সূরা মারিয়াম; আয়াত ৬৬-৭০

কিয়ামতে অবিশ্বাসী বহু মানুষ কোনো রকম দলিল প্রমাণ ছাড়াই কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে। তারা মনে করে কিয়ামত অনুষ্ঠানের বিষয়টি অসম্ভব একটা ব্যাপার, এটা হতে পারে না। তারা আরো বলেঃ এটা কী করে সম্ভব যে মানুষ মরে যাবার পর মাটিতে পরিণত হয়ে যায়, তারপরও সেই মান

সূরা মারিয়াম; আয়াত ৬৬-৭০
সূরা মারিয়ামের ৬৬ ও ৬৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَيَقُولُ الْإِنْسَانُ أَئِذَا مَا مِتُّ لَسَوْفَ أُخْرَجُ حَيًّا (66) أَوَلَا يَذْكُرُ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ يَكُ شَيْئًا (67)
“মানুষ বলে,সত্যিই কি যখন আমি মরে যাব তখন আবার আমাকে জীবিত করে (কবর থেকে) বের করে আনা হবে?” (১৯:৬৬)
“মানুষের কি স্মরণ হয় না,আমিই এর আগে তাকে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না।” (১৯:৬৭)
 কিয়ামতে অবিশ্বাসী বহু মানুষ কোনো রকম দলিল প্রমাণ ছাড়াই কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে। তারা মনে করে কিয়ামত অনুষ্ঠানের বিষয়টি অসম্ভব একটা ব্যাপার, এটা হতে পারে না। তারা আরো বলেঃ এটা কী করে সম্ভব যে মানুষ মরে যাবার পর মাটিতে পরিণত হয়ে যায়, তারপরও সেই মানুষ কী করে আবারো জীবিত হয়ে মাটি থেকে মাথা বের করে বেরিয়ে আসবে? এ বিষয়ে আল্লাহর জবাব হচ্ছেঃ তোমরা কীভাবে তোমাদের অতীত ভুলে গেলে? তোমার তো কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেই শূন্য থেকে আল্লাহ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তাহলে তিনি কেন তোমাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে পারবেন না, যিনি তোমার মতো একজনকে একবার সৃষ্টি করলেন? আসলে যারা এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে তারা আল্লাহর অসীম শক্তি এবং ক্ষমতার বিষংটি বিশ্বাসই করে না। তারা আল্লাহর ক্ষমতা, আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে মানুষের সীমিত ক্ষমতার সাথে তুলনা করে। সে জন্যেই তারা মানুষকে পুনরায় জীবিত করে তোলার বিষয়টিকে অসম্ভব বলে মনে করে।
এ দুই আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলো :
১. মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করাটা তাকে প্রথমবার সৃষ্টি করার চেয়ে সহজতর। যদিও কিয়ামতে অস্বীকারকারীদের দৃষ্টিতে পুনরায় মানুষকে জীবিত করাটা একটা অসম্ভব ব্যাপার।
২. কিয়ামত বা আখেরাতে পুনর্জীবন হবে শারীরিক। কিয়ামতকে যারা অস্বীকার করে তাদের বেশিরভাগই মানুষের এই দৈহিক পুনর্জীবনের ব্যাপারেই সন্দেহ করে। যদি পুনর্জীবনের বিষয়টি কেবল আত্মিক হতো তাহলে এই সন্দেহের মাত্রা হয়তো কমতো।
সূরা মারিয়ামের ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَوَرَبِّكَ لَنَحْشُرَنَّهُمْ وَالشَّيَاطِينَ ثُمَّ لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا (68)
“তোমার রবের কসম আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে এবং তাদের সাথে শয়তানদেরকেও ঘেরাও করে আনব,তারপর তাদেরকে এনে জাহান্নামের চারদিকে নতজানু করে ফেলে দেব।” (১৯:৬৮)
এটা স্বাভাবিক যে, যারা কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে তারা আল্লাহকেও অস্বীকার করে। কেননা, আল্লাহকে যারা বিশ্বাস করে তারা কিয়ামত দিবসকে বিশ্বাস করবে না-এটা হতে পারে না। সুতরাং পরকালে অবিশ্বাসী ব্যক্তিরা ধর্মহীন বা বে-দ্বীন। তারা আল্লাহর দেখানো সরল পথ থেকে বিপথে চলে গিয়ে ধ্বংস ও গোমরাহিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। তাদের এই কুফরি আর কিয়ামত অস্বীকারের পাপ তাদেরকে দোযখে নিয়ে পৌঁছাবে। তবে হ্যাঁ, যদি তারা অজ্ঞতাবশত কিংবা অসচেতনতাবশত হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ ক্ষমা করতেও পারেন। এ আয়াতে বলা হয়েছে পরকালে জ্বীন শয়তান এবং মানুষ শয়তানদের সাথে কাফেরদের হাশর হবে। তাদের এই সহাবস্থানের কারণ হল অভিন্ন চিন্তা এবং সে অনুযায়ী দুনিয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা করা।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হলো :
১. কিয়ামত সম্পর্কে এবং কিয়ামত পরিস্থিতি সম্পর্কে আল্লাহ যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সে বিয়টিকে আন্তরিতার সাথে গ্রহণ করতে হবে এবং এরকম একটি দিনে আল্লাহর মহা আদালতে উপস্থিত হবার জন্যে প্রস্তুতি নিতে হবে।
২. পৃথিবীতে যারা অহংকারের কারণে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে তুলে ধরার জন্যে দ্বীনের সত্যতা বাস্তবতা নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করত, তারা কিয়ামতে দোযখ দেখে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলবে এবং চরম ভোগান্তিতে তারা নতজানু হয়ে পড়বে।
সূরা মারিয়ামের ৬৯ এবং ৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
ثُمَّ لَنَنْزِعَنَّ مِنْ كُلِّ شِيعَةٍ أَيُّهُمْ أَشَدُّ عَلَى الرَّحْمَنِ عِتِيًّا (69) ثُمَّ لَنَحْنُ أَعْلَمُ بِالَّذِينَ هُمْ أَوْلَى بِهَا صِلِيًّا (70)
“তারপর প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে যারা করুণাময় আল্লাহর বেশী অবাধ্য ও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল তাদেরকে আলাদাভাবে বের করে আনব।” (১৯:৬৯)
“আমি জানি তাদের মধ্য থেকে কারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার বেশী যোগ্য।” (১৯:৭০)
কিয়ামতের আদালতে কাফেরদের হাজির হবার ব্যাপারে আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এ দুই আয়াতে বলা হয়েছেঃ দোযখবাসীদের সবাই যে একই কাতারের বা পর্যায়ভুক্ত হবে তা নয়, সুবিচারের নিদর্শনস্বরূপ শাস্তির পরিমাণটা নির্ভর করবে কুফরির পরিমাণের ওপর। তাই গুনাহগার যারা কিয়ামতে তাদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি হয়ে যাবে এবং শ্রেণীবিন্যস্ত হবে। যারা বেশি বেশি সীমালঙ্ঘন করেছে তাদের শাস্তি হবে সর্বোচ্চ। এভাবে হয়তো বলা যেতে পারে যে, আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণকারীরা তিনটি দলভুক্ত। একটা দলের গুনাহগাররা ব্যক্তিগতভাবে গুনাহ করে। আরেক দলের গুনাহগাররা অপরকে গুনাহ করতে উদ্বুদ্ধ করে, প্ররোচিত করে এবং গুনাহ করার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাদের নাগালে এনে দেয়। আর তৃতীয় দলটি হল তাদের যারা অপরকে গুনাহ করতে দেখে খুশি হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই তিনটি দলের শাস্তি একরকম হবে না, আলাদা আলাদা শাস্তি হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে-
১. আল্লাহ হলেন রহমত এবং ভালোবাসার অবারিত প্রবাহ। কিন্তু মানুষ তাঁর রহমতে আকৃষ্ট হবার পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে উদ্ধত হয়ে ওঠে। ফলে আল্লাহর গযব বা অভিশাপের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
২. জাহান্নামের প্রকারভেদ রয়েছে। গুনাহের মাত্রা এবং ধরন অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণ বা মাত্রাও হবে ভিন্ন ভিন্ন। আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার সাহায্যে সহজেই নির্ধারণ করে দেবেন কে কোন্‌ পর্যায়ের শাস্তি পাবে।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান