হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে কোথায় দাফন করা হয় ?

মিশরে দাফন সম্পর্কে যে দলিলগুলোর অবতারণা করা হয়েছে তার মধ্যে একটি দলিল হচ্ছে রেওয়ায়াত। নাসাবে উবাইদিলি তার আখবারুল যেয়নাবাত নামক গ্রন্থে ৬টি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে, হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে মিশরে দাফন করা হয়েছিল।

হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে কোথায় দাফন করা হয় ?

হজরত আব্দুল্লাহ , হজরত জয়নাব , শাম, উম্মে কুলসুম, মিশর, মদীনা, কারবালা , Shia, Sunni, Islam, Quran, Karbala, najaf, kufa, mashad, samera, madina, makka, jannatul baqi, kazmain, ali, Fatima, hasan, hussain, mohammad, imam mahdi, সিফফিন, জামালের যুদ্ধ, নারওয়ানের যুদ্ধ, খলিফা, খেলাফত, ইমামত, আলী, সিদ্দীক, ফারুক, মোর্তযা, বদর, ওহদ, খন্দক, খায়বার,
এস, এ, এ
হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর কবর সম্পর্কে তিনটি স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১- মিশর:


মিশরে দাফন সম্পর্কে যে দলিলগুলোর অবতারণা করা হয়েছে তার মধ্যে একটি দলিল হচ্ছে রেওয়ায়াত। নাসাবে উবাইদিলি তার আখবারুল যেয়নাবাত নামক গ্রন্থে ৬টি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে, হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে মিশরে দাফন করা হয়েছিল।
পর্যালোচনা: কিন্তু এই রেওয়ায়েতগুলো সনদ ও বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। মোহাম্মাদ হুসাইন সাবেক্বী তার মারকাদিল আক্বিলাহ যয়নাব (সা.আ.) নামক গ্রন্থে উক্ত হাদীস সমূহকে উল্লেখ করে কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে একটি হচ্ছে অধিকাংশ রেওয়ায়েত যা উবাইদিলি যাদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন তারা হচ্ছেন অজ্ঞাত এবং অনেক গবেষণার পরে রেজাল শাস্ত্র এবং বংশ পরিচিতি মূলক পুস্তক সমূহে তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। এই রেওয়ায়েতের বিষয়বস্তু অসঙ্গতিপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক সমস্যার বাইরে না।
মিশরে তাহলে কোন জয়নাব দাফনস্থ করা হয়েছে?
যদি হজরত আলী (আ.) এর কন্যাকে মিশরে দাফন না করা হয়ে থাকে তাহলে সেই জয়নাব কে যাকে মিশরে দাফন করা হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে যেয়ে আমরা ইতিহাসে অনুসন্দান করলে আমরা দেখতে পাই যে, জয়নাব মিশরে মাটিতে শুয়ে আছে তিনি হচ্ছেন জয়নাব বিনতে ইয়াহিয়া আল মাতুজ বিন হাসানীল আনওয়ার বিন যায়দ বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিব। অনেকেই মনে করেন যে, জয়নাবকে দাফন করা হয়েছে তিনি হচ্ছেন জয়নাব বিনতে আলী ইবনে আবি তালিব। (আয়ানুশ শিয়া, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪২)
কেননা উক্ত ধারণাটি হচ্ছে ভিত্তিহীন। যদিও তার পূর্বপুরুষের সাথে সম্পর্কিত করা হচ্ছে একটা সাধারণ ব্যাপার যেমনভাবে আমাদের ইমামদেরকে রাসুল (সা.) এর সন্তান বলা হয়ে থাকে। সুতরাং যদি জয়নাব বিনতে ইয়হিয়াকে কেউ জয়নাব বিনতে আলী বলে মনে করে তাহলে কোন সমস্যা নেই কেননা হজরত আলী (আ.) ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ।
২- মদীনাতে দাফন:
আল্লামা ফাক্বিদ সাইয়েদ মোহসিন আমীন এর বিশ্বাস যে, হজরত জয়নাব কে মদীনাতে দাফন করা হয়েছে এবং তিনি এ সম্পর্কে দলিল উপস্থাপন করেছেন।
হজরত জয়নাব কারবালা থেকে মদীনাতে ফিরে আসার পরে মদীনা থেকে বাহির হওয়ার ব্যাপারে কোন দলিল পাওয়া যায় না। সুতরাং তিনি মদীনাতেই মৃত্যু বরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। যদিও তার কবরের নিদৃষ্ট স্থান মদীনার কোথাও সনাক্ত করা হয়নি।
উক্ত সন্দেহের অপনোদন: যদিও হজরত জয়নাব এর মদীনাতে মৃত্যুবরণ এবং সেখানেই তাকে দাফন একটি সাধারণ বিষয় হতে পারে কেননা তার ভাই ইমাম হাসান (আ.) সহ বণী হাশিমের অন্যান্য ব্যাক্তিত্বদেরকে মদীনাতে দাফন করা হয়েছিল। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে তাঁর মতো একজনকে মহিয়সী নারীকে যদি সেখানে দাফন করা হতো তাহলে অবশ্যই তার কবরের চিন্হ সেখানে থাকতো। কিন্তু মদীনার ইতিহাসের কোন পুস্তকে এই নামের কোন নারীর মাজার বা কবরের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ওয়াফাউল ওয়াফা নামক গ্রন্থে উম্মুল বানিনকে জান্নাতুল বাক্বিতে দাফনের কথা মাসউদী ইমাম হাসান (আ.) এর জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন যে, ইমাম হাসানকে তার মায়ের পামে দাফন করা হয়েছে এবং এখন জান্নাতুল বাক্বিতে ঐ সমস্ত কবর ভেঙ্গে দেয়া হলেও তাদের কবরের উপরে একটি করে পাথর রেখে দেয়া হয়েছে এবং তাকে লিখা রয়েছে:

