ওহাবি মতবাদঃ ১০ম পর্ব

সূরা যুমারের ৬৭ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা বলেছিলাম এখানে 'মুঠো' বলতে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া তার বইতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করে বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন যমিন আল্লাহর হাতে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকব

ওহাবি মতবাদঃ ১০ম পর্ব

সূরা যুমারের ৬৭ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা বলেছিলাম এখানে 'মুঠো' বলতে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া তার বইতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করে বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন যমিন আল্লাহর হাতে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে এবং তিনি তা ছুঁড়ে মারবেন যেভাবে বাচ্চারা বল ছুঁড়ে মারে। কোরআনের এরকম ভুল ব্যাখ্যা সালাফিদের বক্তব্যে প্রচুর দেখা যায়। তারা আল্লাহর দৈহিক গঠনের কথা বলে আল্লাহর উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে নিয়ে খেলেছে ছিনিমিনি খেলা। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ইবনে তাইমিয়া মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব এবং এই মতবাদের অন্যান্য অনুসারীদের দৃষ্টিশক্তি একেবারেই অগভীর,তারা কেবল শব্দের বাহ্যিক বা আক্ষরিক দিকটার দিকেই তাকিয়েছে, শব্দের ভাবার্থ এবং প্রতীমানার্থ নিয়ে না ভাববার কারণে একত্ববাদের সূক্ষ্ম প্রাণ বা আত্মা থেকে রয়ে গেছে অনেক দূরে। এদের লেখালেখি আর কথাবার্তাতেও এই গোঁড়ামি আর অগভীর বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
রাসূলে খোদা (সা) এবং তাঁর নেককার সাহাবি ও তাবেয়িনগণ তৌহিদের যে মর্মাথের কথা বলে গেছেন, ওহাবিরা তা থেকে মুক্ত। কেননা তৌহিদ এমন একটি সত্য, এমন এক বাস্তবতা যা কেবল যথাযথ তথ্যপ্রমাণ আর মেধা শক্তির মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। তৌহিদ এমন একটি বিষয় যা অন্তরে ঈমান এবং বিশ্বাসের গভীরতা সৃষ্টি করে এবং জীবনটাকে আল্লাহর ওপর ঈমান কেন্দ্রিক করে তোলে। মজার ব্যাপার হলো ওহাবিরা কোনো কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থকে ধারণ করে নিজেদেরকে তৌহিদের যথার্থ রক্ষক এবং কোরআনের আয়াতের যথাযথ বাস্তবায়নকারী বলে মনে করে আর তাদের বাইরের সবাইকে কাফের বলে মনে করে। ইবনে তাইমিয়া তার বিরোধীদের জবাবে বলেছেন আল্লাহর কিতাব,রাসূলে আকরাম (সা)'র সুন্নাত এবং তাঁর সাহাবি ও তাবেয়িনদের বক্তব্যে যদিও আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বার কথা দেখা যায় না কিন্তু এ ব্যাপারটিকে তো অস্বীকারও করা হয় নি। তাই আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা রয়েছে বলে মনে করা যায়।
ইবনে তাইমিয়া আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা সংক্রান্ত তার বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় বলেন, আল্লাহ আকাশ সমূহের উপরে বসে রয়েছেন। তিনি হাসেঁন, পথ চলেন, দৌড়েন ইত্যাদি। তিনি তার "আকিদাতুল হামাভিয়া' নামক পুস্তিকায় লিখেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা হাঁসেন। কিয়ামতের দিন তিনি হাঁসিমুখে বান্দাদের সামনে প্রকাশিত হবেন।" অথচ কোরআনে কারিম সূরা আনআমের ১০৩ নম্বর আয়াতে সবার উদ্দেশ্যে বলেছে যে, আল্লাহ এমন এক সত্ত্বা,পৃথিবীর কারো পক্ষেই তাঁকে দেখা সম্ভব নয়। বলা হয়েছেঃ "দৃষ্টিসমূহ তাঁকে দেখতে পায় না, অবশ্য তিনি সকল দৃষ্টি বা চোখগুলোকে দেখেন; তিনি অত্যন্ত দয়ালু, সূক্ষ্মদর্শী ও সুবিজ্ঞ।" ইমাম আলী (আ) আল্লাহ সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ "আল্লাহ মানে হলো এমন একজন মাবুদ যাঁর সম্পর্কে সৃষ্টিকূল দিশেহারা,কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং সৃষ্টিকূল তাঁকে ভালোবাসে। আল্লাহ তো তিনিই, যাঁকে চোখ দিয়ে অনুভব করা যায় না এবং যিনি মানুষের চিন্তা, বুদ্ধি-বিবেচনার অনেক উর্ধ্বে।"
কোরআনের একটি প্রাণবন্ত আয়াতে আল্লাহর 'দৈহিকতা'কে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এ বিষয়ে 'সূরা এখলাস' অবতীর্ণ হয়েছিল বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। বিশিষ্ট দার্শনিক নিশাবুরি হিজরি চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দির একজন বিখ্যাত হাদিস শাস্ত্রবিদও ছিলেন। তাঁকে 'ইমামুল মুহাদ্দেসিন' এবং 'মুহাদ্দেস আলখোরাসান' নামে অভিহিত করা হতো। নিশাবুরি রাসূলে আকরাম (সা) এর বিশিষ্ট সাহাবি আবি ইবনে কাব থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি হলোঃ মুশরিকরা একদিন রাসূলে খোদার কাছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। ঠিক সে সময় মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা) এর ওপর সূরায়ে এখলাস নাযিল করেন। যেখানে বলা হয়েছেঃ 'হে পয়গাম্বর! মুশরিকদের বলুন! তিনি আল্লাহ,এক এবং অমুখাপেক্ষী, তাঁর কোনো সন্তানাদি নেই এবং তিনিও কোনো বাবা-মায়ের সন্তান নন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অদ্বিতীয়,তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।' বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব জাহাবিও এই বর্ণনার সত্যতা অনুমোদন করেছেন। আসলে কোরআন এইসব আয়াতের মাধ্যমে মুশরিকদের এই জবাবই দিচ্ছে যে, আল্লাহর দৈহিক কোনো অস্তিত্ব নেই যে তাঁর বংশ বা সন্তানাদি থাকবে। তারপরও দুঃখজনকভাবে ইবনে তাইমিয়ার মতেো লোকেরা আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বার অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যস্ত।
আরো একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন বায়হাকি। তিনিও আল্লাহর দৈহিক অস্তিত্বের বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহর দৈহিকতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সপক্ষে তিনি হাম্বলি মাযহাবের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ ' অভিধান বিশারদগণ 'দেহ' শব্দটির ব্যাখ্যায় বলেছেন এটি এমন এক বস্তু যার দৈর্ঘ আছে, প্রস্থ আছে, উচ্চতা আছে, গঠন এবং আকৃতি আছে। আর আল্লাহ তায়ালা এই সকল অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র। তাই তাঁর দৈহিক অস্তিত্বের কথা বলা একেবারেই অনুচিত কেননা 'দেহের' যতো প্রকার আভিধানিক কিংবা পারিভাষিক অর্থ হয় সর্বপ্রকার অর্থ থেকে আল্লাহ পাক মুক্ত। শরীয়তেও এই শব্দটির প্রয়োগ নেই। অতএব, আল্লাহর দৈহিকতা সংক্রান্ত বিশ্বাস একান্তই ভ্রান্ত।'
মজার ব্যাপারটি হলো, ইবনে তাইমিয়া নিজেকে হাম্বলি মাযহাবের একজন অনুসারী বলে দাবী করে। আর হাম্বলি মাযহাবটির প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান হলেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। স্বয়ং আহমাদ ইবনে হাম্বল যেখানে আল্লাহর দৈহিক সত্ত্বা সংক্রান্ত বিশ্বাসকে বাতিল বলে মনে করেন সেখানে ইবনে তাইমিয়া কীভাবে আল্লাহর দৈহিক গঠন কাঠামো রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন! এভাবেই তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার এই বিচ্যুত ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ওহাবি চিন্তা বা মতবাদের মূল ভিত্তি রচনা করেছে। পরবর্তী আসরে আল্লাহর দৈহিকতা সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার অপর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আজকের আসরের সময় শেষ হয়ে আসায় আজ আর এ সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ নেই।
সূত্রঃ ইন্টারনেট