সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১৩১-১৩৫ পর্ব-২৪ 

সূরা ত্বোয়া-হা'র ১৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন: وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى (131) “(হে রাসূল) আমি অবিশ

সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১৩১-১৩৫ (পর্ব-২৪)
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى (131)
“(হে রাসূল) আমি অবিশ্বাসীদের কিছুকে তাদের পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনও লক্ষ্য কর না, তোমার প্রতিপালকের উপজীবিকাই উত্‌কৃষ্টতর ও চিরস্থায়ী।”(২০:১৩১)
আগের পর্বে আল্লাহপাক কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণের মোকাবিলায় বিশ্বনবীকে ধৈর্যধারণ করতে বলেছেন। আর এ আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূলে আকরাম (সা.)কে উদ্দেশ করে অন্যের ধন-সম্পদের দিকে দৃষ্টি না দেয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন তা আসলে সব মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ বলছেন :কাফের মুশরিকদের অঢেল ধন-সম্পদ দু'দিনের পৃথিবীতে বড়াই করার উপকরণ মাত্র। সতর্ক থেকো, এসব সম্পদ যেন তোমাদের চোখে দৃষ্টিনন্দন না হয়। সম্পদের চাকচিক্য দেখে তোমাদের কাছে যে মহামূল্যবান সম্পদ অর্থাত্‌ আল্লাহর প্রতি ঈমান আছে তা যেন তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন না হয়ে যায়।
এ ছাড়া, কাফেরদের যা কিছু দিয়েছি তা চিরস্থায়ী নয়। বসন্তের কোকিলের মত এসব সম্পদ একদিন হারিয়ে যাবে এবং এর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সম্পদ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য দেয়া হয়েছে এবং এগুলোর প্রত্যেকটি কোন কোন পথে ব্যয় হয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. সম্পদের দিকে ঝোঁক-প্রবনতা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তবে অন্যান্য সহজাত প্রবৃত্তির মতো এটিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং দুনিয়ার চাকচিক্যে আখেরাতকে ভুলে গেলে চলবে না।
২. আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অপরের সম্পদ দেখে মন খারাপ করা বা ঈর্ষাপরায়ণ হওয়া যাবে না।
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى (132)
“তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাজের আদেশ দাও এবং (নিজেও) তাতে অবিচলিত থাকো; আমি তোমার কাছে কোনো জীবনোপকরণ চাই না, (বরং) আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দেই এবং পরহেজগারদের পরিণতি শুভ।”(২০:১৩২)
এই আয়াতে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ ছিন্ন করতে এবং চিরস্থায়ী আবাস আখেরাতের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে: আপনি নিজে গুরুত্ব ও গভীর মনযোগ দিয়ে নামাজ পড়ুন এবং আপনার পরিবারকেও সব সময় নামাজ পড়ার নির্দেশ দিন। নিঃসন্দেহে প্রতিটি মুমিন বান্দার দায়িত্ব রাসুলে আকরাম (সা.)এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।
আয়াতের পরবর্তী অংশে একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন করেন, আমাদের নামাজে আল্লাহর কী প্রয়োজন এবং কেন তিনি নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন? এর উত্তরে আল্লাহ বলছেন, তোমাদের কাছেই তো আমার কোনো প্রয়োজন নেই, তোমাদের নামাজ তো আরো পরের কথা। বরং আমার কাছেই তোমাদের সব প্রয়োজন। পৃথিবীর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রতি যাতে তোমাদের আকর্ষণ তৈরি না হয় সেজন্য দিনে কয়েকবার নামাজের নির্দেশ দিয়েছি। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের চিরস্থায়ী আবাসের কথা স্মরণ কর এবং সেই আবাসে সুখে থাকার জন্য এই পৃথিবীতে কঠোর পরিশ্রম কর।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পরিবারের কর্তাব্যক্তির। শুধুমাত্র তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন যথেষ্ট নয়।
২. সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শুরু হয় পরিবার থেকে, স্কুলে নয়।
৩. আমরা ইবাদত করি বা না করি তাতে আল্লাহর কিছু এসে যায় না। ইবাদতের লাভ আমরাই একদিন ভোগ করব।
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَقَالُوا لَوْلَا يَأْتِينَا بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى (133)
“মুশরিকরা বলে- সে তার প্রতিপালকের কাছ থেকে আমাদের কাছে কোনো নিদর্শন আনে না কেন? তাদের কাছে কি প্রকাশ্য প্রমাণ (বা কুরআন) উপস্থিত হয়নি-যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে আছে? (২০:১৩৩)
মক্কার মুশরিকরা পবিত্র কুরআনকে আল্লাহর নবীর মুজিযা হিসেবে মেনে নিতে চায়নি। তারা অজুহাত সৃষ্টি করে বলতে থাকে : আগের নবী-রাসূলদের মতো কেন তুমি কোনো মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দেখাও না? তারা এমন সময় অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে চায় যখন অতীতের নবী-রাসূলদের মুজিযা তাদের উম্মতরা জাদুমন্ত্র বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। মুশরিকদের চাহিদা ছিল এই যে, তারা যা চাইবে বিশ্বনবী (সা.) তাই তাদেরকে করে দেখাবেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, নবী-রাসূলরা আল্লাহর নির্দেশে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন, মানুষের ইচ্ছায় নয়। মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন শুরু করলে প্রতিটি মানুষকে ঈমানের পথে আনার জন্য মুজিযা দেখিয়েই যেতে হতো নবী-রাসূলদের। এর ফলে অন্য কোনো কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না এবং সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতো।
মহান আল্লাহ মুশরিকদের এ কথার জবাবে বলেন : এরা কেন মুজিযা দেখতে চায়? পবিত্র কুরআনে অতীত জাতিগুলোর যে ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, মুজিযা হিসেবে তা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়?
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. দাম্ভিক ও একগুঁয়ে ব্যক্তি সুস্পষ্ট প্রমাণ স্বীকার করে না, বরং নিজের কথায় অটল থাকার জন্য অনর্থক নানা টালবাহানা করতে থাকে।
২. মুজিযার ধরন কী- তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মানুষের সামনে যখন প্রমাণিত হয় কাজটি আল্লাহ করেছে এবং কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়, তখনই তা মেনে নিয়ে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করা উচিত। মক্কার কাফেররা কুরআনের মতো মুজিযা দেখেও ঈমান আনেনি, তারা হযরত মুসা (আ.)এর লাঠির মতো কোনো অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, মুসার অলৌকিক লাঠি দেখেও ফেরাউন ও তার অনুসারী ঈমান আনেনি।
সূরা ত্বোয়া-হা'র শেষ দু'টি আয়াত অর্থাত ১৩৪ ও ১৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُمْ بِعَذَابٍ مِنْ قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آَيَاتِكَ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَذِلَّ وَنَخْزَى (134) قُلْ كُلٌّ مُتَرَبِّصٌ فَتَرَبَّصُوا فَسَتَعْلَمُونَ مَنْ أَصْحَابُ الصِّرَاطِ السَّوِيِّ وَمَنِ اهْتَدَى (135)
“যদি আমি (রাসূলের আগমন ও কুরআন নাজিলের) আগেই শাস্তি দিয়ে ওদের ধ্বংস করতাম, তাহলে ওরা বলতো, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠালে না কেন? পাঠালে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার আগেই তোমার নিদর্শন মেনে নিতাম।”(২০:১৩৪)
“বল, প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর, এরপর তোমরা জানতে পারবে- কারা সরল পথে আছে এবং কারা সত্‌পথ অবলম্বন করেছে।” (২০:১৩৫)
এ দুই আয়াতে মুশরিকদের আরেকটি অজুহাত সৃষ্টির প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে : আল্লাহ যদি কাফেরদেরকে তাদের পাপকাজের জন্য এ পৃথিবীতেই ধ্বংস করে দিতেন তাহলে তারা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাতো, কেন তাদের কাছে নবী না পাঠিয়ে এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন না করেই ধ্বংস করা হল? নবী পাঠালে হয়তো আমরা তার প্রতি ঈমান আনতাম। মহান আল্লাহ জানেন যে, তারা কোনোদিনই ঈমান আনবে না, বরং এগুলো তাদের অজুহাত মাত্র। এ কারণেই তাদের কাছে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)কে পাঠানো হল তখন তারা আল্লাহর একত্ববাদকে অস্বীকার করে প্রতিদিন নিত্যনতুন অজুহাত সৃষ্টি করতে লাগল। এরপর মহান আল্লাহ বিশ্বনবীকে নির্দেশ দেন, অহংকারী ও গোঁয়ার কাফেরদের উদ্দেশে এ কথা বলতে যে, আমরা সবাই শেষ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছি। আল্লাহ কাফেরদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর ইসলামের বিজয়ের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমি তা বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষা করছি। আর তোমরাও অপেক্ষা করতে থাকো, দেখো আমাদের ধ্বংস হয় কিনা।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে, খুব শিগগিরই প্রমাণিত হবে, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কে সঠিক পথে রয়েছে। এ আয়াতের মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ মুসলমানদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের সুসংবাদ দিতে চেয়েছেন। বিশ্বনবী (সা.) কাফেরদের ষড়যন্ত্রের কারণে যে মক্কা থেকে রাতের অন্ধকারে হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই মক্কায় তিনি ফিরে এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে। সেদিন মক্কার কাফেররা সামান্যতম প্রতিরোধের সাহস করেনি এবং সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় হয়েছিল।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. মানুষ যাতে আল্লাহর দরবারে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে না পারে সেজন্য নিজ দায়িত্ব সম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।
২. ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং এটি মুসলমানদের সহজ-সরল পথের সন্ধান দেয়।
(সূরা ত্বোয়াহা সমাপ্ত)

সূত্রঃ সূত্রঃ ইরান বাংলা রেডিও