ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বের আলামত সমূহ

ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বের আলামত সমূহ

ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বের আলামত সমূহ
ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের আলামত সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাব তার বিভিন্ন আলামতের উল্লেখ করেছেন কিন্তু শিয়া মাযহাব তাদের মধ্যে অগ্রণি ভূমিকা রেখেছে।
যখন খৃষ্টানদের এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তারা এর উত্তরে বলে যে, এটা হচ্ছে একটা রহস্যের বিষয়।
এটা ঠিক যে এ বিষয়টি হচ্ছে এমন এক বিষয় যার সম্পর্কে অনেক কথা যা আজও উহ্য রয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে প্রায় সকল মাযহাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তা খুব একটা স্পষ্ট না অথবা তা বিকৃত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিয়া মাযহাবে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাব সম্পর্কে যথেষ্ট এবং সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশ্যেভাবে অত্যাচার
মাহদী (আ.) এর আগমনের সাথে সাথে জুলুম ও অত্যাচার বিদুরিত হবে। আমরা যদি জুলুম বা অত্যাচারের সংজ্ঞা দিতে চাই তাহলে এর বিভিন্ন অর্থ বের হয়ে আসবে। যেমনঃ অন্যর অধিকার হরণ করা, অন্যর অধিকার জোরপূর্বক হরণ করা। কিন্তু সবচেয়ে বড় জুলুম হচ্ছে নিজের প্রতি জুলুম করা যা ইমাম মাহদী (আ.) এর আগমণের পরেই তার সংশোধন করা সম্ভব। আমরা যদি আমাদের উপরে কৃত অত্যাচার করা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারি তাহলে আমরাও যুগের সালমান হতে পারবো। খোদা আয়েম্মা (আ.) দেরকে নির্বাচন করেছেন এবং তারা সেই ইলমে গায়ব দ্বারা ইমাম মাহদী (আ.) এর আগমণের কিছু আলামত বর্ণনা করেছেন।
ইমাম (আ.) গণ এবং ইসলামের ওলামায়ে কেরামেরা উক্ত গায়বাতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন।
১-স্বল্প মেয়াদী আত্মগোপন।
২-দীর্ঘ মেয়াদী আত্মগোপন।
যেহেতু এখন দীর্ঘ মেয়াদী আত্মগোপনকাল চলছে সেহেতু আমরা এর কিছু বৈশিষ্ট ও আলামত সম্পর্কে আলোচনা করবো। আহলে বাইতের পবিত্র ইমাম (আ.) গণ দীর্ঘ মেয়াদী অন্তরাল সম্পর্কে কিছু আলামত বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম মাহদী (আ.) এর অবির্ভাবের পূর্বে কিছু ঘটনা সংঘটিত হবে যেমনঃ সুফিয়ানীদের অগমণ তার ৬ মাস পরে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাব, এছাড়াও ইমাম (আ.) গণ আবির্ভাবের যে আলামত সমূহের কথা বলেছেন তাতে তারা তাঁর আবির্ভাবের সময় উল্লেখ করেননি।
১- পৃথিবীর সকল স্থানে ফেতনা দেখা দিবে।
আমরা যদি আমাদের সামাজিক অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব কতগুলো পরিবারি এমন রয়েছে যারা সম্পূর্ণভাবে খোদার বিধান অনুযায়ি নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করছে?
কি স্যাটালাইটের চ্যানেলগুলো আমাদের পরিবারকে আসক্ত করেনি?
কি বিভিন্ন মাযহাব সমূহের মাঝে দ্বন্দ শুরু হয়নি? কি আমরা সারা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের আর্তনাদ শুনতে পাই না?
গান বাজনাকে আর কেউ হারাম বা খারাপ চোখে দেখে না, কেউ গুনাহ করলে তা আর তেমন ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয় না।
২-প্রকাশ্যেভাবে জুলুম ও অত্যাচার।
৩-সাধারণ মানুষের মনে হতাশা ও নিরাশা।
পরিণামঃ আমরা দেখতে পাই আত্মহত্যা, অবসাদ ও বিষন্নতা দূরিকরণের জন্য ট্যেবলেট সেবন। আমাদের সমাজ যদি এই পথে এগুতে থাকে তাহলে সারা সমাজ জুড়ে নেমে আসবে অবসাদ ও বিষন্নতা, আর এভাবে চলতে থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে সারা দুনিয়াব্যাপি অবসাদ ও বিষন্নতা বিরাজমান থাকবে। আর মানুষ যদি অবসাদ ও বিষন্নতায় ভুগে তাহলে সে আর কোন কাজই করতে পারবেনা।
৪-সর্বস্থানে বিরোধ বিরাজমান থাকবে।
বিরোধ, যার কোন অন্ত নেই তার পরিণাম হচ্ছে ফেসাদ। বিশ্ব যুদ্ধ, নতুন সরকার , নতুন দেশ এ সবকিছুই হচ্ছে এক নতুন ফেতনার সূচনা।
৫-মানুষেরা সহজেই এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে দিক্ষিত হবে।
পূর্বে এ বিষয়টি ছিল খুব একটা দৃষ্টিগোচর হতো না, রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে ইমাম মাহদী (আ.) এর আগমণের পূর্বে সমাজ ও মানুষের অবস্থা এমন হবে যে, মুমিন রাতে নিজের ঈমান নিয়ে ঘুমাবে সকাল হলে সে কাফের অবস্থায় জাগরিত হবে বা তার বীপরিত কাফের রাতে নিজের ঈমান নিয়ে ঘুমাবে সকাল হলে সে মুমিন অবস্থায় জাগরিত হবে।
৬-সুদের প্রচলন।
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, শেষ যুগে এমন কেউ থাকবে না যে, সে সুদ খাবে না বা সে সুদের প্রতি আসক্ত হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
৭- সকল ধর্মে নিজের ঈমান রক্ষা করা কষ্টসাধ্য হবে।
বর্তমানে আমরা যদি খৃষ্টান ধর্মের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, তাদের ধর্মের বিধান অনুযায়ি তাদের ধর্ম রক্ষা করা তাদের জন্য কষ্টকর একটি ব্যাপার। যদিও তারা তাদের আসমানী কিতাবকে বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু তারপরেও তাদের ধর্মীয় পুস্তকে যা রয়েছে তা তারা সম্পাদন করতে পারছে না। কি দ্বীনকে তাদের জন্য কঠিন করে উপস্থাপন করা হয়নি?
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, শেষ যুগে ধর্ম পালন হাতে আগুন নিয়ে দাড়িয়ে থাকার মতো হয়ে দাড়াবে। মুমিনদের ঈমান রক্ষার অবস্থা এমন হয়ে দাড়াবে যে, যেভাবে শিয়াল তার নিজের বাচ্চাদের জীবন রক্ষার জন্য এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ছুটে বেড়ায় সেভাবে ছুটে বেড়াবে এবং কোন হক্ব কথা বলতে পারবে না। আর যদি কথা বলে তাদেরকে হত্য করা হবে। আর যদি চুপ থাকে তাহলেও তারা লুন্ঠিত হবে।
৮-মসজিদকে চাকচিক্য করা হবে কিন্তু মুসল্লি থাকবে না।
মানুষ মসজিদে থাকবে কিন্তু তাদের অন্তর থাকবে অন্য স্থানে এবং তারা একে অপরের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত থাকবে। একজন অপরজনকে হত্যার ফতুয়া দান করবে একে অপরকে মানবে না এবং সর্বদা ফেতনায় লিপ্ত থাকবে।
৯- ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ লেগে থাকবে যার কোন সমাপ্তি নেই।
পরিসংখ্যান করে দেখা গেছে যে, প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মাত্র ১৪ দিন সারা বিশ্বে কোথাও যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে সারা বিশ্বেজুড়ে আজও যুদ্ধের অবসান ঘটেনি।
১০- ফেসাদ এবং পতিতা বৃত্তির আধিক্যতা।
পূর্বে ইয়াহুদি, খৃষ্টান এবং হিন্দু ছাড়া মুসলমান সমাজের অবস্থা এমনটি ছিল না। কিন্তু এখন আমরা আমাদের সমাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাই যে, আমরা কোন সমাজে বসবাস করছি, যেখানে নাচ, গান, ডিস্কো এবং নারী বাজিতে সমাজ নিমজ্জিত রয়েছে।
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সমকামীতা এমন এক অবস্থায় পৌছাবে যে, তা মানুষের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে দাড়াবে।
গুনাহের পরিমাণ এতই বেশি হয়ে গেছে যে ক্যাথলিকরা সমকামীতাকে স্বীকৃতি দান করেছে এবং অনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তারা সমকামীতাকে গ্রহণ করেছে। তারা গর্ব করে বলে যে, যারাই সমকামীতার বিরোধিতা করবে তারা মানবাধিকার কে খর্ব করলো।
১১-মুমিনদের মধ্যে দ্বন্দ।
১২-আরবের নেতাবৃন্দ এবং হুকুমত সমূহের দ্বন্দ।
ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বের একটি আলামত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেনঃ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পরে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাব ঘটবে। আব্দুল্লাহ এর মৃত্যুর পরে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য লোকজন দ্বন্দ লিপ্ত হবে। তিনি আরো বলেনঃ যে সমস্ত হুকুমতের মেয়াদকাল বছরে পরিণত হবে এবং তারপর তা মাসে পরিণত হবে।
১৩-অনেক মানুষ লাল (যুদ্ধ) ও সাদা (প্লেগ) মৃত্যুতে নিপতিত হবে।
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন মানুষেরা আরাফার আমল সম্পাদন করতে থাকবে একজন আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর দিবে তখন মানুষের মাঝে চরম বিরোধ দেখা দিবে। উক্ত বিরোধের কারণে অত্যাচারীদের সংখ্যা কমে যাবে এবং এটি হচ্ছে একটি নেয়ামত। রেওয়ায়েতে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বে অনেকেই লাল ও সাদা মৃত্যুতে নিপতিত হবে।
১৪-মানুষের গড় আয়ু কমে যাবে।
হয়তো আমাদের যুগে বিষয়টি একটি সাধারণ ব্যাপার কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য তা একটি আশ্চর্যের বিষয় হবে। তারা পূর্বের মানুষদের কথা চিন্তা করে আশ্চর্যিত হবে। যখন রাসুল (সা.) খবর দেন যে, মানুষের আয়ু এতই কম হবে যে, একজন ইবাদতকারী ব্যাক্তি বলবে যদি আমার আয়ু নির্ধারণ করা হয় তাহলে আমি তা এক সেজদায় তা শেষ করবো। যদিও হজরত নূহ (আ.) এর বয়স ছিল এক হাজার বছর।
১৫-ইমামের আবির্ভাবের পূর্বেই সত্য ও মিথ্যা স্পষ্ট হবে।
উক্ত বিষয়টি ইরানের কুম নগরী থেকে প্রকাশ পাবে। রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, কুম নগরী থেকে এমনভাবে জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে যে, হক্ব বাতিল থেকে স্পষ্ট হবে। অবস্থা এমন দাড়াবে যে, গৃহিনীরাও হক্বকে চিনতে ও বুঝতে পারবে।
১৬-দ্বীন ধ্বংসের জন্য বাতিল যুদ্ধ সমূহ আবির্ভাবের পূর্বে সংঘটিত হবে।
শত্রুরা পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছে যে, ১০০ বছর পরে আরমাগেদুন নামক যুদ্ধের সূচনা তারা করবে।
ইয়াহুদী এবং খৃষ্টানরা বহু বছর ধরে একে অপরের শত্রু ছিল কিন্তু এখন তারা বর্তমানকে সামনে রেখে একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে যাচ্ছে। তাদের ঐক্যর কারণ হচ্ছে তাদের শত্রু হচ্ছে এক আর তা হচ্ছে ইসলাম।
১৭-ইমাম (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বে অত্যাচারী শাসকদের অস্তিত্ব।
ইমামের আবির্ভাবের পূর্বে অত্যাচরী শাসকদের আগমণ ঘটবে।
১৮-ইমাম (আ.) এর আবির্ভাবের পূর্বে হক্বকে বাতিল সাবস্ত্য করা হবে এবং বাতিলকে হ্বক সাবস্ত্য করা হবে।
১৯-অনেক কম মানুষের চেহরায় খোদায়ি নিদর্শন দেখতে পাওয়া যাবে।
২০-পুরুষ ও নারী নিজেদেরকে একে অপরের সাজে সজ্জিত করবে।
পুরুষরা নিজেদেরকে নারীর সাজে এবং নারীরা নিজেদেরকে পুরুষের সাজে সজ্জিত করবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষেরা নিজেদেরকে পুরুষ বা নারীতে রূপান্তরিত করবে।
২১-মানুষেরা এক সাথে থাকবে কিন্তু তাদের অন্তর এক হবে না।
২২-তালাক্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
খৃষ্টানরা বলে যে, আমাদের মাঝে তালাক্ব এর কোন অস্তিত্ব নেই বরং যদি কেউ তালাক্ব দেয় তারপরেও তারা স্বামী স্ত্রীর ন্যায় জীবন যাপন করতে পারবে। যার কারণে ইউরোপিয় দেশ সমূহে এই ধরণের ফেসাদ বেশী পরিলক্ষিত হয়।
২৩-খোদায়ী বিধান বাস্তবায়িত হবে না।
আযারবাইজান একটি বড় ইসলামী দেশ হওয়া সত্বেও সেখানে ডিস্কো, নাচ একটি সাধারণ ব্যাপার কেননা তাতে টাকা বেশী রয়েছে সেখানে দেশীয় অথবা বিদেশী মেয়েদেরকে আনা হয় এবং অসামাজিক কাজ সেখানে করানো হয়। এক্ষেত্রে সেখানে কোন ইসলামী আইন জারী করা হয় না।
২৪-গায়িকার আধিক্যতা, যা পূর্বে ছিল না।
২৫-গুনাহ মানুষের আয়ুকে হ্রাস করে, এমনকি সে বালেগ (ছেলে ১৫, মেয়ে ৯) হওয়ার পূর্বেও মারা যেতে পারে।
২৬- বাদ্যযন্ত্রের আধুনিকতা ও আধিক্যতা।
২৭- মানুষ খোদার জন্য কাজ করবে না।
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষ ভবিষ্যতে হজ্বে যাবে হয় ব্যাবসা, রাজনৈতিক কারণে অথবা মানুষ দেখানোর জন্য।
২৮-ফক্বিররা ভিক্ষা পাবে না।

যদি তারা চাই তাহলে অপমাণিত হবে আর যদি না চাই তাহলে ক্ষুধায় মারা যাবে।
এছাড়াও ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাবের আরো অনেক আলামত রয়েছে যা পরবর্তিতে আমরা আলোচনা করবো। তাই আসুন আমরা সেই পবিত্র ইমামের আবির্ভাবের পূর্বেই নিজেদেরকে সংশোধন করি, যেন তাঁর আবির্ভাবের পরে তার সাথে থেকে ইসলামের খেদমত করতে পারি।