আতিথ্যের মাস-রমজান : (দ্বিতীয়- পর্ব)

আতিথ্যের মাস-রমজান : (দ্বিতীয়- পর্ব)

আতিথ্যের মাস-রমজান : (দ্বিতীয়- পর্ব)


রমযান মাস হলো আল্লাহর রহমত ও দয়ার হিমেল বায়ুপ্রবাহের মাস। মানুষের মন এবং আত্মার ওপর দিয়ে বিশেষ করে যাঁরা আল্লাহর রহমতের কাঙ্গাল তাদেঁর দেহ-মন-আত্মার উপর দিয়েই রহমতের এ বায়ু প্রবাহিত হয়। এখন মানুষ কতোটা ধারণ করবে বা করতে চেষ্টা চালানো উচিত তা নির্ভর করছে বরকতপূর্ণ এই মাসের মর্যাদা কে কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে-তার ওপর। আল্লাহ আমাদেরকে এই মহান মাসটির মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার তৌফিক দিন-এই কামনায় শুরু করছি রহমতের অতিথির আজকের আয়োজন।

রাসুলে খোদার একটি হাদিস দিয়ে শুরু করবো আজকের আলোচনা। রাসূল ( সা ) বলেছেন,"তুমি যদি চাও তোমার বুকের ভেতরের অশান্তি কমে যাক তাহলে রমযানের রোযা এবং প্রতিমাসে তিনটি করে রোযা রাখো।"হযরত আলী ( আ ) ও বলেছেন,"প্রতিমাসে তিনটি রোযা এবং রমযান মাসের রোযা বুকের ভেতরকার জটিলতা এবং পেরেশানীগুলো দূর করে দেয়।" প্রতিমাসের রোযার দিনগুলোরও উল্লেখ করেছেন তিনি। দিনগুলো হলো মাসের প্রথম এবং শেষ বৃহস্পতিবার এবং মাসের মধ্যবর্তী বুধবার। দেহ এবং আত্মার ওপরে এই যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে-এটাও রোযার অন্যতম একটা ফযীলত,বড়ো ধরনের বৈশিষ্ট্য।

আসলে রমযানের এই বাহ্যিক উপকারিতার কথা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। এ বিষয়টি এখন সর্বজনগ্রাহ্য একটি বাস্তবতা। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্যে এই বিধানটি দিয়েছেন,ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত থাকবে-তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। কী কী বাহ্যিক কল্যাণ রয়েছে রোযার মধ্যে-সেসব আবিষ্কারের বিষয়। আবিষ্কৃত হলে ভালো,আর আবিষ্কৃত না হলে বিশ্বাসে কোনোরকম কমতি হওয়াটা দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। আমরা তাই সেদিকে না গিয়ে রোযার আধ্যাত্মিকতার দিকেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো।

রমযান মাসে আল্লাহর রহমতের দ্বার অবারিত হয়ে যায়। রহমত মানে আল্লাহর অনুগ্রহ। অনুগ্রহ ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। আল্লাহ আমাদের যতো কাজের যোগ্যতা দিয়েছেন,শারীরিক সুস্থতা দিয়েছেন,ভাববার মতো চেতনা দিয়েছেন,উদ্ভাবন করার শক্তি দিয়েছেন,কথা বলা,কাজ করা,চিন্তা-ভাবনা করার সামর্থ দিয়েছেন,মেধা দিয়েছেন মনন দিয়েছেন,আত্মা দিয়েছেন,সেগুলোকে ব্যবহার করে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদায় উন্নীত হবার সুযোগ দিয়েছেন-এ সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। আবার অনুগ্রহ মানে ক্ষমা। এগারো মাসব্যাপী যতোরকম অন্যায়-অমূলক-অসঙ্গত আর অসমীচীন কাজ করে আল্লাহর দরবারে আসামী হয়েছি,সেই আসামীকে আল্লাহ যে মাফ করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন-এটা তো বিশাল এক অনুগ্রহ। আর সেই মাফ করে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটবে এই রমযান মাসে।

এ জন্যেই রোযাকে বলা হয়েছে জুন্নাহ বা ঢালস্বরূপ। কারণ রোযার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দারা দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পায়,মুক্তিও পায়। রাসূলে খোদা বলেছেন এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দান করেন। তাহলে রোযা যেমন জাহান্নামে যাবার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে,তেমনি জাহান্নামে যাবার পরও সেখান থেকে মুক্তি লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। আল্লাহর এতো বড়ো রহমতের বিষয়টিকে যে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে-তারচেয়ে হতভাগ্য আর কে থাকতে পারে!আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে রমযানের তাৎপর্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন।

