সূরা হাজ্জ; আয়াত ৭২-৭৬

সূরা হাজ্জের ৭২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন- وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِ الَّذِينَ كَفَرُوا الْمُنْكَرَ يَكَادُونَ يَسْطُونَ بِالَّذِينَ يَتْلُونَ عَلَيْهِمْ آَيَاتِنَا قُلْ أَفَأُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِنْ ذَلِ

সূরা হাজ্জ; আয়াত ৭২-৭৬


সূরা হাজ্জের ৭২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِ الَّذِينَ كَفَرُوا الْمُنْكَرَ يَكَادُونَ يَسْطُونَ بِالَّذِينَ يَتْلُونَ عَلَيْهِمْ آَيَاتِنَا قُلْ أَفَأُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِنْ ذَلِكُمُ النَّارُ وَعَدَهَا اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (72)
“যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়,তখন তুমি কাফেরদের চোখে মুখে অসন্তোষের লক্ষণ প্রত্যক্ষ করতে পারবে। যারা তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে,তারা তাদের প্রতি মারমুখি হয়ে ওঠে। বলুন,আমি কি তোমাদেরকে তদপেক্ষা মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? তা হচ্ছে আগুন; আল্লাহ কাফেরদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন। এটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।” (২২:৭২)

আগের আয়াতে আল্লাহ মূর্তিপূজারী মুশরিকদের ভর্তসনা করে বলেন: এগুলো বিবেক ও ওহী বিরোধী কাজ। তারই ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে আল্লাহ বলেন: তারা এত বেশি মুর্খ যে, কুরআন পড়তে বা এর আয়াত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতেও তারা রাজি নয়। যদি কেউ তাদের সামনে কুরআনের আয়াত পাঠ করে তাহলে তারা এতবেশি ক্ষুব্ধ হয় যে, তেলাওয়াতকারীকে মারতে উদ্যত হয়। তেলাওয়াতকারীকে মেরে তারা কুরআনের আলো চিরতরে নিভিয়ে ফেলতে চায়। অথচ বুদ্ধিমান মানুষ অন্যের চিন্তা-ভাবনা জানতে পছন্দ করে। যদি নতুন চিন্তা বা মতাদর্শ যুক্তিসঙ্গত হয় তাহলে তারা তা মেনে নেয়, আর যদি যুক্তিসঙ্গত না হয় তাহলে যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরে তা প্রত্যাখ্যান করে, গায়ের জোরে নয়।

আজের সমাজেও যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী দাবি করে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেন তাদের মধ্যেও কুফরি ও নাফরমানি এতবেশি প্রভাব বিস্তার করেছে যে, তারা কোনো ধরনের যুক্তি মানতেই রাজি নন। সত্যের বাণীকে অস্বীকার করতে গিয়ে তারা মুমিনদের বিরুদ্ধে শক্তির ভাষায় কথা বলে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মুমিনদের থামিয়ে দিতে চায়। তাদের এ ক্ষমতা নশ্বর দুনিয়ায় সীমিত থাকবে এবং কেয়ামতের দিন কঠিন আজাবের সম্মুখীন হবে। দুনিয়াতে কুরআনের আয়াত শোনা যাদের জন্য কষ্টকর কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে আরো বেশি কষ্টকর আজাবের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. সত্যকে মেনে না নেয়ার মনোভাব মানুষকে কাফের বানিয়ে দেয়। আর তখন সে নিজেকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে থাকে।
২. যারা যুক্তি-তর্কে বিশ্বাস করে না তারা যুক্তিসঙ্গত কথা উঠলে মারমুখী হয়ে যায়। আর এটাই তাদের দুর্বলতার প্রমাণ।

সূরা হাজ্জের ৭৩ ও ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَنْ يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِنْ يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَا يَسْتَنْقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ (73) مَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (74)
“হে লোক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হলো,অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন;তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর,তারা সকলে একত্রিত হলেও কখনোই একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়,তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না,প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়,উভয়েই শক্তিহীন।” (২২:৭৩)
“তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা বোঝেনি। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশীল, শক্তিধর।” (২২:৭৪)

এ আয়াতে আল্লাহ মুশরিকদের কাল্পনিক প্রভুর অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। এই কথিত প্রভু কাঠ-পাথরের হোক বা প্রাণী কিংবা মানুষ হোক না কেন, তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। অতি সহজ একটি উপমা ব্যবহার করে আল্লাহ বলেন: যাদেরকে তোমরা তোমাদের কল্যাণের মালিক বলে মনে করো এবং ভাবো যে, তোমাদেরকে সব অনিষ্ট থেকে তারা তোমাদেরকে রক্ষা করবে- তাদের পক্ষে একটি সামান্য মাছি সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। তাদের সব বিজ্ঞানী একত্রিত হলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না।

তারা যে শুধু মাছি সৃষ্টি করতে অক্ষম তাই নয় বরং মাছি যদি তাদের সামনে থেকে কোন কিছু তুলে নিয়ে যায় তাও উদ্ধার করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। কাজেই যারা মাছির সামনেই অক্ষম তারা কিভাবে তোমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে? তোমরা কিভাবে কাঠ, পাথর,পশু ও এ ধরনের অন্যান্য বস্তুকে আল্লাহর সমান মর্যাদা দাও? দুর্বল এসব বস্তু বা প্রাণী কি কখনো মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সমান মর্যাদার অধিকারি হতে পারে?

আয়াতের শেষাংশে এ বিষয়ির প্রতি জোর দিয়ে আল্লাহ বলেন: প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়,উভয়েই শক্তিহীন ও অপারগ।

এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১. মশা বা মাছির মতো আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে কখনোই ছোট মনে করা যাবে না।
২. মহা শত্তিধর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অক্ষম ও দুর্বল প্রভুদের কাছে ধর্ণা দেয়া এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। এর মাধ্যমে আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার ও তার প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

সূরা হাজ্জের ৭৫ ও ৭৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ (75) يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ (76)
“আল্লাহ ফেরেশতা ও মানুষের মধ্য থেকে তার রাসূল মনোনীত করেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা!” (২২:৭৫)
“তিনি জানেন যা তাদের সামনে আছে ও যা পশ্চাতে আছে এবং সবকিছু আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (২২:৭৬)

মক্কার মুশরিকদের বিপরীতে সেখানে একদল আহলে কিতাব ছিল যারা জিবরাইলের মতো ফেরেশতাদের অথবা হযরত ঈসা (আ.)এর মতো নবীদের পূজা করতো। এ আয়াতে আল্লাহ তাদেরকে উদ্দেশ করে বলেন: ফেরেশতা ও নবী উভয়কেই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। প্রার্থনা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। অন্য কেউ প্রার্থনার উপযুক্ত নয় যদি সে পয়গাম্বর বা ফেরেশতাও হোক না কেন।
আল্লাহ শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের কাজেরই হিসাব নেবেন না, সেইসঙ্গে নবী-রাসূলদের কার্যক্রমের ওপরও নজর রাখেন। তাদেরকেও নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহী করতে হবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. কিছু ফেরেশতা আছেন যারা আল্লাহর বার্তা নবী-রাসূলদের কাছে পৌঁছে দেন।
২. পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। কোন ব্যক্তি বা বস্তু আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভাব বলয়ের বাইরে নয়।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান