ইসলামের মহাগৌরব: ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বির (আ.)

পয়লা রজব ইসলামের ইতিহাসের এক মহাখুশির দিন। কারণ, এই দিনে পবিত্র মদীনায় জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য তথা তাঁর নাতির নাতি হযরত ইমাম বাক্বির (আ.)। বিশ্বনবী (সা.) তাঁর সাহাবি জাবের (রা.)-কে বলেছিলেন যে তুমি আমার ব

ইসলামের মহাগৌরব: ইমাম মোহাম্মাদ বাক্বির (আ.)

hussain, mohammad, imam mahdi, সিফফিন, জামালের যুদ্ধ, নারওয়ানের যুদ্ধ, খলিফা, খেলাফত, ইমামত, আলী, সিদ্দীক, ফারুক, মোর্তযা, বদর, ওহদ, খন্দক, খায়বার, বণী Shia, Sunni, Islam, Quran, Karbala, najaf, kufa, mashad, samera, madina, makka, jannatul baqi, kazmain, ali, Fatima, hasan, সাকিফা, বণী সায়াদা, সাহাবী, হিজবুল্লাহ, ইসরাইল, ড্রোন, বিমান, হাসান নাসরুল্লাহ, লেবানন, ইরান, চীন, মালয়েশিয়া, স্যাটেলাইট, কুয়ালালামপুর, বেইজিং, ভিয়েতনাম, মার্কিন, গোয়েন্দা, ইরাক, সিরিয়া, মিশর, আল কায়েদা, তাকফিরী, ইখওয়ানুল মুসলেমিন, বাংলাদেশ, ভারত, জিহাদ, ফিলিস্তিন, ইহুদি, গাজা, শহীদ, জিহাদ, ক্ষেপণাস্ত্র, দূতাবাস, সৌদি আরব, কুয়েত, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, আমেরিকা, ভিয়েনা, পরমাণু, বাহারাইন, আফগানিস্থান, থাইল্যান্ড, হজরত ফাতিমা, মার্জিয়া, সিদ্দিকা, মোহাদ্দেসা, বাতুল, উম্মে আবিহা, যাহরা, মুবারেকা, যাকিয়া, তাহেরা, রাযিয়া, জিহাদুন নিকাহ, পোপ, পাদ্রি, বাইতুল মোকাদ্দাস, ওহাবী, সালাফি, মুফতি, ড্রোন
ইসলাম বিশ্ব-সভ্যতার পূর্ণতার নিয়ামক। আর ইসলামের পরিপূর্ণতার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলেন বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইত (আ.)। আর মহানবীর আহলে বাইতের ১২ সদস্যের প্রত্যেকেই হলেন হেদায়াতরূপ খোদায়ী নূরের সর্বোচ্চ প্রতিফলন ও মানবীয় পরিপূর্ণতার সর্বোত্তম আদর্শের দিশারী তথা খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের সংরক্ষক, ক্রম-বিকাশক এবং পূর্ণতার মাধ্যম। তাই পয়লা রজব ইসলামের ইতিহাসের এক মহাখুশির দিন। কারণ, এই দিনে পবিত্র মদীনায় জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য তথা তাঁর নাতির নাতি হযরত ইমাম বাক্বির (আ.)। বিশ্বনবী (সা.) তাঁর সাহাবি জাবের (রা.)-কে বলেছিলেন যে তুমি আমার বংশধর বাক্বিরকে দেখতে পাবে এবং তাঁর কাছে আমার সালাম পৌঁছে দিও। জাবের (রা.) সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই মহান ইমামের পবিত্র জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ এবং এই মহান ইমামের প্রতি জানাচ্ছি অশেষ দরুদ ও সালাম।

ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ এ ধর্মের সার্বিক দিকগুলোর সংরক্ষণ, ক্রমবিকাশ এবং ক্রম-অগ্রগতি মহান ইমাম বাক্বির (আ.)'র কাছে চিরঋণী। ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত করার আন্দোলনে তিনি রেখেছেন পথিকৃৎের ভূমিকা। বাক্বির আল উলুম বা জ্ঞান বিদীর্ণকারী ছিল তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপাধি। তাঁর দাদা ছিলেন সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমে খাটি ইসলামকে টিকিয়ে রাখার অনন্য আদর্শের প্রতীক হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) এবং নানা ছিলেন ইসলামকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরো এক পরিপূর্ণ আদর্শের স্রস্টা হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)।

ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরাসহ ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে ধারা ইমাম বাক্বির (আ.)'র মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল তাকে ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ করেছিলেন তাঁরই পুত্র হযরত ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.)। ধর্ম ও বিজ্ঞানসহ সব বিষয়ে বাক্বির (আ.)'র প্রজ্ঞা আর অলৌকিক জ্ঞান এবং সর্বোত্তম নৈতিক চরিত্র ও আত্মিক গুণগুলোর পাশাপাশি সব ধরনের মানবীয় যোগ্যতার ক্ষেত্রেও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। বিশ্বনবী (সা.)'র সুন্নাতের অনুসরণ, সততা ও ইবাদত-সাধনায়ও তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ আদর্শ। ইসলামকে বোঝা ও অনুসরণের জন্য জ্ঞান-চরচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে ইমাম বাক্বির (আ.) বলেছেন, "যে জ্ঞানী তার জ্ঞানের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ করে, তিনি (জ্ঞান ও খোদাভীতির দিক থেকে দুর্বল) ৭০ হাজার সাধক বা দরবেশের চেয়েও উত্তম।" জ্ঞান যে ইসলামের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ইমাম বাক্বির (আ.) তা তুলে ধরেছিলেন।

তিনি ছিলেন একদিকে শ্রেষ্ঠ আবেদ ও পরহিজগার এবং অন্যদিকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও শ্রেষ্ঠ নেতা, আইনবিদ ও সংস্কারক। তিনি যখন নামাজে দাঁড়াতেন তখন তাঁর পবিত্র চেহারা কখনও লাল ও কখনও হলুদ হয়ে উঠত এবং তিনি যেন নামাজে আল্লাহর সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন যেন তিনি সরাসরি আল্লাহকে দেখছেন। হজ করতে এসে কাবা ঘর দেখেই তিনি উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন এবং তাওয়াফ শেষে সিজদার পর যখন মাথা তোলেন তখন দেখা গেল সিজদার স্থানটি ইমামের চোখের পানিতে ভিজে গেছে। পরহিজগারদের আদর্শ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কঠোর পরিশ্রম করে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। আবার জীবিকার পেছেনেই নিজের সব সময় ব্যয় করতেন না, সমাজের কল্যাণে ও সমাজসংস্কারেও মগ্ন থাকতেন। অন্যদিকে কোনো সাহায্য প্রার্থী বা অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি কখনও ইমাম বাক্বির (আ.)'র কাছে সাহায্য চেয়ে খালি হাতে ফিরেনি।

ইমাম বাক্বির (আ.) ও তাঁর পুত্র ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.)'র সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে তাঁদের ছাত্ররা মুসলিম সমাজকে উপহার দিয়েছিলেন প্রায় ছয় হাজার বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ। পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী (সা.)'র সুন্নাহ'র জ্ঞান ব্যাপক মাত্রায় বিকশিত করেন আহলে বাইতের এই দুই মহান সদস্য। ইমাম বাক্বির (আ.) নানা বিষয়ে জ্ঞান-অন্বেষণকারীদের অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর ও সমাধান দিতেন।

এই মহান ইমাম নিজে খুবই সাধাসিধে বা অনাড়ম্বর জীবন যাপন করলেও স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনকে স্বাভাবিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ দিতেন। সামাজিক প্রথা ও চাহিদা অনুপাতে সৌন্দর্য চর্চাকে তিনি বৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রে জরুরি বলেও মনে করতেন।

জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল অন্যান্য ইমামদের মতই ইমাম বাক্বির (আ.)'র চরিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বনি উমাইয়া শাসকদের নানা কুকীর্তির সমালোচনা করতেন। ফলে উমাইয়া শাসক হিশাম তাঁকে সিরিয়ায় নিজ দরবারে তলব করেন। ইমাম বাক্বির আ. সেখানে উপস্থিতি হয়ে বলেন:

তোমার হাতে রয়েছে ক্ষণস্থায়ী রাজত্ব, কিন্তু আমাদের জন্যই হল চিরস্থায়ী নেতৃত্ব ও শাসন এবং খোদাভীরুদের জন্যই রয়েছে শুভ-পরিণাম। সিরিয়ায় ইমাম বাক্বির (আ.)'র উপস্থিতি তাঁর আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বকে সবার কাছেই স্পষ্ট করে দেয়। সেখানেও তিনি খাঁটি ইসলামকে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন। ফলে গণ-জাগরণের ভয়ে ভীত হিশাম ইমামকে আবারও মদীনায় ফেরত পাঠান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিশামের হিংসার হিংস্র আগুন ইমাম বাক্বির (আ.)-কে শহীদ করার মাধ্যমে ইসলামের এই অনন্য মহামানবকে মুসলমানদের কাছ থেকে চিরতরে কেড়ে নেয়। কিন্তু হিশামের হিংসার অনল নেভাতে পারেনি ইমামের রেখে যাওয়া জ্ঞানের আলো এবং আহলে বাইতের প্রতি অফুরন্ত ভালবাসা। আহলে বাইত চিরকালই প্রকৃত মুমিনের হৃদয়ে বিরাজ করছেন ইসলামের প্রকৃত নেতা হিসেবে।

ইমাম বাক্বির (আ.)-'র মাধ্যমে অনেক মো'জেজা বা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। যেমন, তিনি একবার এক অন্ধ ব্যক্তিকে দৃষ্টি শক্তি দান করেন, একবার এক শত্রুকে তার মৃত্যুর পর জীবিত করেন, সঙ্গীদের মনের কথা বলে দেয়া, নিজের শাহাদতের সময়কাল বলে দেয়া ইত্যাদি। এবারে তাঁর একটি মো'জেজার ঘটনা তুলে ধরব:
জাবির বিন ইয়াজিদ জা'ফি বলেছেন, "আমি ইমাম বাক্বির (আ.)'র সঙ্গে হিরাহ নামক অঞ্চলে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে যখন কারবালায় পৌঁছলাম তখন ইমাম বললেন, 'হে জাবির, এখানে আমাদের জন্য ও আমাদের অনুসারীদের জন্য বেহেশতের একটি বাগান রয়েছে এবং আমাদের শত্রুদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের একটি গর্ত।' এরপর তিনি বললেন, 'তোমার কি কিছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে?' আমি বললাম, 'জি আমার নেতা'। ইমাম তাঁর পবিত্র হাত একটি পাথরের মধ্যে ঢুকিয়ে একটি আপেল বের করে আনলেন। ওই আপেলটির যে সুঘ্রাণ ছিল সেরকম সুঘ্রাণ আমি আর কখনও পাইনি। আপেলটি খেলাম এবং এরপর চারদিন পর্যন্ত ক্ষুধা অনুভব করিনি।
ইমাম বাক্বির (আ.)'র একটি বাণী শুনিয়ে শেষ করব আজকের আলোচনা:

তিনি বলেছেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ৫ টি বিষয়কে গুরুত্ব দেবে। এক. প্রথমত যারা তোমার ওপর জুলুম করেছে তুমি তাদের ওপর জুলুম করো না। দুই. কেউ তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তুমি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না। তিন. কেউ তোমার কাছে মিথ্যা কথা বললেও তুমি তাদের সঙ্গে মিথ্যা বোলো না। চার. কেউ তোমার প্রশংসা করলেও আনন্দিত হয়ো না। পাঁচ. কেউ তোমাকে তিরস্কার করলেও বা গালি দিলেও তুমি তাকে মন্দ কিছু বোলো না ও মন্দ কথা শুনে মন খারাপ কোরো না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান