সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১৫-১৭

এই আয়াতে পুরস্কার এবং শাস্তি ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনটি নীতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রথম নীতি হিসেবে বলা হচ্ছেঃ তোমার ঈমান আনা কিংবা কুফরি করায় আল্লাহর কিচ্ছু যায় আসে না অর্থাৎ তাতে আল্লাহর কোনো লাভ ক্ষতি নেই। বরং তার লাভ ক্ষতির প্রভাব বা পরিণতি তোমার

সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১৫-১৭
সূরা বনী ইসরাইলের ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا (15)
“যে ব্যক্তিই সৎপথ অবলম্বন করে, তার সৎপথ অবলম্বন তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হয়৷ আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, তার পথভ্রষ্টতার ধ্বংসকারিতা তার ওপরই বর্তায়৷ কোনো গুনাহগার বা গুনাহের বোঝা বহনকারী অন্যের গুনাহের বোঝা বহন করবে না৷আর আমি (হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝাবার জন্য) একজন পয়গম্বর না পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত কাউকে আযাব দেই না৷(১৭:১৫)

এই আয়াতে পুরস্কার এবং শাস্তি ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনটি নীতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রথম নীতি হিসেবে বলা হচ্ছেঃ তোমার ঈমান আনা কিংবা কুফরি করায় আল্লাহর কিচ্ছু যায় আসে না অর্থাৎ তাতে আল্লাহর কোনো লাভ ক্ষতি নেই। বরং তার লাভ ক্ষতির প্রভাব বা পরিণতি তোমার ওপরই পড়বে। যদি আল্লাহর হেদায়াত গ্রহণ কর এবং আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলো তাহলে নিজের স্বার্থেই তা করলে। আর যদি সত্যের পথে না যাও কিংবা বিপথে চলে যাও তাহলেও তার ক্ষতি তোমাকে ঘিরেই।

দ্বিতীয় নীতি হলো, যার যার কাজের কর্মফল সে নিজেই ভোগ করবে। পার্থিব এ জগতে যেমন বিচিত্র পন্থা ও কৌশলে একজন অপরাধীর দোষ অপরজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আপন বোঝা খালি করে ফেলে, আল্লাহ সেরকম একজনের কাজের ফল অপর কারো ঘাড়ে যেমন চাপাবেন না, এমনকি একজন অপরাধীর পরিবর্তে অন্যজনকে শাস্তিও দেবেন না।

তৃতীয় নীতিমালাটি হলো, আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মধারা যার উল্লেখ পবিত্র কুরআনে বহুভাবে এসেছে, তা হলো আল্লাহ যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন পথপ্রদর্শক নবী বা পয়গাম্বর পাঠাচ্ছেন এবং সেই নবী মানুষকে সৎ পথে হেদায়াত না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদেরকে পাপ, অপরাধ, কুফরি কিংবা শেরেকির অপরাধে শাস্তি দেবেন না। এটা আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ তাঁর বান্দাদের ওপর। এ আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
এক. আল্লাহ পাক মানুষকে ইচ্ছা শক্তির অধিকারী করে সৃষ্টি করেছেন যাতে মানুষ তার নিজস্ব জীবনের পথ বেছে নিতে পারে।
দুই. আল্লাহ পাক কোনো বান্দাকেই বা কোনো উম্মাতকেই পথের সন্ধান না দিয়ে কিংবা হুজ্জাত পূর্ণ না করে শাস্তি দেবেন না।
তিন. বুদ্ধি একাই মানুষের সৌভাগ্যের জন্যে যথেষ্ট নয়, নবীদের হেদায়েতেরও প্রয়োজন রয়েছে।

