ওহাবি মতবাদঃ ৮ম পর্ব

প্রকৃতপক্ষে আলসাউদ তেষট্টি বছরে ব্যাপক স্থবির হয়ে পড়ে। আব্দুল আযিয বিন আব্দুর রহমানের আগমন পর্যন্ত এই স্থবিরতার ধারা অব্যাহত থাকে। আব্দুল আযিযের আগমনে সাউদ বংশের শক্তি যেমন ফিরে আসে তেমনি বিচ্যুত ঐ ওহাবি মতবাদের চর্চাও পুনরায় বৃদ্ধি পায়। আব্দুল আযিয ব

 ওহাবি মতবাদঃ ৮ম পর্ব
প্রকৃতপক্ষে আলসাউদ তেষট্টি বছরে ব্যাপক স্থবির হয়ে পড়ে। আব্দুল আযিয বিন আব্দুর রহমানের আগমন পর্যন্ত এই স্থবিরতার ধারা অব্যাহত থাকে। আব্দুল আযিযের আগমনে সাউদ বংশের শক্তি যেমন ফিরে আসে তেমনি বিচ্যুত ঐ ওহাবি মতবাদের চর্চাও পুনরায় বৃদ্ধি পায়। আব্দুল আযিয বিন আব্দুর রহমান 'ইবনে সাউদ' নামেই বেশি পরিচিত। ওহাবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার লক্ষ্যে ইবনে সাউদ 'এখওয়ানুত তাওহিদ' নামে একটি সংগঠন গঠন করে। এই সংগঠনভুক্তদের আবাসনের জন্যে ব্যাপক তৎপরতাও চালায়। আসলে 'এখওয়ানুত তাওহিদ' ছিল ওহাবিদের সামরিক ও ধর্মীয় শাখা যার দায়িত্ব ছিল সমগ্র আরব ভূখণ্ডে এই মতবাদের বিস্তার ঘটানো।ইতিহাসে এসেছে আব্দুল আযিয বৃটিশদের সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন হয়েছে। অবশ্য গেল কয়েক শতাব্দির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন ঘটনায় আধিপত্যবাদীদের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যাবে। উপনিবেশবাদীরা ক্ষমতালিপ্সু অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করেছে এবং বলাবাহুল্য ক্ষমতালিপ্সুরাই উপনিবেশবাদীদেরকে নিজেদের দেশে ঢোকার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। আব্দুল আযিয বিন সাউদও তাদের একজন।
ব্রিটিশদের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে ক্ষমতায় গিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর জয়ী হবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ঐ সময়টা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল। ব্রিটিশরা তখন চেয়েছিল ওসমানী সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার মাধ্যমে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে তা দখল করে নিতে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ব্রিটিশ সরকার নজদে তাদের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন দুটি বংশের সাথে মৈত্রী গড়ে তোলে। এই দুই খান্দানের একটি হলো হাশেমি; মক্কা এবং মদিনার ওপর যাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। অপর বংশটি হলো আলেসাউদ যারা রিয়াদ এবং নজদের ওপর শাসন করছিল। ব্রিটিশরা আরবের আরব গোত্রগুলোকে খুশি করার জন্যে এবং ওসমানী সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রে তাদেরকে ব্যবহার করার জন্যে এই দুই খান্দানকে-যারা পরস্পরের বিরোধী ছিল-টার্গেট করে। ব্রিটিশরা উভয় খান্দানের কাছে দুত পাঠায়। 'টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স'-যিনি আরবের লরেন্স নামেই বেশি পরিচিত-তাকে পাঠানো হয় শরিফ হোসাইনের শিবিরে। আর 'হ্যারি সেন্ট জন ব্রিজার ফিলবি'-যে কিনা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং নিজেকে আব্দুল্...নাম ধারণ করেছিল-তাকে পাঠানো হলো আলেসাউদের কাছে।
লরেন্স শরিফ হোসাইনকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সুসংবাদ দেয় যে, ওসমানীদের পরাজয়ের পর বৃহত্তম আরবের শাসনভার তার ওপর অর্পন করা হবে। ব্রিটিশ এই একই প্রতিশ্রুতি আব্দুল আযিয সাউদিকেও দেয়। তারা নজদ, এহসা, কাসিম এবং জুবাইলের ওপর আব্দুল আযিযের শাসনকেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল আযিয এবং বৃটেনের মধ্যে সংঘটিত চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা আলেসাউদকে বার্ষিক ষাট হাজার লিরা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বাইরের যে কোনো হামলায় আব্দুল আযিয ও তার সন্তানদেরকে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পক্ষান্তরে ইবনে সাউদও প্রতিশ্রুতি দেয় যে,সৌদি আরবের ব্রিটিশ সমর্থনপুষ্ট ভূখণ্ডের ওপর হামলা করা হবে না এবং ব্রিটিশদের শত্রুদেরকে কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর হাশেমি বংশীয় এবং মক্কার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হোসাইন ইবনে আলি নিজেকে আরবের বাদশা দাবি করে এবং আলেসাউদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু আব্দুল আযিয ব্রিটিশ সহযোগিতায় হোসাইন শরিফকে পরাস্ত করে। এর কবছর পর সাউদিরা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়,কিন্তু বৃটেন নিজেদের স্বার্থচিন্তা করে আব্দুল আযিয সাউদিকে সমগ্র আরবের ওপর তার আধিপত্য বিস্তারকে সমীচীন মনে করে নি। ইতোমধ্যে ইবনে সাউদ হেজাজের ওপর তার আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশে তার সেনাদেরকে মক্কা মুকাররমার দিকে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেয়।
ওহাবি সেনারা ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় যাবার আগে হেজাযের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েফে গিয়ে পৌঁছে। তায়েফের আমির ওহাবি সেনাদের আগমনের কথা শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আগেভাগেই পালিয়ে যায়। এরপর তায়েফের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ওহাবিদের সাথে আলোচনায় বসে রক্তপাতহীনভাবেই তাদের হাতে তায়েফ শহর সমর্পন করে। কিন্তু ওহাবিরা তায়েফে প্রবেশ করার পর কথা রাখেনি। চুক্তি ভঙ্গ করে তারা নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরায়। এতোটা নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে তারা হত্যাকাণ্ড চালায় যে তাদের হাত থেকে নারী-শিশু-পুরুষ কেউই রক্ষা পায় নি। অন্তত দুই হাজার মানুষকে তারা হত্যা করে যাদের মাঝে বহু আলেম ওলামাও ছিলেন। ওহাবিরা তায়েফ বাজার লুট করে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তায়েফে আব্দুল আযিযের সেনাদের এই নোংরামি আর নিষ্ঠুরতা ইতোপূর্বে এই তায়েফেই তাদের পূর্বসূরি ওহাবিদের বর্বর হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের হামলা থেকে শাফেয়িদের বিখ্যাত মুফতি শায়খ আব্দুল্ল.. যেভরিও রক্ষা পান নি। ওহাবিরা তাকেঁ মসজিদ থেকে টেনে বের করে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে।
কিছুদিন পর আব্দুল আযিয ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মক্কাও দখল করে। চুক্তি ভঙ্গ করে আব্দুল আযিয যে হেজাজে হামলা করলো বৃটেন প্রথমে তার বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে বৃটেনের প্রয়োজন ছিল তাদের সাথে সম্পৃক্ত কোনো শাসকের। অপরদিকে সৌদি আরবের তেল সম্ভারের দিকে তাদের নজর ছিল। সেজন্যেই বৃটেন হাশেমি বংশকে সরিয়ে দিয়ে ইবনে সাউদকে সমগ্র আরব্য উপদ্বীপ দখলে সাহায্য করেছিল। তারি পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবি আকিদার ভিত্তিতের সৌদি বাদশাহীর ভিত রচিত হয়। এরফলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐ গোঁড়া ওহাবি ফের্কা তাদের আকিদা প্রচার-প্রসারের শক্তিশালী ঘাটিঁ পেয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ওহাবি মতবাদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং আব্দুল আযিযও নিজেকে ওহাবি ফের্কার নেতা এবং হারামাইন শরিফাইনের খাদেম হিসেবে দাবী করে। সৌদিরা সেই শুরু থেকেই নিরীহ মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে,তাদের ধনসম্পদ লুট করে নিজেদের প্রয়োজনীয় আর্থিক বাজেট নিশ্চিত করতো,আর এখন তেল বিক্রি করে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাচ্ছে।
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল আযিযের মৃত্যুর পর তার ওসিয়্যত অনুযায়ী তার সন্তানদের হাতে থাকবে হুকুমাতের দায়িত্ব। আব্দুল আযিযের রেখে যাওয়া ৩৯ জন পুত্রসন্তান তাই ওসিয়্যত অনুসারে বয়সানুক্রমিক ধারায় সৌদি আরবের হুকুমাতের মসনদে আসীন হয়েছে।
সূত্রঃ ইন্টারনেট