«الحمدلله مبید الامم ومحیى الرمم هذا فاطمة بنت رسول‏الله صلى الله علیه و آله سیدة نساء العالمین و الحسن بن على بن ابى‏طالب و على بن الحسین بن على و محمد بن على و جعفر بن محمد رضوان الله علیهم اجمعین.»

(তানবিহাতু ওয়াল আশরাফ, পৃষ্ঠা ২৬০, ছাপ মিশর)
এটা থেকে বোঝা যায় যে, ঐ সমস্ত ব্যাক্তিত্বদের কবর সমূহ চতূর্থ শতাব্দিতে অর্থাৎ মাসউদীর যুগ পর্যন্ত ছিল এবং যদি হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর কবরও সেখানে থাকতো তাহলে অবশ্যই তাঁর নামও কবরের উপরে লিখা থাকতো। কেননা । আব্দুল্লাহ ইবনে জাফরের স্ত্রীর কবরস্থানে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। তাহলে কিভাবে সম্ভব যে হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর কবর সেখোনে থাকবে অথচ তা চিহ্নিত করা হবে না এবং কোন ইতিহাসেও তা উল্লেখ করা হয়নি?
অন্যথায় ইতিহাসের বিষয় ফিক্বহের ন্যায় আমালে ইসতেসহাবের হুকুম জারি করা যাবে না যে আমরা বলতে পারবো হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর মদীনাতে ফিরে আসার বিষয়টি সঠিক আর তার মদীনা থেকে বাহির হওয়ার বিষয়টি সঠিক না। যদিও তাঁর মদীনা থেকে বাহির হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে তাঁকে ঐ শহরে এবং সেখানেই দাফন করা হয়েছে। (মারক্বাদে আক্বলিয়া যেয়নাব, মোহাম্মাদ হাসনাইন সাবেক্বী, পৃষ্ঠা ১০৩)
৩- শাম:


এই মতাধারীরা বলেন যে যখন মদীনাতে দূর্ভিক্ষ আসে তখন আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর সিধান্ত নেয় যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে শামে চলে যাবেন কেননা সেখানে তাদের কিছু জমি ছিল। শামে আসার পরে হজরত জয়নাব (সা.আ.) সেখানে মারা যান।(খায়রাতে হাসসান, মোহাম্মাদ হাসান খান, পৃষ্ঠা ২৯, হাদীয়াতুয যায়েরীন, হাজ সৈয়দ আব্বাস কুম্মী, পৃষ্ঠা ৩৫৩, নাযিয়াতু আহলিল হারামায়ন, সৈয়দ হাসান সাদর, পৃষ্ঠা ৩৯)
গবেষণা:
১- উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে হজরত আব্দুল্লাহ তিনি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে শামে চলে আসেন সেখানে তাদের চাষাবাদের কিছু জমি ছিল। তিনি সেখানে বেড়ানোর জন্য বা জমিগুলো দেখার জন্য আসেন এবং সেখানেই হজরত জয়নাব (সা.আ.) মারা যান কথাটি সম্পূভাবে ভিত্তিহীন।
কেননা ইতিহাসে হজরত আব্দুল্লাহ এর এমন কোন চাষাবাদ জমির কথা উল্লেখ করা হয়নি কেননা নীতিগতভাবে আব্দুল্লাহ ছিলেন একজন দানী ব্যাক্তি এবং কখনও তার কাছে মাল বা সম্পদ বেশি দিন থাকতো না। তাহলে কিভাবে সম্ভব যে ঐ সম্পদ এতদিন তার কাছে ছিল?
২- যদি ধরেও নেই যে, আব্দুল্লাহ কাছে এমন সম্পদ থেকেও থাকে তাহলে এমনও হতে পারে যে, তিনি নিজেই তা দেখাশুনার জন্য শামে গেছিলেন। তিনি ছিলেন ধনি সুতরাং এ কাজের জন্য নিজের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি যুক্তিযুক্ত না।
৩- বিভিন্ন ইতিহাস মোতাবেক সেই যুগে মদীনা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। ইতিহসের বিভিন্ন পুস্তক সমূহে মদীনার বিভিন্ন ঘটনা যেমন: ভুমিকম্প, লু হাওয়া প্রবাহিত হওয়া এবং রাসুল (সা.) এর রওযাতে আগুন লাগার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদি সেখানে দূর্ভিক্ষ অনাহারের কোন ঘটনা ঘটতো তাহলে অবশ্যই তা ইতিহাসের পুস্তক সমূহে তা উল্লেখ করা হতো। কিন্তু এধরণের কোন কথায় সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
আলোচনার পরিসমাপ্তি:
হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর দাফন বা কবর সংক্রান্ত তিনটি মত থেকে আমরা যে বিষয়টি বুঝতে পারি তা হচ্ছে:
মিশরে দাফনের বিষয়টি ঠিক না। কেননা তাতে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, মদীনার বিষয়টির কোন স্পষ্ট দলিল বর্ণিত হয়নি এবং শামে দাফনের বিষয়টির সম্ভাবনা যদিও বেশী কিন্তু তাতেও দুইটি সমস্যা রয়েছে:
এক: কোন কারণে হজরত আব্দুল্লাহ হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে শামে নিয়ে গেছিলেন যদিও হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর শামের প্রতি এক ক্ষোভ বা দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।
দ্বিতীয়: অনেক ঐতিহাসিকদের মতে শামে যাকে দাফন করা হয়েছে তিনি হচ্ছেন হজরত আলী (আ.) এর কন্য হজরত উম্মে কুলসুম।(রেহলাতে ইবনে জাবির, দারে বৈরুত, পৃষ্ঠা ২৫৩, মোজামে বোলদান, ইয়াকুতে হামাওয়ি, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০, সাফার নামে ইবনে বাতুতা, তরজুমা: মোহাম্মাদ আলী মোওয়াহহেদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৯)
দ্বিতীয় সন্দেহের অবসান এভাবে ঘটানো যেতে পারে যে, হজরত জয়নাবকেই উম্মে কুলসুম বলে মনে করা হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে ইবনে জাবীরের ন্যায় যে উম্মে কুলসুম কে জয়নাবে সুগরা বলেছে না জয়নাবে কুবরা বলে উল্লেখ করেছে। শামের সেই কবর থেকে যে পাথরের ফলকটি পাওয়া গেছে তাতে লিখা ছিল:

هذا قبر زینب الصغرى المكناة بام كلثوم ابنت على بن ابوطالب امها فاطمة البتول سیدة نساء العالمین ابنت‏سید المرسلین محمد خاتم النبیین صلى الله علیه و سلم.

যদিওবা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে প্রকৃতভাবে হজরত জয়নাব (সা.আ.) কবর কোথায় আছে। কিন্তু তাদের সাথে সম্পৃক্ত যেসমস্ত স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অবশ্যই তা উক্ত আয়াতের
আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তার নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। (সূরা নূর, আয়াত নং ৩৬)
আওতায় পড়বে, কেননা তাদের ঘর এবং যিয়ারতের স্থান সমূহ যেখানে খোদার নামের যিকর করা হয় এবং যেখান থেকে আধ্যাতিকতা অর্জন করা যায় বা আহলে বাইত (আ.) এবং শহীদদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। তাই আহলে বাইত (আ.) গণ যেখানেই দাফন হোক না কেন বা তাদের নামের সাথে সম্পৃক্ত হোক না কেন সে স্থানটি হচ্ছে পবিত্র এবং সম্মানিত। কেননা হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর কবর যেখানেই থাক না কেন প্রকৃত অর্থে তার কবর প্রত্যেকটি মুমিন পুরুষ ও মহিলার অন্তরে রয়েছে। সুতরাং তাঁকে যেখানেই দাফন করা হোক না কেন যে সমস্ত যিয়ারতের স্থান তাঁর সাথে সম্পৃক্ত তা অবশ্যই একটি সম্মানিত এবং পবিত্র স্থান যেখানে মানুষের দোয়াকে কবুল করা হয়।