এই সূরারর ১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا (16)
“যখন আমি কোনো জনবসতিকে ধ্বংস করার সংকল্প করি তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদেরকে নির্দেশ দিয়ে থাকি, ফলে তারা সেখানে নাফরমানী করতে থাকে আর তখন আযাবের ফায়সালা সেই জনবসতির ওপর বলবত হয়ে যায় এবং আমি তাকে ধ্বংস করে দেই।” (১৭:১৬)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে বলা হচ্ছে যদি কোনো এলাকার লোকজনকে ধ্বংস করার চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই তার আগে ঐ এলাকার লোকজনকে অবশ্যই ধ্বংস করার আগে আমার বিধি-নিষেধগুলো জানিয়ে দেই। ফলে সেগুলো পালনের ক্ষেত্রে যদি অবাধ্যতা দেখায় তাহলেই সে শাস্তির পাবার যোগ্য হয়ে যায়। আর কোনো একটি সমাজের টাকা-পয়সার অধিকারী লোকগুলো সাধারণত একটু অন্যরকম হয়, তাদেরকে লক্ষ্য করেই এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কেননা আপামর জনসাধারণ সাধারণত তাদের মতো সম্পদশালীদেরকেই অনুসরণ করে, সেজন্যেই তাদের শেরেকি বা ফাসেকি তাদের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকে না বরং ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বত্র।

এ আয়াতে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
এক. মানব সমাজের ফেতনা ফাসাদসহ সকল পাপাচারের শেঁকড় পার্থিব জগতপ্রীতি, সম্পদের লিপ্সা, ভোগ বিলাসপূর্ণ জীবনযাপন ইত্যাদির মূলে প্রোথিত।
দুই. স্বার্থান্বেষী ইন্দ্রিয়পরায়ন শাসকদের শাসনের ফলে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের ধস নামে। আর ঐ সামাজিক অনৈতিকতা আল্লাহর রোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সূরা বনী ইসরাইলের ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِنْ بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا (17
“দেখো, কত মানব গোষ্ঠী নূহের পরে আমার হুকুমে ধ্বংস হয়ে গেছে৷ তোমার রব নিজের বান্দাদের গুনাহ সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন এবং তিনি সবকিছু দেখছেন।” (১৭:১৭)

এ আয়াতে আগের আয়াতেরই ধারাবাহিকতায় বলা হচ্ছেঃ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে হযরত নূহ (আ.) এর পর এই পৃথিবী পুনরায় প্রাণ ফিরে পায় এবং নতুন নতুন জাতি ও কওম পৃথিবীব্যাপী বসতি বিস্তার করে। তাঁর পর কত শত কওম বা গোত্র ধ্বংস হয়ে গেছে এমনকি তাদের কর্মের লেশমাত্র নিদর্শনও অবশিষ্ট নেই। হযরত নূহ (আ.) এর সময়েও ঐশী রোষানল এই পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল। ঐ তুফানে নূহ (আ.) এর কিশতির অধিবাসীগণ ছাড়া আর কেউই বেঁচে ছিল না, সকল মানুষ এবং প্রাণী মারা গিয়েছিল।
সবোর্পরি এ আয়াত সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণ করছে যে, হযরত নূহ (আ.) এর সময়টা ছিল মানবেতিহাসের একটা সন্ধিক্ষণ। মানব জীবনে আগের প্রজন্ম বিলুপ্ত হয়ে নতুন একটি প্রজন্মের সূচনা হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ আর পবিত্র কুরআনের গল্পের বক্তব্য অনুযায়ী আদ, সামুদ, লুত, মাদিয়ান জাতিসহ আরো বহু জাতি নূহ (আ.) এর পরবর্তীকালে ধ্বংস হয়েছে।

এ আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
এক. ঐশী রোষ কিয়ামতের জন্যেই নির্দিষ্ট নয় বরং এই পৃথিবীতেও বহু কওম ধ্বংস হয়ে গেছে।
দুই. ফেলে আসা ইতিহাস হচ্ছে আয়নার মতো। মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যে তাতে রয়েছে শিক্ষণীয় বহু উপাদান। সেই শিক্ষা আমাদের বলে দিচ্ছে আমরা যেন ঐশী রোষের ব্যাপারে উদাসীন না থাকি।
তিন. বান্দাদের কাজকর্মের ব্যাপারে আল্লাহর সার্বিক জ্ঞান ও সচেতনতা মানুষের প্রশিক্ষণের সবোর্ত্তম উপায়।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান