শিয়া মাযহাব কেন ইমাম সাদিক্ব (আ.) এর সাথে সম্পৃক্ত?

আহলে বাইতের মা’সুম ইমামগণের ধারাবাহিকতায় হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন ষষ্ঠ ইমাম। তাঁর মাধ্যমে জাফারী মাজহাবের ফিকাহ্‌ব্যাপক প্রসার ও সুবিন্যস্ত রূপ লাভ করে বিধায় শিয়া মাযহাব ‘জাফারীমাযহাব’ হিসেবেও পরিচিত লাভ করে ।

শিয়া মাযহাব কেন ইমাম সাদিক্ব (আ.) এর সাথে সম্পৃক্ত?
আহলে বাইতের মা’সুম ইমামগণের ধারাবাহিকতায় হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন ষষ্ঠ ইমাম। তাঁর মাধ্যমে জাফারী মাজহাবের ফিকাহ্‌ব্যাপক প্রসার ও সুবিন্যস্ত রূপ লাভ করে বিধায় শিয়া মাযহাব ‘জাফারীমাযহাব’ হিসেবেও পরিচিত লাভ করে ।
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জন্ম ও ওফাতের তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবেদ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সম্ভবত সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মত হচ্ছে শেখ সাদুক (রহ.)-এর বর্ণিত অভিমত। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল্‌কিতাবুল ইরশাদ’-এ লিখেছেন যে, হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) হিজরী ৮৩ সালে পবিত্র মদীনা নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং হিজরী ১৪৮ সালে সেখানেই শহীদ হন। তাঁকে মদীনা শরীফে রাসুলে আকরাম হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাজারের অদূরে জান্নাতুল বাকী নামক গোরস্তানে দাফন করা হয়। তাঁকে আহলে বাইতের দ্বিতীয় ইমাম হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর পাশে দাফন করা হয় ।
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন, আহলে বাইতের পঞ্চম ইমাম হযরত ইমাম বাকের (আ.)-এর পুত্র এবং চতুর্থ ইমাম আরেফকুল শিরোমণি হিসেবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর নিকট সুপরিচিত হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর নাতি। হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ইমামত প্রমাণ করে এমন রেওয়ায়েতের সংখ্যা বিপুল । তিনি জীবনে কখনও কোন তুচ্ছ ব্যাপারেও মিথ্যা কথা বলেন নি। এ কারণে তাঁকে ‘আস্‌সাদিক’ বা সত্যবাদী খেতাব দেয়া হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মহানবী (সা.) তাঁর আগমন সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করে ছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, তাঁর বংশে হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর আগমন ঘটবে এবং তিনি হবেন সত্যর বাণী ও সত্যের বার্তাবাহক
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) জন্মের পর বার বছর যাবত তাঁর দাদা হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর (যিনি হযরত ইমাম সাজ্জাদ নামেও সুপরিচিত) সাহচর্য লাভ করেন । দাদার ওফাতের পর তিনি আরো ১৯ বছর তাঁর পিতা হযরত ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.)-এর সাহচর্য পান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি মুসলিম উম্মাহর ইমামতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং দীর্ঘ ৩৪ বছর এ দায়িত্ব পালনের পর শাহাদত বরণ করেন।
হযরত জাফর সাদিক (আ.) তাঁর ইমামতের শেষ পর্বে এসে আববাসীয় খলিফা মানসুরের কু-দৃষ্টির শিকার হন। খলিফা মানসুর তাঁকে সদা কড়া পাহারা, নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার মাঝে বসবাস করতে বাধ্য করে। আববাসীয় খলিফা মানসুর নবী বংশের সাইয়েদ বা আলাভীদের উপর অসহ্য র্নিযাতন চালাতে শুরু করে। তার ঐ নির্যাতনের মাত্রা উমাইয়া খলিফদের নিষ্ঠুরতা ও বিবেকহীন র্স্পধাকেও হার মানিয়ে দেয়। খলিফা মানসুরের নির্দেশে নবী বংশের লোকদের দলে দলে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরা হত। অন্ধকারাচ্ছান্ন জেলের মধ্যে তাঁদের উপর সম্পূর্ণ অমানবিক ভাবে অকথ্য নির্যাতন চালানো হত। নির্যাতনের মাধ্যমে তিলে তিলে তাঁদের হত্যা করা হত্য। তাঁদের অনেকের শিরোচ্ছেদও করা হত। তাঁদের বহুজনকে আবার জীবন্- কবর দেয় হত। তাঁদের অনেকের দেহের উপর দেয়াল ও অট্টালিকা নির্মাণ করা হত।
খলিফা মানসুর হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে মদীনা ত্যাগ করে তার কাছে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ জারী করে। অবশ্য হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ইতি পুর্বে একবার আববাসীয় খলিফা সাফ্‌ফাহ্‌র নির্দেশে তার দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। এ ছাড়াও তাঁর পিতার (পঞ্চম ইমাম) সাথে একবার উমাইয়া খলিফা হিশামের দরবারে তাঁকে উপস্থিত হতে হয়ে ছিল। খলিফা মানসুর বেশ কিছু কাল যাবৎ ষষ্ঠ ইমামকে কড়া পাহারার মাঝে নজর বন্দী করে রাখে। খলিফা মানসুর বহুবার ইমামকে হত্যার পরিকল্পনা করে ছিল। সে ইমামকে বহুবারই অপদস্থ করে ছিল। অবশেষে সে ইমামকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয় এবং ইমাম মদীনায় ফিরে যান। ইমাম তাঁর জীবনের বাকী সময় টুকু অত্যন্ত কঠিন ‘তাকীয়ার’ মাঝে অতিবাহিত করেন। তখন থেকে তিনি স্বেচ্ছায় গণসংযোগ বিহীন ঘরকুণো জীবন যাপন করতে শুরু করেন। এর পর খলিফা মানসুরের ষড়যন্ত্রে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ইমামকে শহীদ করা হয়।
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর দশজন সন্তান ছিলেন। তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল ইসমাইল (রহ.)। হযরত ইমাম তাঁকে খুবই ভালবাসতেন। এ কারণে ইমামের অনুসারীদের অনেকের মধ্যেই এ ধারণা গড়ে ওঠে যে, হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ওফাতের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইলই আহলে বাইতের ইমামের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হবেন। কিন্তু হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জীবদ্দশায়ই ইসমাইল (রহ.) ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে দাফন করা হয় এতদ্‌সত্বেও হযরত ইমামের অনুসারীদের মধ্যে থেকে কতক লোক ইসমাইল (রহ.)-এর প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি ও ভালোবাসার কারণে মনে করতেন যে, ইসমাইল (রহ.) ইন্তেকাল করেন নি, বরং তিনি আত্মগোপন করে আছেন। হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ওফাতের পরে এ ধারণা পোষণকারীরা ইসমাইল (রহ.)-কে তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত ও আহলে বাইতের সপ্তম ইমাম হিসাবে মনে করতে থাকে। এ ধারণার ভিত্তিতেই ইসমালিয়া মাজহাবের উদ্ভব ঘটে, আজো মুসলিম উম্মাহর কোন কোন অংশে যাঁর কিছু অনুসারী দেখা যায়। অন্যদিকে পূর্ববর্তী মাসুম ইমামগণের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর ওফাতকালে তাঁর অপর জীবিত পুত্র হযরত মুসা আল্‌কাজেম (আ.) তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও আহলে বাইতের ধারাবাহিকতায় মুসলিম উম্মাহর সপ্তম মা’সুম ইমাম পদে অধিষ্ঠিত হন।
ইমাম সাদিক (আ.) ৬৫ বছর বয়সে ১৪৮ হিজরীতে শাহাদত বরণ করেন। তাকে জান্নাতুল বাক্বীতে অবস্থিত তাঁর পিতা ও পিতামহের মাজারের নিকট সমাধিস্থ করা হয়। হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বেশীর ভাগ অনুসারীই তাঁর অনুসরণ করেন। এ ধারাবাহিকতায় শিয়াগণ ‘শিয়া ইসনা আশারিয়া’ বা ‘বার ইমামের অনুসারী শিয়া’ বা ‘ইমামিয়া শিয়া’ নামে পরিচিত ।