সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১১৫-১২০ পর্ব-২১ 

সূরা ত্বোয়া-হা'র ১১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন- وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آَدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا (115) "আমি এর আগে আদমের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম (যাতে সে শয়তানের ধোঁকায় না পড়ে) কিন্তু সে তা ভুলে যায়। তাকে

সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১১৫-১২০ (পর্ব-২১)
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آَدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا (115)
"আমি এর আগে আদমের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম (যাতে সে শয়তানের ধোঁকায় না পড়ে) কিন্তু সে তা ভুলে যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি পালনে দৃঢ়সংকল্প পাইনি।" (২০:১১৫)
সূরা ত্বোয়া-হা'র এর আগের আয়াত পর্যন্ত বেশিরভাগ জায়গায় হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইল জাতির ইতিহাস এবং অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের সঙ্গে তাদের সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে। এ আয়াত থেকে সূরার বাকি অংশে আদি পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া এবং তাদের প্রতি শয়তানের কুমন্ত্রণার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানে বলা হয়েছে, হযরত আদম ও হাওয়া বেহেশতের মতো একটি মনোরম ও সুখময় বাগিচায় বসবাস করতেন। সেখানে সুখ-শান্তিতে বসবাসের জন্য তাদের দেয়া হয়েছিল সব রকম উপকরণ। সে সময় তাদের জন্য আল্লাহর ইবাদত বাধ্যতামূলক না থাকলেও আল্লাহ তার নিয়ামতের ভাণ্ডার তাদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন। তবে তাদের জন্য যে বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল তা হলো, আল্লাহ একটি গাছ নির্দিষ্ট করে দিয়ে তাদের বলেছিলেন, তারা যেন গাছটির কাছে যাওয়া বা তার ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। শয়তান যে তাদের কুমন্ত্রণা দিতে পারে সে ব্যাপারেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন আল্লাহ-তায়ালা। কিন্তু তারা আল্লাহর সে সতর্কবাণীকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সেই গাছের ফল খেয়ে বেহেশত থেকে বহিস্কৃত হন।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল:
১. সত্য ও সরল পথে অটল থাকার দৃঢ় প্রত্যয় না থাকলে আল্লাহর ক্রোধের শিকার হতে হয়।
২. মানুষ যেন নিজের মানবীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখে সেজন্য আল্লাহ তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই এই মর্যাদা রক্ষা করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী নয়।
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১১৬ ও ১১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى (116) فَقُلْنَا يَا آَدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى (117)
"যখন ফেরেশতাদের সিজদা করতে বললাম, তখন শয়তান ছাড়া আর সবাই সিজদা করল এবং শয়তান বিরত থাকল।" (২০:১১৬)
"সুতরাং (আমি আদমকে) বললাম : হে আদম! নিশ্চয়ই শয়তান তুমি ও তোমার সহধর্মিনীর শত্রু। (সতর্ক থেকো) সে যেন তোমাদের জান্নাত থেকে বের করে না দেয়, (তাহলে কিন্তু) তোমরা অতি কষ্ট ও দুর্দশার মধ্যে পড়বে।" (২০:১১৭)
আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের তুলনায় তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ফেরেশতাদের নির্দেশ দেন আদমকে বিনয়াবনত চিত্তে সিজদা করার। জিন জাতি থেকে উঠে আসা ইবলিস আল্লাহর পরম ইবাদতের মাধ্যমে ফেরেশতাদের সমমর্যাদা অর্জন করেছিল। আল্লাহর ওই নির্দেশ তার জন্যও প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করে।
আল্লাহ এভাবে মানুষ সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে তাকে ইবলিসের শত্রুতা সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। তিনি বুঝিয়ে দেন, শয়তানের কথায় চললে মানুষকে চরম অপমানিত ও ধিকৃত হতে হবে। শয়তান সব সময় মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।
এ দুই আয়াতের দু'টি শিক্ষণীয় বিষয় হল:
১. সৃষ্টিজগতের সব কিছুর চেয়ে এমনকি ফেরেশতা ও জিনের চেয়েও মানুষ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ দয়া করে মানুষকে এ মর্যাদা দিয়েছেন।
২. মানুষের সঙ্গে শয়তানের শত্রুতা- সৃষ্টির শুরু থেকে ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চলতে থাকবে।
সূরা ত্বোয়া-হা'র ১১৮ ও ১১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى (118) وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى (119)
“নিশ্চয়ই তোমরা বেহেশতে ক্ষুধার্থ হবে না এবং নগ্নও থাকবে না।" (২০:১১৮)
" সেখানে তোমরা তৃষ্ণার্ত হবে না এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না।” (২০:১১৯)
সৃষ্টির শুরুতে মহান আল্লাহ আদম ও তার সহধর্মিনীর জন্য যে স্থান নির্ধারণ করেছিলেন তার বর্ণনা এ আয়াতগুলোতে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই বাগিচা ছিল অফুরন্ত নেয়ামতে পরিপূর্ণ। কাজেই সেখানে তারা কখনো ক্ষুধার্থ হবে না এবং আবহাওয়াও এমন চমত্‌কার থাকবে যে সূর্যের তাপে তারা কষ্ট পাবে না। গরমের তাপ সহ্য করতে হবে না বলে সেখানে তারা তৃষ্ণার্তও হবে না। খাদ্য, পানি, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো সেখানে মেটানো হয়েছিল অঢেল উপকরণ দিয়ে। ফলে এ সব চাহিদা মেটানোর জন্য আদম ও হাওয়াকে কোনো ধরনের কষ্ট করতে হতো না।

এ দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. এ পৃথিবীর জীবন কষ্ট ও পরিশ্রমের। শয়তানকে অনুসরণ করার কারণে মানুষকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মতো কষ্টে ভুগতে হচ্ছে।
২. আল্লাহর নির্দেশ মেনে চললে মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট বা ভয় নেই।
এ সূরার ১২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آَدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى (120)
“এরপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল : হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা?” (২০:১২০)
আল্লাহ যে সম্পর্কে আদমকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হল। যে শয়তান তাকে সিজদা করতে রাজি হয়নি সেই শয়তান ভিন্ন আকৃতি ধারণ করে তার সামনে এল। মিষ্টি কথায় আদমকে ভুলিয়ে যে বিষয়টি সম্পর্কে আল্লাহ তাকে নিষেধ করেছিলেন সে বিষয়টিকে অতি আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরে। শয়তান আদমকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেয়। আদম অমরত্ব লাভ করতে চেয়েছিলেন বলে শয়তানের কুমন্ত্রণায় কান দেন। কারণ শয়তান আদমের মনের কথা জেনে গিয়েছিল বলে তাকে ঠিক সেই অমরত্ব লাভের লোভ দেখায়।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হল:
১. শয়তান মানুষকে কোনো খারাপ কাজে বাধ্য করতে পারে না, বরং কুমন্ত্রণা দিয়ে তাকে ওই কাজ করতে উস্কানি দিতে পারে।
২. মানুষের কুপ্রবৃত্তি হচ্ছে তাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য শয়তানের একমাত্র পথ। কাজেই কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করলে শয়তানের ধোঁকায় পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
সূত্রঃ সূত্রঃ ইরান বাংলা রেডিও