ইসলামের প্রথম যুদ্ধ (বদর )

৬২২ খ্রিস্টাব্দে নবী করীম (সা.)-এর মদিনার পথে মক্কা ত্যাগের দিন থেকে একটি নতুন সাল হিজরির সূচনা। তাঁর এই দেশ ত্যাগকেই বলা হয়েছে হিজরত। মুসলমানদের ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। মদিনার মানুষ প্রাণঢালা উষ্ণ সংবর্ধনা দ

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ (বদর )
ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-বদর’ এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, কুদরতী শক্তির এক বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ। বদরের যুদ্ধ সত্য প্রমাণ করেছে কোরআনের সে ঘোষণাকে যাতে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলও বৃহত্তর শক্তির ওপর বিজয়ী হয়েছে আর তা সম্ভব হয়েছে স্রষ্টার কুদরতী শক্তির প্রত্যক্ষ সাহায্যের ফলেই। আল্লাহই বিজয়দানকারী, তাঁর ওপর ভরসা করেই এগিয়ে যেতে হবে মুসলমানদের। এ সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে নবী করীম (সা.)-এর মদিনার পথে মক্কা ত্যাগের দিন থেকে একটি নতুন সাল হিজরির সূচনা। তাঁর এই দেশ ত্যাগকেই বলা হয়েছে হিজরত। মুসলমানদের ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। মদিনার মানুষ প্রাণঢালা উষ্ণ সংবর্ধনা দেওয়ার ভিতর দিয়ে আল্লাহর নবীকে গ্রহণ করলেন। এর পরই মহানবী (সা.) মদিনাতে একটি নগর-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তৎপরতা শুরু করলেন। মক্কী হিজরতকারী, মদিনার আনসার, ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে যারা তখনও ইসলাম কবুল করেনি তারা সহ সকল মদিনাবাসীকে পরামর্শের জন্য ডাকা হলো এবং তাদের সম্মুখে একটি শাসনতন্ত্র পেশ করা হলো। দুনিয়ার ইতিহাসে এটিই হচ্ছে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র। এতে শাসক ও শাসিত উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য লিপিবদ্ধ হয়েছিল। হিজরির দ্বিতীয় বছর রাসূল (সা.) স্বেচ্ছামূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ দুটি দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, সমাজকে সংগঠিত করাই ছিল মদিনাতে মহানবী (সা.)-এর প্রাথমিক কাজগুলোর অন্যতম। মুসলমানরা এমনি করে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন শুরু করলেন, হলেন সতর্ক। মনে রাখতে হবে যে, মুসলমানদেরকে মদিনাতে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাই এর সূচনালগ্ন থেকেই মদিনার মুসলমান ও মক্কার অবিশ্বাসীদের মধ্যে একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। সবারই ধারণা ছিল যে, উভয় সমাজের মধ্যে একটি সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু কখন? এই সময়ে ৫০ হাজার দিনার মূল্যের সম্পদবাহী এক মক্কী কাফেলা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মক্কাভিমুখে ফিরছিল। কুরাইশরা একবার যদি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করতে পারে তবে মহানবী (সা.)-এর বিরোধী ইহুদিদের সহায়তায় তারা মদিনায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক আক্রমণ পরিচালনা করবে এবং মুসলমানদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার প্রয়াস পাবে- এ ধরনের একটি সম্ভাবনা ছিল। ইতিমধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেল যা বিরাজমান উত্তপ্ত অবস্থাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলল। এতে মুসলমানদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে দাঁড়াল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা লক্ষ্য করে নবী করীম (সা.) তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ এবং সা’দ ইবনে জায়েদকে আল-হাওরাতে পাঠালেন পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের জন্য। আবু সুফিয়ানের কাফেলা যখন নিকটবর্তী তখন এ দুজন সাহাবী দ্রুত মদিনায় ফিরে এলেন। সুচতুর আবু সুফিয়ান কাফেলাকে পাশ্চাতে রেখে একাকী ‘বদর’ এলাকায় উপস্থিত হলো। সে বুঝতে পারল যে, সেখানে মদিনাবাসীদের আগমন ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে মক্কায় সাহায্য চেয়ে একজন লোককে পাঠিয়ে দিল। কাফেলাটি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেলে কুরাইশদের সামরিক শক্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে। কাজেই সেটাকে আক্রমণ করাই মুসলমানদের জন্য স্বাভাবিক ছিল এবং তা ছিল সহজসাধ্যও। তাছাড়া কাফেলা দখল করার পদক্ষেপ কুরাইশদেরকে অসময়োচিত একটি যুদ্ধের মধ্যেই ঠেলে দিত। কিন্তু মুসলমানরা তা করেনি। মক্কায় যখন এ খবর পৌঁছল, তথাকার প্রভাবশালী নেতা আবু জাহল সবাইকে কা’বা ঘরে সমবেত হতে নির্দেশ দিল এবং যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হতেও বলল। যখন কুরাইশ বাহিনী মক্কা থেকে রওয়ানা হলো তখন তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। এর মধ্যে ৭শ উষ্ট্রারোহী, অন্যরা ছিল অশ্বারোহী। তারা তৎকালীন প্রচলিত উৎকৃষ্টতম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। ইতিমধ্যে আবু সুফিয়ান মুসলমানদের কবল থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য ভিন্ন পথে মক্কা পৌঁছল। এ সংকট শেষ হতে পারত যদি ঘটনার নতুন মোড় পরিবর্তনের সংবাদ শুনেও আবু জাহল ফিরে যেতে অস্বীকার না করত; বরং উলটো সে চাইল শক্তি প্রদর্শন করে মুসলমানদের মানসিক দিক থেকে দুর্বল করে দিতে। মদিনা থেকে ছয় মঞ্জিল দূরে বদর উপত্যকার এক প্রান্তে নিজস্ব সেনাছাউনি স্থাপন করার পূর্ব পর্যন্ত সে অগ্রযাত্রা বন্ধ করল না। দুশমন বাহিনীর অবস্থা হতে মহানবীর নেতৃত্বাধীন মুসলমানদের অবস্থা ছিল বিপরীত। যুদ্ধের শুরুতে তাঁদের সংখ্যা ৩০০-এর অধিক ছিল না এবং তাঁরা না ছিলেন সুসজ্জিত, না ছিল তাঁদের উল্লেখযোগ্য কোনো অস্ত্রশস্ত্র। তাঁদের অল্প কয়েকজনেরই মাত্র বর্শা ছিল এবং অন্যদের ছিল মাত্র একটি করে তলোয়ার। তাঁদের ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট। সেগুলোর প্রতিটিতে তিনজন সৈনিককে বহন করতে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় ছিল দুশমনদের সঙ্গে তাঁদের সৈন্যসংখ্যার অনুপাত। একজন মুসলমানের বিপরীতে দুশমনের সৈন্য ছিল তিন জন। মুসলমানদের এ ক্ষুদ্র দলটি তখন কুরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না, তেমন কোনো অভিপ্রায়ও তাঁদের ছিল না। আবু সুফিয়ানের কাফেলার কথাই ছিল সবার মন জুড়ে। নবী করীম (সা.) ছাড়া কেউ ভাবতেও পারেননি যে, এমনি অবিশ্বাস্যভাবে তাঁদেরকে যুদ্ধের ময়দানে কুরাইশদের এক বিরাট অস্ত্র সজ্জিত বাহিনীর মোকাবেলা করতে হবে। ধাফিবান উপত্যকায় আবু জাহলের বাহিনীর উপস্থিতির সংবাদ তাঁদের কাছে ছিল এক চরম বিস্ময়। নতুন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.) সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শের জন্য তাঁর আগের স্থানে ফিরে গেলেন। প্রথমে সাহাবীদের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার ঘোষণা করলেন। কিয়ৎকালের নীরবতা ও ইতস্তত ভাব কাটার পর যুদ্ধ করার ব্যাপারে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। মুহাম্মাদ (সা.) নির্দেশ জারি করলেন : ‘এগিয়ে যাও, আল্লাহ দুটি দলের একটির ব্যাপারে আমার নিকট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ (আবু সুফিয়ানের কাফেলা অথবা আবু জাহলের বাহিনীর ওপর বিজয়)। অবশ্য একদিন পর মুসলমানরা বুঝতে পারলেন যে, কাফেলা তাঁদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান শুক্রবার উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। (সম্ভবত ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি) মুসলমানদেরকে যুদ্ধের ময়দানে সারিবদ্ধ করে প্রস্তুত রেখে মহানবী (সা.) আকুল চিত্তে কা’বার দিকে মস্তক ফিরালেন। তিনি তাঁর নামায নিম্নোক্ত মোনাজাত দ্বারা শেষ করলেন : ‘হে আল্লাহ! কুরাইশরা তাদের সহায়তাকারীদের নিয়ে তোমার নবীকে মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য এসেছে। হে প্রভু! ইতিপূর্বে যে প্রতিশ্রুতি তুমি দিয়েছ সে জন্য তোমার সাহায্য আমাদের প্রয়োজন। হে পরওয়ারদিগার! সংখ্যা স্বল্পতার কারণে যদি আমরা ধ্বংস হই তবে তোমার ইবাদত করার কেউই থাকবে না।’ যুদ্ধের শুরুতে শায়বা, রাবিয়ার পুত্র উতবা এবং উতবার পুত্র ওয়ালিদ মুসলমানদের প্রতি একক যুদ্ধের শক্তি পরীক্ষার আহ্বান জানায়। নবী করীম (সা.)-এর নির্দেশে নবীর পিতৃব্য হযরত হামযা, হারিশের পুত্র উবাইদা, আবু তালিবের পুত্র আলী (আ.) যথাক্রমে উক্ত তিনজনের সম্মুখীন হলেন। হামযা এবং আলী শীঘ্রই তাঁদের দুশমনদের হত্যা করলেন, কিন্তু উবাইদা উতবার দ্বারা আহত হলেন। তবে পর মুহূর্তেই হযরত আলী (আ.)-এর তরবারির আঘাতে উতবাও নিহত হলো। এ মল্লযুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের পর পরই এক প্রতিশোধমূলক যুদ্ধের সূচনা হলো। মুসলমানরা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন। শেষাবধি কাফেররা ১৭ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি রেখে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় ময়দান ত্যাগ করে। যারা তলোয়ারের আঘাতে নিহত হয়েছিল তাদের মধ্যে এগারো জন ছিল মক্কার গোত্রপতি যারা মক্কা ত্যাগের অল্প কয়েকদিন আগে মহানবীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। তাদের মৃত্যু কুরাইশ নেতৃত্বের প্রতি মারাত্মক আঘাত হানে। মুসলমানদের পক্ষে ১৪ জন শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের ইতিহাসের এই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা ছিল অনেকটা যন্ত্রের মতো। এটি ছিল অলৌকিক বিজয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে : ‘তোমরা (মুসলমানরা) তাদের হত্যা করনি; বরং আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন।’ (সূরা আনফাল : ১৭) রাসূল (সা.) শুধু মুসলমানদের প্রতিই নয়; বরং সবার প্রতি ছিলেন রহমদিল এবং ক্ষমার মনোভাবসম্পন্ন। বদরের যুদ্ধ বন্দিদের সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা এই সত্যকেই যথার্থভাবে প্রমাণ করে। কিছুসংখ্যক মুসলমানকে অভুক্ত রেখেও বন্দিদের যথারীতি আহার সরবরাহ করা হয়েছে। মানবজাতির ইতিহাসে এর নজির নেই বললেই চলে। বন্দিদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয়েছিল এভাবে : বন্দিদের মধ্যে যারা লেখাপড়া জানে তারা দশজন করে মুসলিম বালককে শিক্ষা দিবে। 

সূত্রঃ নিউজলেটার