ওহাবি মতবাদঃ ১৮তম পর্ব

ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীগণ শাফায়াতের আবেদন করাটাকে শির্‌ক বলে মনে করেন। কিন্তু বিখ্যাত হাদিসবিদ বোখারি এবং তিরমিযি তাঁদের সংকলিত হাদিস গ্রন্থে শাফায়াত সম্পর্কে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছেন সেখানে শাফায়াতের পক্ষে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেমন তিরমিযি আনাস ইবনে মা

ওহাবি মতবাদঃ ১৮তম পর্ব
ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীগণ শাফায়াতের আবেদন করাটাকে শির্‌ক বলে মনে করেন। কিন্তু বিখ্যাত হাদিসবিদ বোখারি এবং তিরমিযি তাঁদের সংকলিত হাদিস গ্রন্থে শাফায়াত সম্পর্কে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছেন সেখানে শাফায়াতের পক্ষে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেমন তিরমিযি আনাস ইবনে মালিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। আনাস ইবনে মালিক বলেনঃ নবীজীর কাছে আবেদন জানিয়েছি কিয়ামতের দিন তিনি যেন আমার জন্যে শাফায়াত করেন। তিনি আমার আবেদন গ্রহণ করে বললেনঃ 'আমি এ কাজটি আঞ্জাম দেবো।' নবীজীকে বললামঃ 'আপনাকে কোথায় খুজেঁ পাবো?' নবীজী বললেনঃ 'পুলসিরাতের কাছে।' এ বর্ণনা থেকে শাফায়াতের আবেদন করাটাকে শির্‌ক ভাববার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। কেননা আনাস দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে নবীজীর (সা) এর কাছে শাফায়াতের আবেদন জানিয়েছেন এবং নবীজীও তাকে কথা দিয়েছেন। অন্তত আনাসের কাছে কোনোভাবেই মনে হয় নি যে শাফায়াতের দরখাস্ত করাটা শির্‌ক।
সাওয়াদ ইবনে আযেব নবী আকরাম (সা) এর আরেকজন সঙ্গী ছিলেন যিনি নবীজীর কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করেছেন। নবী কারিম (সা) সম্পর্কে সাওয়াদ ইবনে আযেব একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন যেই কবিতার মধ্যে নবীজীর কাছে সুস্পষ্টভাবে শাফায়াত প্রার্থনা করা হয়েছে। কবিতার একটি পংক্তি এ রকমঃ

অকুল্ লি শাফিআন ইয়াওমা লা..জু শাফাআতিন
বিমুগ্‌নি ফাতিলান আন সাওয়াদ ইবনে আযিবিন
অর্থাৎ
হে নবীকূল শিরোমণি!
পুনরুত্থান দিবসে তুমি হয়ো আমার শাফায়াতকারী
যে দিন অন্য কারো শাফায়াতে সাওয়াদ ইবনে আযেবের
অবস্থার বিন্দুমাত্রও হবে না উন্নয়ন,
হবে না কোনো লাভ এমনকি
খুরমা বিচির শাঁসের সমান।
সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী চিন্তাবিদরা বা তাদের নেতৃবৃন্দ এ ধরনের হাদিসগুলোর উদ্ধৃতি দেয় না কিংবা ইঙ্গিতও করে না। আলকোরআনের সূরা নিসা'র ৬৪ নম্বর আয়াতের কথাও তারা উল্লেখ করে না,কেননা ঐ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে শাফায়াতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছেঃ '...আর তারা যখন নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছিলো (এবং আল্লাহর আদেশ নিষেধকে পদতলে পিষ্ট করেছিলো) তখন যদি আপনার কাছে আসতো এবং পরোয়ারদেগারের দরবারে ক্ষমার আবেদন জানাতো, আর নবীজীও যদি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহকে তারা তওবা কবুলকারী এবং মেহেরবানরূপে পেতো।' এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায় তাঁর রাসূল (সা) কে বান্দার গুনাহ মাফ করার জন্যে আল্লাহর দরবারে আবেদনকারী 'মাধ্যম' হিসেবে অর্থাৎ শাফায়াতকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
বিখ্যাত মুসলিম মনীষী ও মুফাসসিরে কোরআন ফাখরে রাযি এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ 'রাসূলে খোদা (সা) তাদের জন্যে ক্ষমার আবেদন জানিয়েছিলেন (এ আয়াতে যাদের কথা এসেছে)।'...যা নবীজীর উচ্চ মর্যাদারই পরিচয় বহন করে। এর অর্থ দাঁড়ায় তারা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কাছে এসেছে...যিনি ঐশী রেসালাতের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং সুমহান মর্যাদার অধিকারী। অদৃশ্য এবং অজানা বাস্তব সত্য সম্পর্কে তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হয় এবং তিনি আল্লাহর বান্দাদের মাঝে আল্লাহরই প্রতিনিধি। নবীজী যেহেতু আল্লাহর কাছে এরকম এক উচ্চ মর্যাদার আসনে অবস্থান করেন,সেজন্যে তাঁর শাফায়াত গ্রহণ না হয়ে পারে না।'
এখন কথা হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু সুস্পষ্টভাবেই রাসূলে খোদা (সা) কে বান্দাদের গুনাহ মাফের জন্যে শাফায়াত করার অধিকার দিয়ে ধন্য করেছেন, সেহেতু প্রশ্ন জাগে সালাফিরা কেন এই সত্যটাকে অস্বীকার করছে? প্রসঙ্গক্রমে ইবনে তাইমিয়ার একটি বক্তব্যও এখানে উল্লেখ করাটা মনে হয় অসমীচীন হবে না। ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ 'আল্লাহ তায়ালা তাঁর আওলিয়াকে শাফায়াত করার অধিকার দিয়েছেন, তবে আমাদেরকে তার আবেদন করা থেকে বিরত রেখেছেন।' তার এই বক্তব্যটাই শাফায়াত সংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে সালাফিয়াদের মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গির অসারতার পরিচয় বহন করে। কেননা পবিত্র কোরআনের সূরায়ে নিসা'র ৬৪ নম্বর আয়াতেই বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁর বান্দাদেরকে বলেছেন তারা যেন তাদের নবীজীর কাছে শাফায়াত করার আবেদন জানায়।
আচ্ছা এ রকম কি কখনো হতে পারে যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাউকে কোনো কিছুর অধিকার দেবেন অথচ সেই অধিকারকে কাজে লাগাতে নিষেধ করবেন? এই কথাটাই তো বৈপরীত্যপূর্ণ। তাহলে আল্লাহ যেহেতু তাঁর আওলিয়াকে এ ধরনের অধিকার দিয়ে থাকেন তা অবশ্যই যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে সেজন্যে, সেই অধিকারকে কাজে না লাগানোর জন্যে নয়। সালাফিয়াদের চিন্তাধারায় সবসময়ই এ ধরনের বিচিত্র বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। তাদের বিচ্যুত চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রমাণের দুর্বলতার এটা আরেকটি দলিল। শাফায়াতকে নাকচ করার পেছনে ওহাবিদের সর্বশেষ যুক্তি হলো পৃথিবীর বুকে আল্লাহর ওলিদের কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানোটা মৃতের কাছে প্রয়োজন মেটানোর আবেদন করার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের মতে এ রকম কাজ একেবারেই অবিবেচনা প্রসূত এবং অর্থহীন। তারা তাদের মতের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে সূরা নামলের ৮০ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে, যেখানে বলা হয়েছেঃ "আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে এবং বধিরকেও নয়, যখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়।" কোরআন এ আয়াতে মুশরিকদেরকে মৃতের সাথে তুলনা দিয়ে বলেছে, মৃতের যেমন উপলব্ধি শক্তি নেই, তেমনি সত্যের আহ্বান অর্থাৎ ইসলাম বোঝার শক্তিও মুশরিকদের নেই। মৃতেরা যদি কথা বলতে পারতো কিংবা তাদের যদি শোনার অনুভূতি থাকতো, তাহলে মৃত অন্তরের অধিকারী মুশরিকরাও হেদায়েতের উপযুক্ত হতো।

সালাফিয়ারা সূরা ফাতেরের ২২ নম্বর আয়াতেরও উল্লেখ করে থাকে শাফায়াতের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্যে। এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ "অবশ্যই সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ্ শ্রবণ করান যাকে ইচছা। আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন।"
আগের আয়াতের মতো এ আয়াতেরও ভুল ব্যাখ্যা করেছে ওহাবিরা। এ আয়াতের প্রকৃত অর্থ হলো 'যেসব মৃতদেহ কবরে শায়িত হয় তাদের উপলব্ধি ক্ষমতা থাকে না এবং রুহ বা আত্মা যে দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় ঐ দেহের আর বোধশক্তি থাকে না।' এখন কথা হলো আল্লাহর যেসব মহান বান্দা বা মনোনীত ব্যক্তির কাছে শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, তাঁদের আত্মা তো মৃত নয়। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী বারযাখ বিশ্বে তাঁদের আত্মা জীবন্ত। তাদেঁর কাছেই শাফায়াতের আবেদন জানানো হয়, কবরে শায়িত নিষ্প্রাণ কোনো সাধারণ লাশের কাছে নয়।