সূরা মারিয়াম; আয়াত ৩৫-৪০

সূরা মারিয়াম; আয়াত ৩৫-৪০

সূরা মারিয়াম; আয়াত ৩৫-৪০


সূরা মারিয়ামের ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
مَا كَانَ لِلَّهِ أَنْ يَتَّخِذَ مِنْ وَلَدٍ سُبْحَانَهُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (35)
“আল্লাহ্‌র (মর্যাদার) সঙ্গে (এটা) সঙ্গতিপূর্ণ নয় যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন। তিনি পবিত্র সত্তা ! তিনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন তখন শুধু বলেন, ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়।” (১৯:৩৫)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত ঈসা (আ.) দোলনায় থাকা অবস্থায় তার মা মারিয়াম (সা.)’ র বিরুদ্ধে অপবাদের জবাব দেয়ার পর নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে ঘোষণা করেন। ঈসা (আ.) দোলনায় থাকা অবস্থায় জানিয়ে দেন, তিনি যেমন জন্মগ্রহণ করেছেন তেমনি মৃত্যুবরণ করবেন। এ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে গণ্য করছে এবং মানব সত্তার চেয়েও উপরে স্থান দিচ্ছে, তারা ভুল করছে। আল্লাহ পবিত্র সত্তা, তার কোনো সন্তান নেই। বাবা না থাকার পরও মারিয়াম (সা.)’র গর্ভে ঈসা (আ.)-র জন্মের অর্থ এই নয় যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। কারণ আল্লাহ চাইলে বাবা-মা ছাড়াও সন্তানের জন্ম হতে পারে। যেমনিভাবে হযরত আদম (আ.)’র জন্ম হয়েছিল। এ অবস্থায় কেউ কি বলবে, হযরত আদম (আ.) হচ্ছেন আল্লাহর পুত্র? না কেউ বলে না। সবাই জানে আদম (আ.) হচ্ছেন আল্লাহর বান্দা। ঈসা (আ.)-ই ঠিক তেমনি আল্লাহর বান্দা।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশক্তিমান। আল্লাহ নির্দেশে সব কিছুই সম্ভব। আল্লাহ চাইলে সব কিছু করতে পারেন।
২.যারা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে,তাদের ভুল সংশোধনের জন্য সবার চেষ্টা চালাতে হবে। সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে হবে।

সূরা মারিয়ামের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (36)
“আর আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদেরও রব। কাজেই তোমরা তার বন্দেগি কর। এটিই সঠিক পথ।” (১৯:৩৬)

ঈসা (আ.) জনগণের উদ্দেশে বলেছেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং আমার ও আপনাদের পালনকর্তা একই। কাজেই আপনারাও আমার মতো আল্লাহর এবাদত করুন এবং অন্য কাউকে তার শরিক করবেন না। এমনটি করার অর্থ হল, আপনারা সরল পথে নেই।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে, তারা শির্ক করছে। এর অর্থ হল, আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুতি।
২. ইবাদত-বন্দেগি কেবলি বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার জন্য প্রযোজ্য। পৃথিবীর আর কোনো কিছুরই পুজা করা যাবে না।

সূরা মারিয়ামের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ مِنْ بَيْنِهِمِْ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ مَشْهَدِ يَوْمٍ عَظِيمٍ (37) أَسْمِعْ بِهِمْ وَأَبْصِرْ يَوْمَ يَأْتُونَنَا لَكِنِ الظَّالِمُونَ الْيَوْمَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (38)
“কিন্তু বিভিন্ন দল নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল। সুতরাং অনাগত গুরুত্বপূর্ণ শেষ বিচার দিবসে কাফিরদের জন্য দুর্ভোগ।” (১৯:৩৭)
“যেদিন তারা আমার নিকট উপস্থিত হবে, সেদিন তারা কত সহজভাবে দেখতে ও শুনতে পারবে। কিন্তু অন্যায়কারীরা আজকে সুস্পষ্ট ভুলের মাঝে রয়েছে।” (১৯:৩৮)

এ দুই আয়াতে হযরত ঈসা (আ.)-এর ব্যাপারে খ্রিস্টানদের মধ্যে বিভিন্ন মতানৈক্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ঈসা (আ.) সম্পর্কে খ্রিস্টানদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। ঈসা (আ.) সম্পর্কে একেক জন একেক কথা বলতে থাকে, যা করা তাদের উচিত হয়নি। তবে সবাই কিয়ামতে তাদের ভ্রান্ত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গীর কথা স্বীকার করবে। কিন্তু পৃথিবীতে বিভ্রান্তির মধ্যে থেকে বিচার দিবসে ভুলের বিষয়ে স্বীকারোক্তি করে কোনো লাভ নেই। সেদিন তারা সবই বুঝবে, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. ঐশী ধর্মের অনুসারীদের জন্য যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর, তাহল- সম্প্রদায়প্রীতি ও ধর্মীয় মতবিরোধ। এটা নবী-রাসূলদের শিক্ষার বিরুদ্ধাচরন।
২. বিচার দিবসে আল্লাহর আদালতে হাজির হওয়ার আগেই সত পথ পাওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে,যাতে আমরা বিভ্রান্ত না হয়ে যাই।

সূরা মারিয়ামের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ (39) إِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا وَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ (40)
“অত্যন্ত ক্লেশকর দিবস সম্পর্কে তাদের সর্তক কর, যেদিন সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এখন তারা অমনোযোগী এবং ঈমান আনছে না।” (১৯:৩৯)
“নিশ্চয়ই পৃথিবী এবং এর উপরে সকল কিছুর মালিক আমি। তারা সকলেই আমারই নিকট ফিরে আসবে।” (১৯:৪০)

এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, অবিশ্বাসীদেরকে সেই দিনের বিষয়ে সতর্ক করুন, যেদিনটি হবে তাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের। কারণ সেই দিন চূড়ান্ত ফয়সালা হবে এবং আল্লাহ চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করবেন। কাজেই এখনই অবিশ্বাসীদেরকে ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে ঈমান আনতে হবে, তা না হলে তারা মুক্তি পাবে না। এটা নিশ্চিত যে, এ পৃথিবীর সব কিছুই ধ্বংস ঘটবে, শুধু থাকবেন আল্লাহ।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. এ পৃথিবীতে উদাসীনতার অর্থ হল, কিয়ামতে দুঃখ-দুর্দশা ।
২. বিশ্বের ধন-সম্পদ, চাকুরি ও সন্তান-সন্ততি সবই ধ্বংসশীল। কাজেই কোনো বিষয়ে উদাসীন ও অহঙ্কারী হওয়া চলবে না।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান