হজরত ইমাম হাদী (আ.)

Imam hadi, mohammad taki, samera, ইমাম তাকি, ইমাম হাদী, মোহাম্মাদ তাকী,
বিশ্বনবী হযরত মো: (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে দু'টি ভারী বা মূল্যবান জিনিস (আমানত হিসেবে) রেখে যাচ্ছি। যদি তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধর তবে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। ....(সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর কিতাব যা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত (রহমতের) ঝুলন্ত রশি

হজরত ইমাম হাদী (আ.)

বিশ্বনবী হযরত মো: (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে দু'টি ভারী বা মূল্যবান জিনিস (আমানত হিসেবে) রেখে যাচ্ছি। যদি তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধর তবে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। ....(সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর কিতাব যা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত (রহমতের) ঝুলন্ত রশির ন্যায় এবং অপরটি হলো আমার বংশধর; আমার আহলে বাইত। ...।"

তিরমিজি শরীফের এ হাদীস অনুযায়ী মহানবী (সা:)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের জানা এবং তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। (প্রায় একই ধরণের হাদীস মুসলিম শরীফসহ আরো কয়েকটি বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থে রয়েছে।)

মহানবী (সা:)’র আহলে বাইত বা তাঁর পবিত্র বংশধরগণ হলেন মহানবী (সা:)র পর মুসলমানদের প্রধান পথ প্রদর্শক। আদর্শ ইসলামী সমাজ গঠন ছিল তাঁদের লক্ষ্য। অন্ধকারে অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র যেভাবে পথ হারিয়ে ফেলা মানুষকে পথ দেখায় তেমনি মহানবী (সা:)’র আহলে বাইত পথহারা উম্মতকে দেখিয়েছেন পথের দিশা। তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দানশীলতা, সদাচরণ, অধ্যবসায়, সত্যের পথে জিহাদ, পরোপকার ও খোদা-ভীতির মত মহত গুণাবলী আজও মুসলমানদের জন্যে মানবীয় পূর্ণতা লাভের আদর্শ। আহলে বাইত (আ.)’র অন্যতম সদস্য তথা দশম ইমাম আলী বিন মো: আল হাদী (আ.)'র জন্ম-বার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জীবনের কিছু দিক নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করবো। এই মহান ইমামের জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ।

হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর যখন মুসলমানদের ওপর চেপে বসা উমাইয়া ও আব্বাসীয় রাজতান্ত্রিক শক্তি নিজের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্যে দরবারী আলেমদের সহায়তায় ইসলামের অপব্যাখ্যা জোরদার করে এবং ইসলামের প্রকৃত ও ন্যায়কামী বৈশিষ্ট্যের প্রতি মানুষের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণকে দমিয়ে রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয় সেই দুর্দিনে ইসলামের প্রদীপ্ত মশাল নিয়ে মহানবী (সা:)’র আদর্শকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে তাঁরই পবিত্র বংশধারার যে ইমামগণ সর্বাত্মক সংগ্রামে নিয়োজিত হয়েছিলেন ইমাম আলী আন নাকী আল হাদী (আ.) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। উম্মতের জন্য সুপথ বা হেদায়াতের দিশারি ছিলেন বলেই তাঁর উপাধি ছিল হাদী। তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ইমাম নাকী বা হাদী (আ.) ২১২ হিজরির ১৫ ই জিলহজ্ব বা খৃষ্টীয় ৮২৮ সালে মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ২২০ হিজরিতে পিতা ইমাম জাওয়াদ (আ.)’র শাহাদতের পর তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব নেন। ইমাম নাকী (আ.)’র মায়ের নাম ছিল সুমমানা খাতুন।

ইমাম হাদী (আ.)’র সাত জন আব্বাসীয় খলিফার সমসাময়িক ছিল। এই সাতজন হল যথাক্রমে খলিফা মামুন, মুতাসিম, ওয়াসিক, মোতাওয়াক্কিল, মুন্তাসির, মোস্তাইন এবং মুতাজ। খলিফা মুতাসিম ইমাম হাদী (আ.)’র পিতাকে বাগদাদে বিষ প্রয়োগে শহীদ করেছিল। এ সময় ইমাম হাদী (আ.) মদীনায় ছিলেন। ইমামতের মহান দায়িত্ব পালন এবং ইসলামী শিক্ষা ও বিধি বিধান প্রচারের জন্যে তিনি মদীনায় একটি কেন্দ্র গড়ে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের সব স্থানে তাঁর সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমাম হাদী (আ.)’র জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে উপকৃত হবার জন্যে বহু দূর ও কাছের এলাকা থেকে জ্ঞান-পিপাসুরা তাঁর কাছে জড়ো হত। আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল জনগণের মধ্যে ইমাম হাদীর এতো জনপ্রিয়তা ও প্রভাব লক্ষ্য করে ভীত হয়ে পড়ে। ইমাম হাদী (আ.) আবদুল আজিম হাসানিসহ ১৮৫ জন ছাত্রকে উচ্চ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিলেন এবং তারা সবাই ছিল সে যুগের নানা জ্ঞানে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ।

মদীনায় নিযুক্ত মোতাওয়াক্কিলের গভর্নর ইমাম হাদী(আ.)'র নামে কিছু মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে খলিফা মোতাওয়াক্কিলের কাছে চিঠি লেখে। ইমাম হাদীর পথ নির্দেশনায় জনগণ শাসকদের অত্যাচার অবিচার ও তাদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অযোগ্যতার কথা খুব অচিরেই বুঝে ফেলবে ও এভাবে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে বলেও মদীনার গভর্নর তার চিঠিতে উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় মুতাওয়াক্কিল ইমামকে কৌশলে তৎকালীন রাজধানী সামেরা শহরে নিয়ে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাধা বিপত্তি সত্বেও ইমাম হাদী (আ.) সামেরা শহরেও প্রকৃত ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন।

খলিফা মোতাওয়াক্কিল ইমাম হাদী (আ.)কে জব্দ ও অপমানিত করার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। ইমামকে সম্মান প্রদর্শনের নামে মোতাওয়াক্কিল তাঁকে নিজ দরবারে হাজির করে অপমানিত এবং কখনও কখনও হত্যারও চেষ্টা করেছে। আব্বাসীয় এ খলিফার নির্দেশে ইমাম হাদী (আ.)’র ঘরে তল্লাশি চালানো হত। একবার তল্লাশি চালানোর পর তাঁর ঘরে মুদ্রার দুটি থলে পাওয়া যায়। একটি থলেতে ছিল খলিফা মোতাওয়াক্কিলের মায়ের পাঠানো দশ হাজার দিনার। খলিফার কাছে মোহর-করা ওই থলেটি আনা হলে ওই থলের মোহর বা সিলটি যে তার মায়ের তা সে বুঝতে পারে। ফলে খলিফার মায়ের ওপরও যে ইমাম হাদী (আ.)'র প্রভাব ছিল তা স্পষ্ট হয়।

একদিন মোতাওয়াক্কিল এক বৈঠকে ইমাম হাদী (আ.)কে ডেকে আনে। বৈঠকে প্রবেশ করা মাত্রই মুতাওয়াক্কিল ইমামকে একটি কবিতা বলার আহবান জানায়। ইমাম হাদী অপারগতা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোতাওয়াক্কিল নাছোড়বান্দা। ইমাম তখন বাদশাহ ও সম্রাটদের পরিণতি বর্ণনা করে শিক্ষামূলক একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। ঐ কবিতার বক্তব্য ছিল এ রকম-

তারা তাদের বসবাসের জন্যে সুউচ্চ প্রাসাদ গড়েছিল,
রেখেছিল সশস্ত্র প্রহরী পাহারার,
আরও নানা ব্যবস্থা নিয়েছিল নিরাপত্তার ।
কিন্তু এসব কিছুই ঠেকাতে পারেনি মৃত্যু তাদের ।
কত সুরম্য অট্টালিকা আর প্রাসাদ তারা গড়েছিল
এসবের নির্মাণে কত দীর্ঘ সময় তারা ব্যয় করেছিল
আশা ছিল বিপদ আপদ থেকে বাঁচার,
কিন্তু মৃত্যুর হুংকার
সেসব ইমারত থেকে বের করে এনেছে তাদেরকে,
কালের বিবর্তনে সেসব প্রাসাদ তাদের
পরিণত হয়েছে মাটির স্তূপে।
সেসবের অধিবাসীরা অট্টালিকা ছেড়ে হায়
স্থানান্তরিত হয়েছে মাটির নিকৃষ্ট গর্ত, খানা-খন্দ আর কবরের সংকীর্ণ গুহায়!

ইমাম হাদী (আ.)’র কবিতার মর্মস্পর্শী বক্তব্য উপস্থিত ব্যক্তিদের হৃদয় স্পর্শ করলো এবং মুতাওয়াক্কিলের মতো জালিম শাসককেও প্রকম্পিত করলো। মুতাওয়াক্কিলের দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। সে ইমামের কাছে ক্ষমা চাইলো এবং সসম্মানে তাঁকে বাড়ীতে ফেরত পাঠিয়ে দিলো।

মোতাওয়াক্কিল প্রকাশ্যেই হযরত আলী (আ.)’র ওপর লানত দিতো এবং হযরত আলী (আ.)’র প্রতি ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ করার জন্যে একবার এক পেশাদার ভাঁড়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২৩৭ হিজরিতে মোতাওয়াক্কিলের নির্দেশে ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাজারসহ আশপাশের অনেক বাড়ী ঘর ধ্বংস করা হয়েছিল এবং ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাজারের কোনো চিহ্ন যাতে না থাকে সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

মোতাওয়াক্কিলের শাসনামলে হিজাযে মহানবীর বংশধর তথা হযরত আলী(আ.)র বংশধরদের এমন দুরবস্থায় রাখা হয়েছে যে তাঁরা তাঁদের পরিবারের মহিলাদের হিজাব বা পর্দার জন্যে যথেষ্ট কাপড় সংগ্রহ করতে পারেননি। তাঁদের পরিবারের মহিলাদের অনেকেই পুরনো একটি চাদর পরে নামাজ আদায় করতেন। মিশরেও হযরত আলী (আ.)’র বংশধরদের প্রায় একই ধরনের চাপের মুখে রাখা হয়েছিল।

যাই হোক্, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অদ্বিতীয় ইমাম হাদী (আ.) অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও আলাপ আলোচনা ও যুক্তি তর্কের বৈঠকের আয়োজন করতেন এবং তাঁর অনুসারীদের চিন্তা ও ধ্যান ধারণাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। ইসলামের নামে যেসব ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত হয়েছিল সেগুলোকে তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। ইমাম হাদী (আ.) জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্যে দৃঢ় ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞানকে অন্যতম শর্ত বলে মনে করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে ইমাম হাদী(আ.)'র অপূর্ব যুক্তি তর্কের উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের পরিচিতিমূলক জিয়ারত 'জিয়ারতে জামে কবির' এই মহান ইমামের এক অনন্য ও অমর অবদান।

ইমাম হাদী(আ.)'র যুগে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুতাওয়াক্কিল নিজ পুত্রের হাতে নিহত হয় এবং এরপর আরো ৩ জন আব্বাসিয় শাসক ক্ষমতাসীন হয়। এরাও মুতাওয়াক্কিলের মতো ইমাম হাদী (আ.)কে তাদের শাসন ক্ষমতার পথে কাঁটা হিসেবে দেখতে পায়। এ অবস্থায় ২৫৪ হিজরির ২৬ শে জমাদিউস সানি আব্বাসীয় খলিফা মুতাজ ৪১ বছর বয়সের ইমাম হাদী (আ.)কে বিষ প্রয়োগে শহীদ করেন। ফলে বিশ্ববাসী তাঁর উজ্জ্বল নূর থেকে বঞ্চিত হয়।

ইমামের নানা অসাধারণ গুণের মধ্যে দানশীলতা ছিল অন্যতম। ইমাম হাদী (আ.)একবার এক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ত্রিশ হাজার দিরহাম বা স্বর্ণমুদ্রা দান করেছিলেন। ঐ ব্যক্তি বলেন: জনাব এ অর্থের তিনভাগের একভাগই আমার দেনা শোধ করার জন্যে যথেষ্ট। ইমাম হাদী (আ.) বললেন, বাকী অর্থ তোমার পরিবার পরিজনের জন্যে খরচ কর । লোকটি বললো: খোদায়ী পথপ্রদর্শক হবার যোগ্য কারা তা আল্লাহই ভালো জানেন ।
ইমাম হাদী (আ.)’র কয়েকটি বাণী শুনিয়ে শেষ করবো আজকের এ আলোচনা। তিনি বলেছেন:
স্বার্থপরতা জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা এবং তা অজ্ঞতা ডেকে আনে।
যা অন্তরে গৃহীত ও কাজে প্রকাশিত সেটাই মানুষের ঈমান।
যে নিজের কাছেই হীন সে কখনও মন্দ ও অশুভ বিষয় থেকে মূক্ত নয়।
হিংসা সৎকর্ম বা সৎ গুণাবলী ধ্বংস করে দেয় এবং ক্রোধ ডেকে আনে।
আখেরাতের পুরষ্কার হলো দুনিয়ার কষ্ট ও পরীক্ষার বিনিময়।
ইমাম হাদী (আ.)’র শুভ জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে আবারো অভিনন্দন জানাচ্ছি।
সূত্রঃ রেডিও তেহরান

اشتراک گذاری: 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন

Fill in the blank.