একটি হাদীসে এসেছে,রাসূল ( সা ) বলেছেন-রোযা এবং কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্যে সুপারিশ করবে। রোযা বলবে-হে রব!আমি তাকে পানাহার ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তুমি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করো।এটা যে কতো বিশাল প্রাপ্তি-তা কল্পনাই করা যায় না। কেননা আপনারা জানেন যে,কিয়ামতের দিন গুনাহগার বান্দারা আল্লাহর দরবারে তার জন্যে সুপারিশ করার লক্ষ্যে নবীরাসূলদের শরণাপন্ন হবে। কিন্তু তাদেঁর অনেকেই বিনয়বশত কিংবা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে তুচ্ছ বলে প্রমাণ করার জন্যে কারো পক্ষে সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন। কঠিন সেই মুহূর্তে রোযা এবং কোরআন যদি সুপারিশ করার জন্যে এগিয়ে আসে-সেটা যে কতো বড়ো প্রাপ্তি হবে তা একবার কল্পনা করে দেখুন তো। কিন্তু রোযা এবং কোরআন কখন আপনার জন্যে সুপারিশ করবে? যখন আপনি তাদের সুপারিশ পাবার যোগ্যতা অর্জন করবেন,তখন।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে,রমযান মাস আসলেই কেবল কোরআনের মাহাত্ম্য বা মর্যাদা নিয়ে আমরা কথা বলি,কিংবা কোরআন পাঠ বা চর্চা করি। বাকি মাসগুলোতে কোরআনকে ভুলে যাই।আর রমযান আসলে আমরা নিজেদেরকে সংযত রাখার চেষ্টা করি,রমযান চলে গেলেই আমরা পুনরায় উদ্ধত হয়ে পড়ি।ফলে এগারো মাস কাউকে ভুলে থেকে একটিমাত্র মাসে তার সেবা খেদমত করলে সে যে কতোটা তুষ্ট হবে-তা কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়। তবুও চেষ্টা করতে হবে রমযানের মাসটিকে সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিয়ে সর্বাধিক অর্জন করার এবং রমযানের সময়কার ইবাদাত চর্চাকে অন্যান্য মাসেও অব্যাহত রাখার। তবে রমযান মাসকে যেহেতু আল্লাহ নিজের বলে ঘোষণা দিয়েছেন,সেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এ মাসকে যথার্থভাবে কাজ লাগাতে হবে। আল্লাহ যেহেতু রাহমান এবং রাহীম,সেহেতু তিনি সন্তুষ্ট হলে তাঁর রহমতের বারি দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে আপনার জন্যে নিভিয়ে দিলেও দিতে পারেন। এই সুযোগটাও কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট একটা রহমত।

আমাদের মাঝে নববর্ষ সংস্কৃতির একটা প্রচলন আছে। সাধারণত মনে করা হয় যে বছরের শুরুটা যেভাবে আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়,বাকি মাসগুলোতে তার প্রভাব পড়ে। এটা একান্তই লোকবিশ্বাস। এর সাথে দ্বীন বা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই বিশ্বাসটাকে ইতিবাচক অর্থে ধরে নিয়ে বলা যায় ইবাদাতের জন্যে,আত্মশুদ্ধির জন্যে,পরকালীন মুক্তির জন্যে রমযান হলো আধ্যাত্মিকতা চর্চার নববর্ষ। তাই রমযান মাসটিকে আমরা যেভাবে ইবাদাত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে কাটাই,সেভাবে রমযানকে ইবাদাত বর্ষের সূচনা বলে ধরে নিয়ে যেন বাকি মাসগুলোতে রমযানের কর্মসূচিগুলোকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন নিঃসন্দেহে মুমিনরা পরস্পরে ভাই-ভাই। সুতরাং তোমাদের ভাইদের মধ্যে তোমরা শান্তিস্থাপন করবে। আর তোমরা পরহেজগার হবে অর্থাৎ আল্লাহকে ভয়-ভক্তি করবে,যাতে আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর রহমত বা অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এই পরিবেশটা কেবলমাত্র রমযান মাসেই কিছুটা অনুভব করা যায়। বলাবাহুল্য,পৃথিবী জুড়ে বর্তমানে যতো অরাজকতা আর জুলুম-নির্যাতন দেখা যাচ্ছে,তার মূলে রয়েছে মানুষের সাথে মানুষের ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের অভাব। তাই রমযান মাসের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশটাকে যদি সারা বছর ধরে বজায় রাখা যায়,তাহলে পৃথিবীটা হয়ে উঠবে ইহজাগতিক বেহেশত। রমযান এদিকে থেকেও আল্লাহর বান্দাদের জন্যে তাঁর এক অসাধারণ রহমত বা অনুগ্রহ।
সূত্রঃ ইরান বাংলা রেডিও