ওহাবি মতবাদঃ ১৯তম পর্ব

ওহাবি মতবাদঃ ১৯তম পর্ব

ওহাবি মতবাদঃ ১৯তম পর্ব
ওহাবিদের যুক্তি হলো কোরআনে বলা হয়েছেঃ 'যেসব মৃতদেহ কবরে শায়িত হয় তাদের উপলব্ধি ক্ষমতা থাকে না এবং রুহ বা আত্মা যে দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় ঐ দেহের আর বোধশক্তি থাকে না।' আবার কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহর মনোনীত নবী রাসূল, অলি আওলিয়াদের আত্মা মৃত নয়,বারযাখ বিশ্বে তাঁদের আত্মা জীবন্ত। তাদেঁর কাছেই শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, কবরে শায়িত নিষ্প্রাণ কোনো সাধারণ লাশের কাছে নয়। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী পবিত্র আত্মাগুলো অন্য জগতে জীবন্ত থাকে এবং বেহেশতি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে,ফলে সাধারণ আত্মার মতো সেইসব আত্মারও যে উপলব্ধি শক্তি থাকবে না এ যুক্তি ঠিক নয়।
সহিহ বোখারিতে বদর যুদ্ধের গল্প প্রসঙ্গে এসেছেঃ ঐ যুদ্ধে কাফেরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হবার পর নবী করিম (সা) তাঁর একদল সাহাবিকে নিয়ে একটি পুকুরের পাড়ে এলেন যেখানে মৃত মুশরিকদের লাশগুলোকে ফেলা হয়েছিল। নবীজী মৃতদের নাম ধরে ধরে ডাকলেন এবং বললেনঃ 'আল্লাহ এবং তার রাসুলের আনুগত্য করাটাই কি তোমাদের জন্যে উত্তম ছিল না? আমরা খোদার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে পেয়েছি, তোমরা কি তোমাদের খোদার অর্থাৎ মূর্তিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পেয়েছো?' নবীজীর কথার এ পর্যায়ে ওমর বললেনঃ 'হে রাসূলে খোদা (সা)! আপনি এক কারো সাথে কথা বলছেন যাদের প্রাণ নেই।' নবীজী উত্তরে বললেনঃ যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ সমর্পিত তাঁর শপথ! আমি যা বলছি তাদের চেয়ে তুমি তা বেশি শ্রবণকারী নও।'
একইভাবে নির্ভরযোগ্য আরো বহু বর্ণনায় এসেছে যে,নবীজীকে গোসল করানো এবং কাফন পরানোর কাজ শেষ করে হযরত আলী(আ) নবীজীর চেহারা মুবারককে খুলে তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ হে রাসূলে খোদা (সা)! আমার বাবা-মা আপনার জন্যে উৎসর্গিত! আপনি জীবিত এবং মৃত উভয় অবস্থাতেই পূত-পবিত্র! আপনার পরোয়ারদেগারের কাছে আমাদের কথা স্মরণ করুন! আরবি সাহিত্যে উজকুর্নি ইন্দা রাব্বিক বলতে শাফায়াত করা অর্থ বোঝায়। হযরত ইউসূফ (আ) কারাগারে কাটানোর সময় তাঁর সাথে থাকা একদল বন্দির কারামুক্তির পর তারা যখন বাদশার দরবারে ফিরে যাচ্ছিল তখন বলেছিলেনঃ উজকুর্নি ইন্দা রাব্বাক অর্থাৎ বাদশার কাছে আমার কথা স্মরণ করো!হযরত আবু বকর সম্পর্কেও শাফায়াত কামনা সংক্রান্ত একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়ঃ রাসূলে খোদা (সা) এর রেহলাতের পর তিনি নবীজীর চেহারা মুবারক উন্মোচন করে হযরত আলী (আ) এর মতোই বলেছিলেনঃ হে রাসূলে খোদা (সা)! আমার বাবা-মা আপনার জন্যে উৎসর্গিত!আপনি জীবিত এবং মৃত উভয় অবস্থাতেই ছিলেন পূত-পবিত্র! আপনার পরোয়ারদেগারের কাছে আমাদের কথা স্মরণ করুন!
