হতে ১৩৮৬ চন্দ্র-বছর আগে ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে রোমান সেনাদের হাতে ইরানের সাসানীয় সম্রাটের সেনারা পরাজিত হলে পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মহান আল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণিত হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে কুরআন মানুষের রচিত কিতাব নয়, বরং ঐশী গ্রন্থ বা আল্লাহর কিতাব।

সে যুগের দুই প্রধান পরাশক্তি ছিল পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য। পারসিক ও পূর্বাঞ্চলীয় রোমানদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকত প্রায় সব সময়। মূর্তি-পূজারী আরবরা সে সময় অগ্নি উপাসক ইরানকে সমর্থন করত।

ইরাকের নেইনাভা বা নিনেভা অঞ্চলে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের বাইজান্টাইন সেনারা পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর সেনাদের পরাজিত করে। পূর্বাঞ্চলীয় রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আর্মেনীয় সেনাপতি ‘রোখ ভিহান’ বা ‘রাহজাধ’ ছিলেন এই বিজয়ের স্থপতি। এ বিজয় রোমান ও পারসিকদের ২৬ বছরের যুদ্ধের ইতিহাসে সাসানীয় রাজবংশের ক্ষমতা ও দর্প চূর্ণ করে। যুদ্ধের প্রথমদিকে ইরানিরা ভূমধ্য-সাগর সংলগ্ন বিশাল অঞ্চল, মিশর ও আনাতোলিয়া বা আধুনিক তুরস্কের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করেছিল। এমনকি ইরানিরা বাইজান্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বা বর্তমান ইস্তাম্বুল (ইসলামবুল) দখল করেছিল।

মূর্তি পূজারী আরবরা সে যুগের একত্ববাদী খ্রিস্টানদের ওপর অগ্নি উপাসক ইরানিদের বিজয়ে উল্লসিত হয়েছিল এবং তারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কেও উপহাস করে বলেছিল, তোমার ক্ষুদ্র বা শিশু মুসলিম সম্প্রদায় শিগগিরই নির্মূল হবে। এর জবাবে মহান আল্লাহ সুরা রুমের প্রথম আয়াতে বলেছেন, যদিও রোমানরা নিকটবর্তী অঞ্চলে পরাজিত হয়েছে, তবুও তারা শিগগিরই বিজয়ী হবে।

কনস্টান্টিনোপলের ওপর ইরানি অবরোধের সময়ে হেরাক্লিয়াস রোমান সম্রাট হন এবং তিনি ক্ষমতাসীন হয়েই তুর্কি খাগানাত রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন। এ রাষ্ট্রের সম্রাট তুর্কি উপজাতিদের নিয়ে গঠিত ৪০ হাজার সেনার এক শক্তিশালী বাহিনী পাঠায় পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। তারা ককেশাস অঞ্চলে ইরানি সাম্রাজ্যকে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালায়, ফলে ইরানিরা রোমান ফ্রন্ট থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। ইরাকে নিনেভার পর আরো কয়েকটি শহরের পতন ঘটলে ইরানি সেনারাই বিদ্রোহ করে দ্বিতীয় খসরুকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তারা ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে খসরুর ছেলে ‘দ্বিতীয় কাভাধ’-কে নতুন ইরানি সম্রাট করে। খসরুকে একটি কারাগারে রাখা হয়। কারাবাসের পঞ্চম দিনে কয়েকটি তীরের আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য পরস্পর দীর্ঘ বহু বছর ধরে যুদ্ধ করে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে অল্প কয়েক বছর পরই তারা আরবের মরুচারী মুসলমানদের হাতে পরাজিত হয়। বিশ্বনবী (সা.) এই দুই পরাশক্তির সম্রাটকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। হেরাক্লিয়াস চিঠির প্রতি সম্মান দেখিয়েছিল। কিন্তু ইরানের খসরু অবজ্ঞাভরে রাসূল (সা.)’র চিঠি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে এবং হিজাজে হামলা চালাতে ইয়েমেনের গভর্নরকে নির্দেশ দেন। কিন্তু শিগগিরই সে নিহত হয়।

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)'র শাহাদত

সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের কাছে সিফফিন প্রান্তরে ১৩৯৮ চন্দ্র বছর আগে ৩৭ হিজরির এমন দিনে (নয়ই সফর) বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র অতি ঘনিষ্ঠ ও বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)।

ঐতিহাসিক সিফফিনের যুদ্ধ চলাকালে (যুদ্ধটি শুরু হওয়ার পর নবম দিনে) তাঁর ওই শাহাদতের শোকাবহ ঘটনাটি ঘটে। এই যুদ্ধে তিনি ছিলেন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)’র পদাতিক সেনাদের ( ইরাকি কুফা ব্রিগেডের) অন্যতম কমান্ডার। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। আম্মারের বাবা-মা ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদ। মক্কার কাফের মুশরিকরা তাঁদের শহীদ করেছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অপরাধে।

প্রিয় সাহাবি হযরত আম্মার (রা.) যে বিদ্রোহী বা জুলুমবাজদের হাতে শহীদ হবেন তা ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন বিশ্বনবী (সা.)। মুয়াবিয়ার দলের এক কাপুরুষ সেনা পেছন থেকে বর্শা নিক্ষেপ করে তাঁকে আহত করলে একই বাহিনীর অন্য এক নরাধম তাঁকে শহীদ করে। এ সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু দূরে গিয়ে দুধ বা পানি পান করছিলেন। আম্মারের পর তাঁর বীর সঙ্গী বা সহযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা হাশিম ইবনে উতবা (রা.)ও বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন। সিরিয়ার রাক্কা শহরে আম্মার (রা.)’র মাজার রয়েছে। আজও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ওই মাজার জিয়ারত করে থাকেন।

হযরত আম্মার (রা.) যুদ্ধ চলাকালে যেদিকেই অভিযান চালাতেন সেদিকেই রাসূল (সা.)’র সাহাবিরা তাঁর চারদিকে জড় হয়ে তাঁকে রক্ষার জন্য প্রহরা দিতেন এবং তারা এমন প্রবল হামলা চালাতেন যে শত্রুপক্ষে লাশের পর লাশ পড়ে যেত। মুয়াবিয়া এ অবস্থা দেখে আম্মারের দিকে হামলা চালানোর জন্য রিজার্ভ সেনাদের থেকে একদল সেনাকে সেদিকে পাঠায়। কিন্তু হযরত আম্মারের তরবারি ও বর্শার নৈপুণ্যের কাছে তারা টিকতে পারেনি।

যুদ্ধের নবম দিনেই এক পর্যায়ে হযরত আলী (আ.)’র অন্যতম সেনাপতি মালিক আশতারের নেতৃত্বাধীন মুজাহিদরা মুয়াবিয়ার ওপর হামলা চালানোর জন্য অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা মুয়াবিয়ার রক্ষী বাহিনীর ৫ টি প্রতিরক্ষা ব্যূহ বা চক্রের মধ্যে চারটিই ছত্রভঙ্গ করে। এ অবস্থায় মুয়াবিয়া ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল। কিন্তু এ সময় তার পক্ষের কেউ একজন তাকে সাহস দেয়ায় মুয়াবিয়া ফিরে দাঁড়ায়।

এ সময়ও রণাঙ্গনের অন্যদিকে হযরত আম্মার ও তাঁর সঙ্গীর তরবারির প্রবল বিক্রম মুয়াবিয়ার বাহিনীর মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল।

হযরত আম্মার (রা.)’র শাহাদতের ঘটনা মুয়াবিয়ার সেনাদের অনেকের মধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। কেউ কেউ বলতে থাকে- তাহলে প্রমাণিত হল আমরা যারা আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি তারা জুলুমবাজ, বিদ্রোহী। ধূর্ত মুয়াবিয়া তাদের শান্ত করার জন্য বলে যে, যারা আম্মারকে যুদ্ধক্ষেত্রে ডেকে এনেছে সেই আলীর দলই তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী, তারাই আম্মারের হত্যাকারী! জবাবে হযরত আলী (আ.) বলেছিলেন, তাহলে তো বলতে হয় রাসূল (সা.)-ই তাঁর চাচা হযরত হামজাহ (রা.)’র হত্যাকারী ছিলেন, (নাউজুবিল্লাহ!) কারণ, তিনিই তাঁকে ওহদের যুদ্ধে নিয়ে এসেছিলেন!

