সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১৩-১৮ (পর্ব-৩)

সূরা ত্বোয়া-হা’র ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى (13) إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي (14) “(হে মুসা) আমি তোমাকে (রাসূল হিসেবে)

সূরা ত্বোয়া-হা; আয়াত ১৩-১৮ (পর্ব-৩)
সূরা ত্বোয়া-হা’র ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন:
وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى (13) إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي (14)
“(হে মুসা) আমি তোমাকে (রাসূল হিসেবে) মনোনীত করেছি, কাজেই যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে, তুমি তা মনোযোগ দিয়ে শোন।”(২০:১৩)
“আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। কাজেই আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম কর।” (২০:১৪)
আগের অনুষ্ঠানে আমরা বলেছি, হযরত মুসা (আ.) মাদায়েন থেকে মিশরে হিজরত করার পথে ‘ত্বোয়া’ উপত্যকার তুর পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার নজীরবিহীন সুযোগ লাভ করেছিলেন। এ আয়াতে বলা হচ্ছে, মহান আল্লাহ হযরত মুসাকে বলছেন, তোমাকে আমি রিসালাতের দায়িত্ব দিচ্ছি। এখন থেকে তোমার কাছে আমার পক্ষ থেকে ওহী আসবে। সে ওহী মনযোগ দিয়ে শুনবে এবং তা আত্মস্থ করবে। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না। সেইসঙ্গে সর্বোত্তম ইবাদত নামাজ আদায় করবে যাতে সারাক্ষণ আমার কথা তোমার মনে থাকে।
সাধারণ মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করা নবী-রাসূলদের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু আল্লাহ-তায়ালা নবী-রাসূলদেরকে সবার আগে তার ইবাদত করার নির্দেশ দেন যাতে সাধারণ মানুষ এ কথা মনে করতে না পারে যে, নবী-রাসূলরা শুধু দিক-নির্দেশনা দিতেই এসেছেন, ইবাদত বন্দেগি বা নামাজ আদায় করা তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। শুধুমাত্র নবী-রাসূল নন, সেইসঙ্গে যারাই ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে চান তাদের প্রত্যেককে সবার চেয়ে বেশি খোদাভীরু ও ইবাদতে সবার চেয়ে অগ্রগামী হতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ আল্লাহর বান্দা হওয়ার ক্ষেত্রে তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ধর্মের সবচেয়ে প্রধান ভিত্তি এবং সব ইবাদতের শীর্ষে নামাজের অবস্থান।
২. সব ঐশী ধর্মের অনুসারীদের সর্বপ্রথম যে ইবাদত করতে বলা হয়েছে তা হচ্ছে নামাজ।
৩. নামাজের বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গিগুলোই যথেষ্ট নয়, সেইসঙ্গে একাগ্রচিত্তে আল্লাহকে স্মরণ করা জরুরি। তাহলেই নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য সফল হবে।
সূরা ত্বোয়া-হা’র ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
) إِنَّ السَّاعَةَ آَتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى (15) فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لَا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى (16)
“(হে মুসা) কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি এর সংঘটন-মুহূর্ত গোপন রাখতে চাই, যাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করে।”(২০:১৫)
“কাজেই যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন তোমাকে সেদিনে (বা কিয়ামতে বিশ্বাস স্থাপনে) নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।” (২০:১৬)
আগের আয়াতে সব ঐশী ধর্মের মূল ভিত্তি একত্ববাদ ও নবুওয়াতের কথা বর্ণনার পর এই আয়াতে ধর্মের তৃতীয় মূল ভিত্তি কিয়ামতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিনটি সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ধারণা নেই। এমনকি নবী-রাসূলরাও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু জানতেন না। কিন্তু কিয়ামত যে হবেই তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সেদিন সৃষ্টির আদি থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত এ পৃথিবীতে আসা প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহী করতে হবে। কিয়ামত সম্পর্কে আল্লাহর এ নীতির সঙ্গে মানুষের মৃত্যুর অনেকাংশে মিল রয়েছে। মৃত্যুর দিনক্ষণ সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা নেই কিন্তু প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর সুধা পান করতে হবে। ধনী-গরীব, দুর্বল-শক্তিমান সবাইকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।
কিয়ামত সম্পর্কে এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, প্রতিটি মানুষকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারালয়ের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সেদিন নিজ নিজ আমলনামার ভিত্তিতে মানুষের বিচার করা হবে। আল্লাহর নেক বান্দারা জান্নাতে যাবেন এবং গোনাহগার বা পাপী বান্দাদেরকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, এ পৃথিবীতে মানুষের সব কৃতকর্মের শাস্তি বা পুরষ্কার দেয়া সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহর সৃষ্টি রহস্যের নিয়ম অনুযায়ী, মানুষকে তার কৃতকর্মের প্রকৃত শাস্তি বা পুরষ্কার দেয়ার দেয়ার জন্য এ পৃথিবী ধ্বংসের পর কিয়ামতের বিচার দিবসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, পৃথিবীর বহু মানুষ মৃত্যু পরবর্তী জীবনে কিয়ামতকে মেনে নিতে রাজী নয়। এসব অস্বীকারকারী নানা ধরনের প্রশ্ন ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে অন্যদেরকেও কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দিহান করে তুলতে চায়। কাজেই মু’মিন বান্দাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর প্রতি ঈমানের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সংশয় পোষণ করা চলবে না।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:
১. কিয়ামতের দিন-ক্ষণ সম্পর্কে মানুষের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই, কিন্তু কিয়ামত সংঘটিত হবেই।
২. কু-প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পন হচ্ছে কিয়ামতকে অস্বীকার করার প্রধান কারণ। যারা নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে খারাপ কাজ করতে দ্বিধা করে না এবং নিজেদেরকে সব ধরনের জবাবদিহীতার উর্ধ্বে মনে করে, তারাই প্রকৃতপক্ষে কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে।
৩. মু’মিনকে তার বিশ্বাসে অটল থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বাসে চিঁড় ধরার পরিণতি ভয়াবহ এবং তা মানুষকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
সূরা ত্বোয়া-হা’র ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
) وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَى (17) قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَى غَنَمِي وَلِيَ فِيهَا مَآَرِبُ أُخْرَى (18)
“হে মুসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?”(২০:১৭)
“সে বলল- এ আমার লাঠি, আমি এতে ভর দেই এবং আমি এটি দিয়ে আঘাত করে আমার মেষপালের জন্য গাছের পাতা ঝরাই এবং এটি আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।” (২০:১৮)
হযরত মুসা (আ.) রিসালাতের দায়িত্ব পাওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে একত্ববাদ ও কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করেন। এরপর মহান আল্লাহ তাঁকে একটি মুজিযা দান করার সিদ্ধান্ত নেন যা দিয়ে হযরত মুসা জনগণের মধ্যে নিজের নবুওয়াতের প্রমাণ তুলে ধরতে পারেন। তিনি মুসাকে তার হাতের লাঠিকে বিশেষ ক্ষমতা দান করতে চান। এ কারণে তিনি হযরত মুসাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার হাতে ওটা কি এবং এটি তোমার কি কাজে আসে? এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ মুসার হাতের লাঠির কাজ সম্পর্কে জানতেন না, বরং এ প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি লাঠিটিকে মুজিযার হাতিয়ারে পরিণত করার আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিলেন। হযরত মুসা আল্লাহর প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তার লাঠির স্বাভাবিক কাজগুলো বর্ণনা করতে থাকেন। তিনি বলেন, এ লাঠি তিনি ভর দেয়ার কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি পশুর জন্য গাছের পাতা পেরে আনার কাজেও ব্যবহার করেন।
লাঠিটিকে বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা দেয়ার পর কী হলো তা আমরা বর্ণনা করব কুরআনের আলোর পরবর্তী অনুষ্ঠানগুলোতে।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. মেষ চড়ানো ছিল বেশির ভাগ নবী-রাসূলের পেশা। আল্লাহ তাদেরকে এই কঠিন দায়িত্বে অভ্যস্ত করেছিলেন এ কারণে যে, পরবর্তীতে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে তাদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়।
২. মহান আল্লাহ নিজের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য হাতের লাঠির মতো সামান্য জিনিসও ব্যবহার করেছেন।
সূত্রঃ সূত্রঃ ইরান বাংলা রেডিও