সালাফিয়ারা যেহেতু মানুষের আত্মার দেহবিচ্ছিন্ন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না কিংবা মৃত্যুর পর আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করে না, সেহেতু তারা মনে করে নবী-রাসূলগণ কিংবা আল্লাহর অলি আওলিয়া আর পুণ্যবান বান্দাদের আত্মাও মৃত্যুর পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেজন্যে তাদের ধারণা যে বস্তুর কোনো অস্তিত্বই নেই তার কাছে শাফায়াতের আবেদন করার কোনো মানেই হয় না, তাই তাদের কাছে শাফায়াতের আবেদন করাটা বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী কাজ। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে মৃত্যু পরবর্তী আত্মা বা রূহের বেঁচে থাকা সম্পর্কে বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও সালাফিয়া মতবাদে বিশ্বাসীরা এ ধরনের চিন্তাভাবনা নিজেদের মাঝে লালন করছে।
আলেম ওলামাগণ শাফায়াতের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এবং তাঁরা ইবনে তাইমিয়া কিংবা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের বক্তব্যকে ইসলামী দ্বীনের বিরোধী বলে মনে করেন। এ বক্তব্যের পক্ষে আমরা কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করবো। খলিল আহমাদ সাহারানপুরি হানাফি ( জন্ম:১৩৪৬ হিঃ) বলেছেনঃ "দোয়ার সময় নবী-রাসূলগণ, নেককার সালেহিনগণ, অলি আওলিয়াগণ, শহিদগণ কিংবা সিদ্দিকীনদের শরণাপন্ন হওয়া বা শাফায়াতের জন্যে তাদেঁর সহায়তা নেওয়া আমাদের এবং আমাদের আলেম সমাজের দৃষ্টিতে জায়েয, চাই তাঁরা জীবিতই থাকুন কিংবা মৃত-তাতে কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ যে দোয়ার মাঝে বা মুনাজাতে বলে: হে খোদা! অমুকের ওসিলায় তুমি আমার দোয়াটুকু কবুল করে নাও! আমার চাহিদা পূরণ করো-তাতে দোষের কিছু নেই।"
আরেকজন বিখ্যাত মনীষী হলেন বায়হাকি। তিনি বর্ণনা করেন: দ্বিতীয় খলিফার খেলাফতের সময় এক বছর খুব খরা গিয়েছিল। সে সময় হযরত বেলাল কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলে খোদা (সা) এর রওজা মোবারকে গিয়ে বললেনঃ "হে রাসূলে খোদা (সা)! তোমার রবের কাছে তোমার উম্মাতের জন্যে বৃষ্টি চাও...নৈলে ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে।" নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট ইসলামী মনীষী আলী ইবনে আহমাদ সামহুদি তাঁর লেখা ভাফাউল ভাফা গ্রন্থে লিখেছেনঃ "আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করা বা শাফায়াতের আবেদন করার জন্যে রাসূলে খোদার শরণাপন্ন হওয়া,তাঁর সুমহান ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আশ্রয় নেওয়া তাঁর জন্ম-পূর্ববর্তীকাল, জন্ম-পরবর্তীকাল,তাঁর মৃত্যুর পর, আলমে বারজাখের সময় এবং পুনরুত্থান দিন-সবসময়ই জায়েয।"
এরপর হযরত আদম (আ) এর তাওয়াসসুল বা ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শরণাপন্ন হবার বিখ্যাত বর্ণনাটিও উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক ঐ বর্ণনাটি এসেছে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) থেকে। হযরত ওমর (রা) বলেছেনঃ হযরত আদম (আ) অবহিত হয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ইসলামের নবী (সা) পৃথিবীতে আসবেন, তিনি তাই আল্লাহর দরবারে আরজি পেশ করলেন এভাবেঃ "হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা) এর ওসিলায় তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।" ইসলামে শাফায়াতের বিষয়টি আল্লাহর সাথেই সম্পর্কিত তবে আল্লাহর অনুমতিক্রমে অন্যান্যরাও শাফায়াতের আবেদন করতে পারেন। সূরা মারিয়ামের ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "যে দয়াময় আল্লাহ্র কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ করার অধিকারী হবে না।" একইভাবে সূরা ত্বা-হা'র ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "দয়াময় আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তূষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।"
এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহ কেন তাঁর কোনো কোনো আওলিয়াকে শাফায়াতের অনুমতি দিলেন? এর উত্তর হলো মানুষের মাঝে তাদেঁরকে মর্যাদাবান হিসেবে তুলে ধরা। নবীজী বলেছেনঃ "তিনিটি দল আল্লাহর কাছে শাফায়াত করবে। নবীগণ, আলেমগণ এবং শহীদগণ।" তবে সেইসব পাপীই আওলিয়াদের শাফায়াতের আশা করতে পারে যারা নিজেদের গুনাহর কারণে অনুতপ্ত হয়ে যথার্থই তওবা করে এবং তারপর নবী-রাসূলদের প্রদর্শিত পথে ঠিকঠাকমতো চলে।
সূত্রঃ ইন্টারনেট