সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ৬৮-৭০

সূরা বনী ইসরাইলের ৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন- أَفَأَمِنْتُمْ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمْ جَانِبَ الْبَرِّ أَوْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ثُمَّ لَا تَجِدُوا لَكُمْ وَكِيلًا (68) “তবে কি তোমরা নিশ্চিন্ত রয়েছো যে, তিনি তোমাদের স্থলে কোথাও ভূগর্ভস্থ করবে

সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ৬৮-৭০
 
সূরা বনী ইসরাইলের ৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
أَفَأَمِنْتُمْ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمْ جَانِبَ الْبَرِّ أَوْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ثُمَّ لَا تَجِدُوا لَكُمْ وَكِيلًا (68)
“তবে কি তোমরা নিশ্চিন্ত রয়েছো যে, তিনি তোমাদের স্থলে কোথাও ভূগর্ভস্থ করবেন না, অথবা তোমাদের উপর শিলাবৃষ্টি বর্ষণ করবেন না? (করলে) তখন (কিন্তু) তোমরা নিজেদের বাঁচানোর জন্য কোনও অভিভাবক পাবে না।” (১৭:৬৮)

আগের আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে, আল্লাহ আমাদের জন্য সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা নানাভাবে এ থেকে উপকৃত হতে পারি। আর সমুদ্রযাত্রার সময় যদি কঠিন বিপদের সম্মুখীন হই তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না।
আর এ আয়াতে বলেন: তোমরা মনে কর না যে, শুধুমাত্র সমুদ্রেই বিপদ আসতে পারে। বরং স্থলভাগেও দুর্যোগ দেখা যায়। হযরত মুসা (আ.)’র যুগের বিশ্বাসঘাতক মুরতাদ কারুনের মতো ভূ-ভাগ বিদীর্ণ হয়ে মানুষ ভূগর্ভে ঢুকে যেতে পারে বা প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে কিংবা আকাশ থেকে পাথরকণা ও শিলাবর্ষণ হতে পারে। এ রকম কঠিন পরিস্থিতিতে একমাত্র আল্লাহই মানুষকে মুক্তি দিতে পারেন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
এক. আমরা যেখানেই থাকি না কেন আল্লাহর আয়ত্বের মধ্য থাকতে বাধ্য। আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। তাই কখনই আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা যাবে না।
দুই. যে কোনো বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ বোধ করা থেকেই আল্লাহর আদেশ অমান্য করার অনুভূতি তৈরি হয়। কাজেই নিজেকে কখনও বিপদ-আপদের উর্ধ্বে ভাবা ঠিক হবে না।

সূরা বনী ইসরাইলের ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:
أَمْ أَمِنْتُمْ أَنْ يُعِيدَكُمْ فِيهِ تَارَةً أُخْرَى فَيُرْسِلَ عَلَيْكُمْ قَاصِفًا مِنَ الرِّيحِ فَيُغْرِقَكُمْ بِمَا كَفَرْتُمْ ثُمَّ لَا تَجِدُوا لَكُمْ عَلَيْنَا بِهِ تَبِيعًا (69)
“অথবা তোমরা নিশ্চিন্ত আছো যে, তিনি তোমাদের আবার সমুদ্রে নিয়ে যাবেন না এবং তোমাদের প্রতি প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠাবেন না এবং তোমাদের অবিশ্বাসের জন্য তোমাদের নিমজ্জিত করবেন না? (এসব বিপদের সম্মুখীন হলে) তখন তোমরা নিজেদের জন্য আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী (বা সাহায্যকারী) পাবে না।” (১৭:৬৯)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, সমুদ্রযাত্রা শেষে তোমাদেরকে নিরাপদে ডাঙায় পৌঁছে দেয়ার পর তোমরা তার অবাধ্য হয়ো না এবং কুফরি কর না। কারণ, আল্লাহ তোমাদেরকে আবার সাগরে ফিরিয়ে নিয়ে এমন ঝড়-তুফানের মধ্যে ফেলতে পারেন যে, তোমাদের পালানোর কোনো পথ না থাকে এবং সাগরে ডুবে তোমাদের মৃত্যু হয়।
আল্লাহর ক্রোধ সময় ও স্থান বুঝে আসে না। কুফরি করলে বা আল্লাহর অবাধ্য হলে এই পৃথিবীতেই কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে। একবার আল্লাহর ক্রোধের শিকার হলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে :
এক. মানুষ তার নিজের কাজের পরিণতিতেই অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ তার বান্দাকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, কিন্তু বান্দা নিজের অকৃতজ্ঞতার জন্য আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়।
দুই. যে কোনো মুহূর্তে মানুষ বিপদে পড়তে পারে। তাই ঝড়-তুফান কেটে যাওয়ার পর অহঙ্কারি হয়ে গেলে চলবে না। কারণ কোনো বিপদই চিরতরে শেষ হয়ে যায় না।

সূরা বনী ইসরাইলের ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آَدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا (70)
“আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। তাদের স্থলভাগে ও সমুদ্রে চলাচলের জন্য বাহন দান করেছি। তাদের ভালো ও পবিত্র জীবনোপকরণ দান করেছি এবং আমার সৃষ্টির বেশিরভাগের উপর তাদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেছি।” (১৭:৭০)

এ আয়াতে আল্লাহ্‌ আদম সন্তানকে পৃথিবীতে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন: আমি মানবজাতিকে এমন মর্যাদা দান করেছি যে গোটা প্রকৃতি সে নিয়ন্ত্রণ করছে। মানুষ ছাড়া অন্য সব জীব-জন্তু ও উদ্ভিদকে সে নিজের কাজে ব্যবহার করছে। জল ও স্থল মাড়িয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়েছে এবং নানা রকম বাহন সৃষ্টি করে জল, স্থল ও আকাশপথে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে।
তবে এই আয়াতে মানুষকে যে কেরামত প্রদান করার কথা বলা হয়েছে তা পৃথিবীর সব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে এক বিশেষ ধরনের কেরামত আছে যা আল্লাহর খাঁটি বান্দারা তাদের ইবাদত-বন্দেগী ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে অর্জন করেছেন।

পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে- “তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর সবচেয়ে নিকটতম যে সবচেয়ে বেশি পরহেযগার।” প্রকৃতপক্ষে মানবজাতি শুধুমাত্র পৃথিবীর সৃষ্টিকুলের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ফেরেশতাদের চেয়েও উত্তম। এ কারণেই আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে সিজদা করতে। সেইসঙ্গে আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত করেছেন। অবশ্য যারা এ মানবীয় মর্যাদা রক্ষা করে না, তারা মানুষের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।
কুরআনের ভাষায় তারা চার পা বিশিষ্ট পশুর চেয়েও অধম। কারণ, তারা কথা ও কাজে সঠিক পথ বেছে নিতে ব্যর্থ হয়ে নিজেদের মানবীয় সম্মান হারিয়েছে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. মানবজাতির মর্যাদা নির্ভর করে তার কাজের ওপর। এ মর্যাদা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতে শেখায় ও কুফরি করা থেকে বিরত রাখে।
দুই. পূর্ণতায় পৌঁছার সব উপকরণ আল্লাহ মানুষের মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। সেইসঙ্গে পারিপার্শ্বিকতা ও পরিবেশের মধ্যেও এসব উপকরণ রয়েছে।
তিন. সমুদ্র বা স্থলভাগ- যে কোনো স্থানে সফরের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত। আল্লাহ এটা এজন্য দিয়েছেন যাতে মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা ব্যবহার করতে পারে।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান