সূরা হাজ্জ; আয়াত ৩৫-৩৮

সূরা হজ্জের ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন- الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (35) “যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভীত হয় এবং

সূরা হাজ্জ; আয়াত ৩৫-৩৮


সূরা হজ্জের ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (35)
“যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভীত হয় এবং যারা বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে এবং যারা নামায কায়েম করে ও আমি যা দিয়েছি,তা থেকে ব্যয় করে।” (২২:৩৫)

আগের আয়াতে আমরা বলেছি, যারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে তাদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য আল্লাহতায়ালা নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছিলেন। আর এ আয়াতে এ সব মানুষের মনের অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন: তাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করলে ভয়ে কাঁপতে থাকে, কারণ, তারা মনে করেন, হয়তো তারা কোনো ভুল করে ফেলেছেন। দ্বীনের কোনো কাজ হয়ত তারা ঠিকমতো পালন করতে পারেননি।
স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের ঈমানদার ব্যক্তি নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনে কোনও ধরনের গাফলতি করেন না, বরং একনিষ্ঠতার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। সেইসঙ্গে সমাজে জীবন-যাপন করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের সামনে তারা ধৈর্যধারণ করেন। তারা যত কঠিন সমস্যায়ই পড়ুক না কেন নির্ভিকচিত্তে তা মোকাবিলা করেন এবং কখনোই কুফরি বা আল্লাহর অবাধ্যতা করেন না। অবশ্য তারা গরীব-দুঃখীদের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না বরং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে সাহায্য করেন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) মানুষকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেয় এবং তাকে ধৈর্যধারণে সহায়তা করে।
২. সমাজের বঞ্চিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয়। মুমিন ব্যক্তি সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন না। তারা সমাজে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেন।

সূরা হজ্জের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ كَذَلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (36)
“এবং কা’বার জন্যে উৎসর্গিত উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্য মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের যবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যেসব অভাবগ্রস্ত চায় এবং যেসব অভাবগ্রস্ত চায় না- তাদেরকে। এমনভাবে আমি এগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি,যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (২২:৩৬)

এ আয়াতে আবারও হজ্জের নিয়ম-কানুন ও কুরবানি সম্পর্কে বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন: যখন কেউ উট বা পশু কুরবানি করে তখন সে একদিকে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে এবং অন্যদিকে সমাজের অভাবগ্রস্তদের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। অবশ্য সমাজে দু’ধরনের অভাবগ্রস্ত রয়েছেন। এক ধরণের দরিদ্র মানুষ তাদের প্রয়োজনের কথা অন্যদের সামনে তুলে ধরে সাহায্য চান। আর দ্বিতীয় ধরণের দরিদ্র মানুষ লজ্জাবশত তাদের প্রয়োজনের কথা মুখ ফুটে বলেন না। ধনবান মুমিনদের উচিত দান-খয়রাত করার পাশাপাশি কুরবানির গোশত বন্টনের সময় এই দুই ধরনের দরিদ্রের কথাই মনে রাখা।
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে উটের মত বড় প্রাণীও মানুষের পোষ মানে যা আল্লাহর নেয়ামত। এজন্য আমাদের উচিত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি করার সময় যত বেশি খরচ করা যায় তত ভাল। ভেড়া ও গরু কুরবানি করা জায়েজ হলেও পবিত্র কুরআনে মোটাতাজা উট কুরবানি করতে উতসাহিত করা হয়েছে।
২. কুরআনে কুলু অর্থাৎ খাও শব্দের সঙ্গে অন্যান্য পরিভাষাও ব্যবহৃহ হয়েছে, যেমন: খাও কিন্তু অপচয় করো না, নিজে খাও এবং অন্যকেও খাওয়াও, খাও ও সৎ কাজ করো, খাও ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো ইত্যাদি।

সূরা হজ্জের ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ (37)
“এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না,কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন,যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে,তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং (হে নবী আপনি) সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন।” (২২:৩৭)

এ আয়াতে কুরবানির প্রকৃত দর্শন তুলে ধরে আল্লাহ বলেন: যদিও কুরবানির গোশত খেয়ে অভাবীরা তৃপ্তি পেয়ে থাকে, তারপরও প্রকৃত উদ্দেশ্য পেট পুরে খাওয়া বা খাওয়ানো নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাকচিক্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পন করাই হচ্ছে কুরবানির মূল উদ্দেশ্য। কারণ, কুরবানি ত্যাগের নিদর্শন মাত্র। এ ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর পথে শাহাদতবরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।

মূর্তি উপাসকরা আগে কুরবানির রক্ত মূর্তির গায়ে মাখাতো। সে সংস্কৃতির কথা বিবেচনা করে আল্লাহ এ আয়াতে বলেন: কুরবানির গোশত কিংবা রক্ত কোনোটিরই প্রয়োজন আল্লাহর নেই; বরং বান্দার তাকওয়া ও খোদাভীতি বাড়ানোই হচ্ছে কুরবানির বিধানের উদ্দেশ্য।
আয়াতের শেষে কুরবানি করাকে এক ধরনের উত্তম কাজ হিসেবে ঘোষণা করে আল্লাহ রাসূল (স.)কে সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আমাদের ইবাদতের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। আল্লাহ আমাদেরকে ইবাদতের যতগুলো নির্দেশ দিয়েছেন তার সবগুলো তার প্রতি নৈকট্যলাভের উপকরণ হিসেবে এসেছে।
২. হেদায়েত বা সতপথ লাভ করা মহান আল্লাহর একটি বড় নেয়ামত, এজন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।

সূরা হজ্জের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ (38)
“আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ অবলম্বন করেন। আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।” (২২:৩৮)

হজ্বের কিছু আহকাম ও নিয়মাবলী এবং তাকওয়ার কথা বর্ণনা করার পর এ আয়াতে আল্লাহ একটি চিরাচরিত নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলছেন: আল্লাহর পথে অটল থাকলে এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে সাধারণত কাফেররা অসন্তুষ্ট হয়। তারা কথা কিংবা কাজ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ঈমানদাররা আল্লাহর সাহায্য পান এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় ঘটে।
এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়। কাজেই অকৃতজ্ঞতা পরিহার করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. মুমিনরা সংখ্যায় যত কম ও অসহায় হোক না কেন, তারা নিঃসঙ্গ নন। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২. আল্লাহ মুমিনদের পছন্দ করেন, আর কাফেরদেরকে ঘৃণা করেন। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কখনো ভুলে যান না।
৩. কুফর হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করা।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান