সূরা আম্বিয়া; আয়াত ১৬-২০

দুনিয়াতেই জালেমদের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে আগের আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ আয়াতে জালেমদের এই ভুল ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে, তারা মনে করে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, তা ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করেছেন। এর পেছনে আল্লাহর মহত বা বড় কোনো উদ্দেশ্

সূরা আম্বিয়া; আয়াত ১৬-২০
সূরা আম্বিয়ার ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

) وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ (16) لَوْ أَرَدْنَا أَنْ نَتَّخِذَ لَهْوًا لَاتَّخَذْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا إِنْ كُنَّا فَاعِلِينَ (17)
“আকাশ ও পৃথিবী এ দুয়ের মধ্যে যা আছে, তা আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।” (২১:১৬)
“আমি যদি ক্রীড়াচ্ছলে কিছু সৃষ্টি করতে চাইতাম তবে তা নিজ সত্তা থেকেই গ্রহণ করতাম (সৃষ্ট বস্তু থেকে নয়) যদি একান্তই তা গ্রহণ করতে চাইতাম।” (২১:১৭)

দুনিয়াতেই জালেমদের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে আগের আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ আয়াতে জালেমদের এই ভুল ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে, তারা মনে করে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, তা ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করেছেন। এর পেছনে আল্লাহর মহত বা বড় কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাই তারা কারো পরোয়া না করে আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হয়। জবাবে আল্লাহ বলছেন, যদি তিনি খেলা করতেই চাইতেন ( যা তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া বিষয় মাত্র, বাস্তবে অসম্ভব), তাহলে তিনি খেলা করার জন্য তাঁর উপযোগী বস্তু বা সমকক্ষ তৈরি করতেন। কিন্তু আল্লাহর সমকক্ষ কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। কারণ কথিত এই সমকক্ষ অস্তিত্ব কখনও আল্লাহর সমকক্ষ বা সমতুল্য হতে পারে না আল্লাহর মাধ্যমে সৃষ্ট হওয়ার কারণেই।

পৃথিবীর প্রতিটি অণুতে শত-সহস্র উদ্দেশ্য নিহিত থাকা, প্রত্যেক জিনিসের কার্যকারণের অধীন হওয়া, প্রত্যেক ভাল-মন্দের ফল আবশ্যিক হওয়া, প্রত্যেকটি কাজ সুপরিকল্পিতভাবে ও সুব্যবস্থাপনায় সম্পাদিত হওয়া প্রভৃতি প্রমাণ করে যে, বিশ্বের সৃষ্টি কখনই ক্রীড়াচ্ছলে হতে পারে না। যদি তা হত, তবে তার ধরন অন্য প্রকারের হত।
এটা কি সম্ভব এ সুন্দর বৈচিত্র্যময় বিশ্ব জগত কোন কারণ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, এর কোন প্রজ্ঞাবান জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা নেই? অবশ্য যারা সৃষ্টির উতস তথা স্রস্টা ও পরকালকে বিশ্বাস করে না, তারা মনে করে এ পৃথিবী ঘটনাক্রমে সৃষ্টি হয়েছে, এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না, উদ্দেশ্যও নেই এবং এর শেষ কী হবে তাও অস্পষ্ট। যদি এটাই সত্য হয় তথা সব কিছুরই পরিণতি হল অর্থহীনতা, নিষ্ফলতা ও অস্পষ্টতা, তাহলে কেন সাধারণ মানুষ কোনো লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করবে? কেন তারা নিজেদের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করবে?

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১. পৃথিবীকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ এটাকে উদ্দেশ্যহীন মনে করতে পারে না ও যা খুশি তা করতে পারে না।
২. যারা বলে বিশ্ব জগতের সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন তারা অবিচার ও শোষণের জন্যই এ ধরনের কথা প্রচার করে। কিম্বা ভুল ধারণার কারণেই এমন কথা বলে। এরা পুনরুত্থান বা বিচার দিবসকে অস্বীকার করে বা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকে।

সূরা আম্বিয়ার ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ (18
“আমি সত্য দিয়ে মিথ্যাকে আঘাত করি, ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং দেখ, মিথ্যা ধ্বংস হয়ে যায়। হায়! দুর্ভোগ তোমাদের। তোমরা (আমার সৃষ্টি জগত সম্বন্ধে) যে মিথ্যা আরোপ করছো তার জন্য।” (২১:১৮)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ আরো বলছেন : আল্লাহ সৃষ্টিকুল বা সৃষ্টি জগতকে সত্যপথে সৃষ্টি করেছেন, আর সত্যের ওপরই সৃষ্টিজগতকে সুদৃঢ় করেছেন। এর মধ্য মিথ্যার এগিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই কেবল সত্যই স্থায়ী হয় ও সত্য-ভিত্তিক বিষয়ই টিকে থাকে। মিথ্যা কখনও প্রকাশ পেলেও তা অবশেষে ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ স্রষ্টার মাধ্যমে নির্ধারিত সৃষ্টি জগতের রীতি-পদ্ধতির সাথে মিথ্যার কোন মিল নেই। এখানে সত্য মিথ্যার উপর প্রভাব বিস্তার করে মিথ্যাকে ধ্বংস করে দেয়, মিথ্যা কখনো সত্যকে ধ্বংস করতে পারে না।

আয়াতের শেষে মহান আল্লাহ বলেন: কিভাবে কেউ কেউ মনে করতে পারে পৃথিবী কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে? কেন তারা পৃথিবীকে খেলার সামগ্রী বলে মনে করে? কেন তারা সৃষ্টির সঠিক উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে না? কেন তারা আল্লাহর দিকে ফিরছে না?

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১. মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জয় হবেই। আর আল্লাহর রীতি হল মিথ্যাকে ধ্বংস করা।
২. মিথ্যা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতা আছে, তাই মানুষকে পরীক্ষার জন্য সে সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জয় হবেই।

সূরা আম্বিয়ার ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ عِنْدَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ (19) يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ (20)
“আকাশমণ্ডলই ও পৃথিবীর সকল প্রাণী আল্লাহ্‌র অধীনে। যারা তাঁর সান্নিধ্যে রয়েছে তারাও তাঁর এবাদত করতে অহংকার বোধ করে না, এমনকি ক্লান্তিও বোধ করে না।” (২১:১৯)
“তারা দিবা-রাত্র তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে। তারা অবসন্ন হয় না বা বন্ধ করে না।” (২১:২০)

এ আয়াতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বা সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ বলে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: অস্বীকারকারী ও জালিমরা কি জানে না সব মানুষ এমনকি জিন-ফেরেশতা সবকিছুকে তিনি সৃষ্টি করেছেন? তিনি তাদের সবারই মালিক। কোন কিছু ও কেউ তাঁর ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের আওতামুক্ত নয়। তাছাড়া আল্লাহ কোন কাফির বা সত্য অস্বীকারকারীর ঈমান ও প্রার্থনার মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ কারোরই কোনো বিষয়ের মুখাপেক্ষী নন। ফেরেশতাগণ ও খোদা প্রেমিক বান্দারা সব সময় আল্লাহর তসবিহ ও গুণগানে লিপ্ত আছেন। তারা এ তসবিহ পাঠে কখনো ক্লান্ত হয় না। আল্লাহ তাদেরকে ঈমান আনার জন্য দাওয়াত করে থাকেন,তাহলে তাদেরই কল্যাণের জন্য ও তাদের বিকাশ বা পূর্ণতার জন্য। আল্লাহ কোনো ব্যক্তিরই প্রার্থনার মুখাপেক্ষী নন।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় কিছু দিক হচ্ছে:

১. ইবাদত না করার মূলে রয়েছে অহংকার। যখন অন্য মানুষের সামনেও অহংকারকে ভাল চোখে দেখা হয় না, তখন সৃষ্টিকর্তার সামনে অহংকার করার কোন অর্থ হয় না।
২. মানুষ যত বেশি আল্লাহ-প্রেমিক বা তাঁর নিকটবর্তী হবে, ততবেশি আল্লাহ সম্পর্কে জানতে পারবে ও তত বেশি ইবাদত করবে। তখন সে ইবাদত করে ক্লান্ত হবে না।
সূত্রঃ তেহরান রেডিও