মারেফাতের মাস মহরম

প্রত্যেক বছরের ন্যায় এ বছরও প্রতি শহরের মসজিদ ও বাড়ি ঘরের ছাদের উপরে ইয়া আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.) এবং ইয়া আবাল ফাযল (আ.) ইত্যাদি লিখিত আযাদারির কালো পতাকা লাগানো হয়েছে। আর বাজারের আযাদারির সরঞ্জাম বিক্রেতার দোকানগুলোতেও কালো জামা, নাওহা ও শোকগাথা

মারেফাতের মাস মহরম

প্রত্যেক বছরের ন্যায় এ বছরও প্রতি শহরের মসজিদ ও বাড়ি ঘরের ছাদের উপরে ইয়া আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.) এবং ইয়া আবাল ফাযল (আ.) ইত্যাদি লিখিত আযাদারির কালো পতাকা লাগানো হয়েছে।
আর বাজারের আযাদারির সরঞ্জাম বিক্রেতার দোকানগুলোতেও কালো জামা, নাওহা ও শোকগাথার বিশেষ জিনিসপত্র বিক্রির ধুম পড়েছে। মহরম শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই আশেকানে ইমাম হুসাইন (আ.) এ মারেফাতের মাসকে স্বাগতম জানাতে ও বাতিলের মোকাবেলায় হক্ব ও সত্য পথের পরিচয় জানার জন্য উৎসুক হয়ে আছেন। এই আবেগ ও উদ্দীপনা -যা বর্ণনা করার মত নয়- শিয়া মাযহাবের মধ্যে মহরম ও আশুরা আন্দোলনের গুরুত্বকে তুলে ধরে। এমন এক আন্দোলন যা নবী করিম (সা.) এর ওফাতের পর ইসলামের পথ থেকে সমাজে শাসকদের বিচ্যুতি, অত্যাচার ও অন্যায়ের কারণে ঘটেছে এবং নবী (সা.) বংশের সততার চিরজীবী গর্বময় সনদ স্বরূপ এবং বিশ্বের প্রতিটি হক্ব অনুসন্ধানীদের জন্য ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল পথ হয়ে রইলো। প্রত্যেক বছর মহরম মাস আগমনের সাথে সাথেই শিয়ারা এই গর্বময় সনদকে বিশ্ববাসীর জন্য উপস্থাপন করে, যাতে করে হেদায়েতের এই প্রদীপ ও নাজাতের তরী, প্রত্যেক যুগে ও প্রতিটি স্থানে মানুষের জীবনে বাতিলের উপর সত্যের বিজয়ের সুসংবাদ দিতে পারে। শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে আহলে বাইত (আ.) পরিবারের সত্যতার উপর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য কোন দলিল প্রমাণের প্রয়োজন নেই। আর সারা বিশ্বের শিয়া মাযহাবের অনুসারীরা সব সময় এ পরিবারের প্রতি অবর্ণনীয় এক প্রকার ভালবাসে ও ভক্তি করে আসছে এবং তার জন্য প্রতি বছর মহরম মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে সাইয়েদুশ শুহাদা ও তাঁর আত্মত্যাগী ও সাহসী পরিবার বর্গের আযাদারি করার জন্য নিজেরা তৈরি হয়ে থাকে। সাহসিকতার সাথে বলা যেতে পারে যে, মহরম ও আশুরার আযাদারিসমূহ হচ্ছে শিয়াদের একটি সংস্কৃতির অংশ বিশেষ যার শিকড় এ মাযহাবের ইতিহাসের গভীরে রয়েছে। বছর বছর ধরে মহরম তার ঐতিহ্যপূর্ণ নিয়ম -বিধিকে ধরে রেখেছে এবং এগুলোকে শেষ হতে তো দেয়নি বরং সমাজের পরিস্থিতির সাথে সাথে তা সংস্কৃতির সাথে সংযোজন হয়েছে। এর সুন্দর উদাহরণ আমরা ইসলামী ইরানের বিপ্লবের পূর্বে মহরমগুলোতে উপলব্ধি করতে পারি, যখন অত্যাচারী শাহি শাসকের বিরুদ্ধে মহরমের আযাদারি ন্যায় ও প্রতিরোধের বার্তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। ইরানি জনগণ তখন ইমাম হুসাইন (আ.) এর পথকে আদর্শ হিসেবে ধরে শাহি শাসকের জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে অনুসরণ করেছে, রক্ত দিয়েছে ও বিজয় অর্জন করেছে। আর বর্তমানে আমরা এ আন্দোলনের অসীম ঝড় বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী জাগরণ হিসেবে দেখতে পাচ্ছি, যা জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রাসাদগুলোতে একের পর এক কম্পনের সৃষ্টি করেছে।
এতদ্বসত্বেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বলা যেতে পারে যে, এখনো প্রকৃত পক্ষে কারবালার ঘটনা এবং তার গভীর চিন্তাধারা প্রতি যেভাবে আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত আমরা দিতে পারিনি। অনেক সময় অবশ্য এ সমুদ্র হতে লাভবান হতে গিয়ে ভ্রান্ত পথে অগ্রসর হয়েছি, তখন আমরা আশুরার ঐতিহ্য ও গুরুত্ব থেকে নিজেকে অনেক দুরে দেখতে পেয়েছি। এ হৃদয় বিদারক ঘটনা সব সময় সমাজে প্রভাব ফেলেছে কিন্তু আশুরা আন্দোলনের দর্শন, সত্যের অনুসন্ধান ও অন্যায়ের বিরোধিতাকে আজকের অত্যাচার ও জুলুমের অবস্থার সাথে তুলনা করাটা হচ্ছে একটি বিশেষ গুরুত্বের বিষয় যা ভুলে গেলে চলবে না। আর তাই সাইয়েদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইনের (আ.) অনুষ্ঠানগুলোকে শুধুমাত্র আযাদারি, মর্সিয়া, নাওহা, ও শোক মাতমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না। বরঞ্চ এই সময়গুলো হচ্ছে ইমাম হুসাইন (আ.) এর আন্দোলনের দর্শন বর্ণনা করার সর্বোত্তম সুযোগ, যে আন্দোলন কারবালার শহীদদের রক্ত দিয়ে অমর হয়ে রয়েছে।
আশুরা হচ্ছে শিয়া মাযহাবের সম্মানের দলিলস্বরূপ। তাই এই ঘটনার গভীর বার্তা এবং তার গোপন রহস্য হতে গাফিল হলে চলবে না। বরং আশুরা বার্তা ও ইমাম হুসাইন (আ.) এর আন্দোলনের দর্শনকে আমাদের গভীর অন্তরে অবস্থান করে দিতে হবে। যার প্রত্যেকটি বার্তা এক বৃহৎ আন্দোলনের ভূমিকা সৃষ্টি করতে পারে যা বিশ্বের বলদর্পী শক্তিগুলোকে মাটির সাথে পিষে দিতে সক্ষম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হয় যে, জেনে শুনে বা অনিচ্ছায় আমরা কিছু লোককে এমন সব কাজ করতে দেখি যা বিশ্বে শিয়া মাযহাবের সম্মানকে ক্ষুণ্ণ করে এবং শত্রুদেরকে এসব ঘটনা থেকে অপব্যবহারের ভূমিকা করে দেয়।
অবশ্য বলতে হবে যে, মারেফতি ও মানবীয় বার্তার প্রতি মনোযোগ না দিয়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করা উচিৎ নয় কেননা এতে শত্রুপক্ষ বিভিন্ন রকম চক্রান্ত করতে পারে এবং এ বিষয়ের সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে সবার দায়িত্ব। যারা আযাদারিকে নিয়ে অহেতুক কাজকর্ম ও কুসংস্কারে মেতে আছে শুধু তারাই দোষী নয় বরং ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে আযাদারির ক্ষতিকর দিকগুলোর সংশোধন করা এবং সঠিক পথে সবাইকে দিক নির্দেশনা দেয়া।

 

সূত্রঃ তাকরিবে মাযাহিব