সূরা মারিয়াম; আয়াত ১-৫

সূরা মারিয়াম পবিত্র কুরআনের ঊনিশতম সূরা। এটি সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরাটিতে বেশ কয়েকজন নবীর প্রসঙ্গ এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হযরত যাকারিয়্যা, হযরত মারিয়াম, হযরত ইসা, হযরত ইয়াহিয়া, হযরত ইব্রাহিম, হযরত ইসমায়িল এবং ইদ্রিস (আ.)। মজার ব্যাপ

সূরা মারিয়াম; আয়াত ১-৫
সূরা মারিয়াম পবিত্র কুরআনের ঊনিশতম সূরা। এটি সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরাটিতে বেশ কয়েকজন নবীর প্রসঙ্গ এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হযরত যাকারিয়্যা, হযরত মারিয়াম, হযরত ইসা, হযরত ইয়াহিয়া, হযরত ইব্রাহিম, হযরত ইসমায়িল এবং ইদ্রিস (আ.)। মজার ব্যাপার হল- পবিত্র কুরআনে একমাত্র নারী হযরত মারিয়ামেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল উল্লেখ করা বললে ঠিক হবে না বরং মারিয়াম নামে একটি পরিপূর্ণ সূরারই নামকরণ করা হয়েছে।

এই সূরার এক থেকে তিন নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
كهيعص (1) ذِكْرُ رَحْمَةِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا (2) إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا (3)
“কাফ- হা-ইয়া-আইন-সাদ।” (১৯:১)
“এটি তোমার রবের অনুগ্রহের বিবরণ,যা তিনি তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি করেছিলেন।” (১৯:২)
যখন সে চুপে চুপে রবকে ডাকল।” (১৯:৩)

পবিত্র কুরআনের আরো ২৮টি সূরার মতো এই সূরাটিও ‘হরূফে মুকাত্তায়া’ দিয়ে শুরু হয়েছে। কুরআনের প্রায় এক চতুর্থাংশ সূরাতেই ‘হরূফে মুকাত্তায়া’ এসেছে। এগুলোর গূঢ় রহস্য আবিষ্কার করা এখন পর্যন্ত মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে আশা করা যায় সর্বশেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদি (আ.) এর সময় এসব জটিল বর্ণমালার রহস্য উন্মোচিত হবে। হযরত যাকারিয়া (আ.) হলেন হযরত মুসা (আ.) এর ভাই হযরত হারুন (আ.) এর সন্তান। যাকারিয়া (আ.) নিজেও বনী ইসরায়িলের একজন নবী ছিলেন। তাঁর নামটি পবিত্র কুরআনে সাতবার এসেছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বেশ ক’জন নবী এবং বহু গোত্রের ইতিহাস বা কাহিনী বর্ণনা করেছেন। সৎ এবং অসৎদের সামনে আল্লাহর দয়া এবং অনুগ্রহ আর অসন্তোষ বা রাগের স্বরূপ তুলে ধরতেই এইসব বর্ণনার অবতারণা করেছেন তিনি। এরফলে আমরা যেমন শিক্ষা পাব তেমনি অনাদিকাল ধরে এই শিক্ষা অব্যাহত থাকবে।

এ আয়াতে হযরত যাকারিয়া (আ.) এর ওপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের বিষয়টিকে স্মরণ করা হয়েছে। যাকারিয়া (আ.) জনগণের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা করেছিলেন। সম্ভবত জনগণ থেকে দূরে গিয়ে এই দোয়া করার কারণ হল যাকারিয়া (আ.) ছিলেন বৃদ্ধ এবং পাকা চুলের অধিকারী। এই বয়সে তিনি যদি সন্তান কামনা করেন তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে পারে-এই আশঙ্কা থেকেই তিনি জনগণের কাছ থেকে দূরে গিয়ে দোয়া করেছিলেন। অবশ্য বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে দোয়া করার সবোর্ত্তম উপায়টি হল নীরবে, চুপিচুপি, হৈ হুল্লুড় করে সবাইকে জানান দিয়ে নয়।

এ আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
১. খোদার অলি আওলিয়াদের স্মরণ করা বা তাঁদের নাম উল্লেখ করার একটা মূল্য আছে। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে এই শিক্ষাটি আমাদের দিয়েছেন।
২. জীবনে দোয়ার ভূমিকার ব্যাপারে উদাসীন থাকা ঠিক নয় কেননা দোয়া হচ্ছে আল্লাহর রহমত এবং অনুগ্রহ লাভের উপায়।

সূরা মারিয়ামের ৪ এবং ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا (4) وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا (5)
“সে বলল, হে আমার রব! আমার হাড়গুলো পর্যন্ত নরম হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে; হে পরোয়ারদিগার! আমি কখনো তোমার কাছে দোয়া চেয়ে ব্যর্থ হইনি৷” (১৯:৪)
“আমি আমার পর নিজের স্বভাব-স্বগোত্রীয়দের অসদাচরণের আশঙ্কা করি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা৷ (তথাপি) তুমি নিজের বিশেষ অনুগ্রহ বলে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান কর।” (১৯:৫)

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে হযরত যাকারিয়া (আ.) বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন কিন্তু কোনো সন্তানাদি হচ্ছিল না তাঁর। এ কারণে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে তাঁর উদ্বেগের কারণ ছিল এই যে, তাঁরই কওমের অযোগ্য বহু লোক নিজেদেরকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্যে উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিল। সেজন্যেই যাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় কামনা করেছিলেন তিনি যেন তাঁকে একটি নেককার সন্তান দান করেন। ঐ সন্তান যেন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁরই কাজগুলো বা দায়িত্বগুলো পালন করে যায়। কিন্তু এই দোয়া বাহ্যিকভাবে কবুলযোগ্য ছিল না কেননা শারীরিকভাবে হযরত যাকারিয়া (আ.) এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই একেবারে বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অন্তত সন্তানের বাবা-মা হবার মতো বয়স তাঁদের ছিল না। কিন্তু আল্লাহর হাত তো আর বাঁধা নেই। এই বিশ্বের সৃষ্টিকূলের সকল নিয়ম শৃঙ্ক্ষলা তাঁরই বেঁধে দেওয়া। যদি কখনো কোথাও সেই শৃঙ্ক্ষলায় কোনোরকম পরিমার্জনের প্রয়োজন পড়ে সেটা তাঁর জন্যে কোনো ঘটনাই নয়। যেমনিভাবে ইব্রাহিম (আ.) কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার পরও আগুন জ্বলেছে ঠিকই কিন্তু আগুনের যেই বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ পোড়ানো সেই বৈশিষ্ট্যটা কাজ করে নি। আগুন ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং ইব্রাহিম (আ.) এর কোনো সমস্যাই হল না।

মূলত একজন মুমিন ব্যক্তি পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নের বৈশিষ্ট্যকে অবশ্যই স্বীকার করেন এবং সে অনুযায়ী সেগুলোকে নিয়ে চর্চা করেন, কাজে লাগান। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আল্লাহর শক্তিকে প্রাকৃতিক সকল বৈশিষ্ট্য এবং নিয়ম নীতির উপরে স্থান দেন। সেইসাথে নিজেকে এবং নিজের ইচ্ছাকে বস্তুতান্ত্রিক কাঠামোর সীমায় আবদ্ধ বলে মনে করেন না। নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক দিক থেকে যেসব ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা পূরণীয় বলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় না, সেগুলো অর্জনের একমাত্র উপায় হল আল্লাহর কাছে দোয়া করা। অবশ্য উত্তম দোয়া মানুষ এবং তার সমাজের উন্নয়ন ও পূর্ণতার কারণ কিন্তু উল্টাপাল্টা দোয়া বা কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে দোয়া নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল ব্যক্তিকে তার সাধ্য ও সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই যে চেষ্টা প্রচেষ্টা না করে খালি দোয়া করেই সব অর্জন করবে।

তবে খেয়াল রাখতে হবে দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি আল্লাহর হেকমতের ওপর নির্ভর করে। এমনও হতে পারে আমরা সেকল চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে এবং আল্লাহর দরবারে শত দোয়া করেও কোনো ফল পেলাম না। কিন্তু আমরা যে ফল পাবই তেমনটি আশা করাও ঠিক নয়। বরং আমাদেরকে মনে রাখতে হবে এবং বিশ্বাস রাখতে হবে আল্লাহই সকল বিষয়ে জানেন, আমরা জানি না। এমনও তো হতে পারে দোয়া যে কবুল হল না সেটাও আমাদেরই স্বার্থে।

এ আয়াত থেকে আমাদের জন্যে শিক্ষণীয় হলোঃ
১. মুমিন বান্দারা সবসময় আল্লাহর রহমত লাভের ব্যাপারে আশাবাদী। আর আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে হতাশ হওয়া দুর্ভাগ্যের কারণ।
২. আল্লাহ তাঁর বান্দাদের চাওয়া পাওয়া সম্পর্কে জানেন। তবু দোয়া করার মাধ্যমে বন্দেগির একনিষ্ঠতা ও আত্মার উন্নয়ন ঘটে বিশেষ করে বান্দা বোঝে সৃষ্টিমাত্রই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, তাই অন্য কারো শরণাপন্ন হওয়া ঠিক নয়।
৩. নেক বা সৎ সন্তান আল্লাহর একটি নিয়ামত। সৎ সন্তান মৃত ব্যক্তির আত্মায় নেকি সরবরাহ করতে থাকে