ইমাম বুখারির বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ বুখারিতে (বুখারি, খণ্ড-১, পৃ-৩৯৪)এসেছে: .... হায়রে আম্মার! বিদ্রোহী গোষ্ঠী তোমাকে হত্যা করবে। আম্মার তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকবে আর তারা (বিদ্রোহীরা) তাকে দোযখের আগুনের দিকে ডাকবে।(অর্থাত মুয়াবিয়ার দল জাহান্নামের দিকে আহ্বান জানাত। আর আম্মার ডাকতেন আলীর-আ. পথের দিকে তথা বেহেশতের দিকে।)

এমন স্পষ্ট হাদিসের পরও মুয়াবিয়া ইজতিহাদি ( ইজতিহাদ হল ইসলামী মূল নীতির ভিত্তিতে নতুন বা স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা আবিষ্কার) ভুল করেছেন বলে সাফাই দেয়ার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে বুখারির হাদিসে (আম্মারের মানাকিব বা মর্যাদা অধ্যায়ে, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠ-৫৩০) এসেছে, (রাসুল-সা. বলেছেন,) ‘শয়তান কখনও আম্মারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে না।’ আম্মার আগাগোড়াই ছিলেন আলীর (আ. পক্ষে। মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আস তা জানা সত্ত্বেও আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অব্যাহত রেখেছিল এবং তারা আম্মারকে হত্যা করার পরও সঠিক পথ ধরেননি।

আম্মার (রা.) ও তাঁর বীর সঙ্গীর শাহাদতের ঘটনায় হযরত আলী (আ.) অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত হন। (বিশ্বস্ত সঙ্গীদের সংখ্যা কমে আসায় এবং সুবিধাবাদী ও কপট লোকদের ফিতনা আর হয়রানি বাড়তে থাকায় হযরত আম্মারসহ প্রিয় সঙ্গীদের নাম উচ্চারণ করে আমিরুল মুমিনিন পরবর্তীকালে মাঝে-মধ্যে কাঁদতেন বা একবার ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।) যাই হোক, তিনি বিদ্রোহীদের উচিত শিক্ষা দিতে হামাদান ও রাবিয়াহ গোত্রের লোকদের নির্দেশ দেন। ফলে এ দুই গোত্রের বারো হাজার সেনা হুদায়ন ইবনে মুনজির (রা.)’র নেতৃত্বে বিপুল বিক্রমে বিদ্রোহীদের ওপর হামলা চালায়। তারা শত্রুদের ব্যূহ একের পর এক ভেদ করে রক্তের স্রোত বইয়ে দেয় এবং স্তূপীকৃত হতে থাকে শত্রুপক্ষের লাশ। রাতের ঘন অন্ধকার না নামা পর্যন্ত তাদের তরবারি থামেনি। এই রাত ইতিহাসে আল-হারিরের ভয়াবহ রাত নামে খ্যাত।

আমিরুল মু’মিনিনের দিক থেকে ‘অন্যায় ও বিভ্রান্তি নিপাত যাক’ শ্লোগান মুজাহিদদের সাহস ও শৌর্য বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আর বিদ্রোহীদের হৃদয় শুকিয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের তীর ও বর্শা নিঃশেষ হয়ে গেলে হাতে হাতে তরবারির যুদ্ধ চলতে থাকে। সকালে দেখা গেল ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

 

দশম দিনেও একই মনোবল নিয়ে আলী (আ.)’র পক্ষের মুজাহিদরা যুদ্ধ শুরু করে। তাঁদের তীব্র আক্রমণে মুয়াবিয়ার দলের পরাজয় যখন অত্যাসন্ন হয়ে ওঠে তখন এই বিদ্রোহীদের এক ধূর্ত নেতার পরামর্শে বিদ্রোহীরা ৫০০ কুরআনের পাতা বর্শার আগায় বেঁধে তুলে ধরলে যুদ্ধের অবস্থা বদলে যায়। এটা যে প্রতারণা বা ধোঁকা আলী (আ.)’র সেনাদের অনেক সরলমনা সেনা তা বুঝতে ব্যর্থ হয়। হযরত আলী (আ.) তাদের অনেক বোঝালেন যে, আমরা তো তাদেরকে প্রথমে বলেছিলাম কুরআন অনুযায়ী বিরোধের মীমাংশা করতে। কিন্তু তারা তখন তা গ্রাহ্য করেনি, এখন বিপদে পড়ে ধোঁকা দেয়ার জন্যই তারা কুরআনের কথা বলছে, কুরআনকে মেনে চলা তাদের লক্ষ্য নয়। আসলে বিদ্রোহীরা প্রথম থেকেই কুরআনকে অবজ্ঞা করে এসেছে ন্যায়সঙ্গত খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মাধ্যমে। তারা বিপদে পড়েই এখন কুরআনের ধুয়া তুলছে। কিন্তু আলী (আ.)'র শিবিরের সরলমনা সেনারা যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করে মজলুম খলিফা হযরত আলী (আ.)-কে।

মুয়াবিয়া আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের কপটতা তুলে ধরে বাংলার কবি লিখেছেন:

এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান ! (নজরুল)

এরপরে ওই সরলমনা ও প্রতারিত সেনারা কথিত শান্তি-আলোচনার আয়োজন করে। তারা হযরত আলী (আ.)’র বিরোধিতা সত্ত্বেও এমন একজনকে হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে সালিশ হিসেবে নিয়োগ দেন যে দুর্বল-মনের অধিকারী (আবু মুসা আশআরী) এবং হযরত আলী (আ.)’র বিরোধী। অন্যদিকে মুয়াবিয়ার পক্ষে কথা বলতে আসে ধূর্ত আমর ইবনুল আস্ি। সে খুব সহজেই প্রতারিত করে আবু মুসাকে। সালিশের ফলাফল মুয়াবিয়ার পক্ষে নিয়ে যায় আস্। এ সময় আলী (অ.)’র পক্ষের প্রতারিত ব্যক্তিরা আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তারা মানুষের সালিশের আয়োজন মানার জন্য হযরত আলী (আ.)-কে বিচ্যুত ও এমনকি কাফের বলে ঘোষণা দিয়ে দলত্যাগ করে। অথচ তারা নিজেরাই আপোস-আলোচনার আয়োজন মেনে নিতে হযরত আলী (আ.)-কে বাধ্য করেছিল। ইতিহাসে এরা খারেজি বা দলত্যাগী নামে কুখ্যাত।

বিশ্বনবী (সা.) বলেছিলেন: আমি যদি খারেজিদের দেখা পেতাম তাহলে তাদের পুড়িয়ে দিতাম।

সিফফিনের যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল প্রায় চারমাস। এ যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে ৪৫ হাজার নিহত এবং হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে শহীদ হন পঁচিশ হাজার মুজাহিদ। এই যুদ্ধের অষ্টম দিনে হযরত আলী (আ.) নিজেই বর্শা ও তীর বৃষ্টি উপেক্ষা করে মুয়াবিয়ার খুব কাছে চলে আসেন এবং তাকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে নামার আমন্ত্রণ জানান যাতে লোকক্ষয় না হয় ও বিজয়ী ব্যক্তি খলিফা হন। আমর ইবনে আস মুয়াবিয়াকে এ আমন্ত্রণ গ্রহণের পরামর্শ দিলেও মুয়াবিয়া বলেছিল: আমি তোমার প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে প্রাণ হারাতে চাই না আস্, আসলে তুমি (আস্) চাও আমি নিহত হলে তুমিই সিরিয়ার শাসক হবে! মহাবীর তথা ‘আল্লাহর সিংহ’ (আসাদুল্লাহ বা শেরে খোদা) নামে খ্যাত হযরত আলী (আ.) মুচকি হেসে ফিরে যান।

ইতিহাসে এও এসেছে, মুয়াবিয়া আসকেই বলে যে, পারলে তুমি আলীর সঙ্গে যুদ্ধ কর। আস‌ প্রথমে বীরত্ব দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এক পর্যায়ে আলী (আ.)-কে নিজের দিকে আসতে দেখে নিশ্চিত মৃত্যু এড়ানোর জন্য করুণা লাভের প্রত্যাশায় উলঙ্গ হয়ে পড়ে। আলী (আ.) তার ওই অবস্থা দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং ফিরে যান।

মুয়াবিয়ার নানা অপকীর্তির মধ্যে হযরত আলী (আ.)’র সঙ্গে নানা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া, ইমাম হাসান (আ.)-কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা এবং এই মহান ইমামের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো লঙ্ঘনের কথা (যেমন, ইয়াজিদকে যুবরাজ নিয়োগ করা) বলা যায়। মুয়াবিয়া তৃতীয় খলিফা ওসমান হত্যার বদলা নেয়ার নাম করে ও সব কিছুর আগে ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি তুলে আলী (আ.)'র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছিল। তার এইসব দাবি যে প্রতারণা ছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন সে আলী (আ.)'র শাহাদতের পর থেকে নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহু বছরের মধ্যেও কখনও আর তৃতীয় খলিফাকে হত্যার বিচার প্রসঙ্গ মুখেও আনেনি এবং এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।

খারেজিদের ফেতনা এবং এক বছর পর একই দিনে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তাদের পরাজয়:

১৩৯৭ চন্দ্র বছর আগে ৩৮ হিজরির এই দিনে (নয়ই সফর) ইরাকের নাহরাওয়ানে খারিজি সেনারা হযরত আলী (আ.)’র সেনাদের হাতে বিধ্বস্ত ও প্রায় নির্মূল হয়ে যায়।

সিফফিনের অমীমাংসিত যুদ্ধের পর ধর্মান্ধ খারেজিদের উত্থান ঘটেছিল। তাদের সংখ্যা বেড়ে ১২ হাজারে উন্নীত হয়েছিল। পরের বছর যখন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) সিরিয়ায় মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমনের যুদ্ধে যোগ দিতে তাদের আমন্ত্রণ জানান তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। বরং নাহরাওয়ান অঞ্চলে সমবেত হয়ে আলী (আ.)’র বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ বা যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

খারেজিরা নাহরাওয়ানের গভর্নরকে শহীদ করে এবং সেখানে চারজন সাধারণ মহিলাকেও নির্মমভাবে শহীদ করে। এই মহিলাদের একজন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তারা ওই মহিলার পেট চিরে ওই অপরিণত শিশুকেও হত্যা করে! পরিস্থিতি তদন্তের জন্য আলী (আ.)’র পাঠানো একজন প্রতিনিধি সেখানে গেলে তারা ওই প্রতিনিধিকেও হত্যা করে। খারেজিরা আলী (আ.)’র অনুপস্থিতিতে রাজধানী কুফায় হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

এ অবস্থায় আমিরুল মুমিনিন (আ.) সিরিয়ায় অভিযানের জন্য রওনা দেয়া সত্ত্বেও এই নতুন ফেতনা বন্ধের উদ্যোগ নেন। তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসসহ তিনজন বিশিষ্ট সঙ্গীকে পাঠান নাহরাওয়ানে। তারা আলী (আ.)’র পক্ষ থেকে খারেজিদের বলেন তওবা করতে এবং ইসলামে ফিরে আসতে। আমিরুল মুমিনিন নিজেও উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বোঝান যে তারা কোথায় ভুল করছে এবং কিভাবে পরিস্থিতির অপব্যাখ্যা করছে। তিনি নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যায় জড়িত ঘাতকদের সরকারের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান এবং রাসূল (সা.)’র বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)’র মাধ্যমে খারিজিদের দল ত্যাগকারীদেরকে (সাধারণ) ক্ষমা করার প্রস্তাব দেন।

দশ হাজার খারিজি দলত্যাগ করে ইসলামে ফিরে আসেন। কিন্তু প্রায় দুই হাজার খারিজি আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাবের নেতৃত্বে হযরত আলী (আ.)’র প্রতি বিরোধিতা অব্যাহত রাখে। হযরত আলী (আ.) রক্তপাতের সব পথ বন্ধের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু খারেজিরা আকস্মিকভাবে মুসলিম সেনাদের ওপর প্রবল আক্রমণ শুরু করে। ফলে পাল্টা হামলা চালাতে বাধ্য হন মুজাহিদরা। এ অবস্থায় প্রায় সব খারেজি নিহত হয়। কেবল নয় জন খারেজি বসরার দিকে পালিয়ে যায়। হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে ৮ জন মুজাহিদ শাহাদত বরণ করেন।

উল্লেখ্য হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রমাণ হল হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)’র মত কঠোর ন্যায়বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকে পদচ্যুত করলে মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান