ওহাবি মতবাদঃ ৬ষ্ঠ পর্ব

কুয়েতের আহলে সুন্নাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডক্টর রেফায়ি "ওহাবি ভাইয়ের প্রতি পরামর্শ" নামক গ্রন্থে ওহাবি আলেমদের উদ্দেশ্যে লিখেছেনঃ তোমরা নবীজীর প্রথম হাবিবা বা সহধর্মিনী উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা (সা) এর ঘর ধ্বংস করার অনুমতি দিয়েছো এবং কোনোরক

 ওহাবি মতবাদঃ ৬ষ্ঠ পর্ব
কুয়েতের আহলে সুন্নাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডক্টর রেফায়ি "ওহাবি ভাইয়ের প্রতি পরামর্শ" নামক গ্রন্থে ওহাবি আলেমদের উদ্দেশ্যে লিখেছেনঃ তোমরা নবীজীর প্রথম হাবিবা বা সহধর্মিনী উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা (সা) এর ঘর ধ্বংস করার অনুমতি দিয়েছো এবং কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখাও নি। অথচ ঐ ঘরটি ছিলো কোরআন তথা ওহি অবতীর্ণ হবার পবিত্র স্থান....কেন তোমরা আল্লাহকে ভয় করছো না এবং পয়গাম্বরে কারিমের ব্যাপারে লজ্জা করছে না। ..তোমরা নবীজীর জন্মস্থানটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তাকে পশু বেচাকেনার স্থানে পরিণত করেছো যাকে কিছু নেককার ও ভালো মানুষ ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে তোমাদের ওহাবিদের ছোবল থেকে মুক্ত করায় গ্রন্থালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে....."
ওহাবিদের ভয়াবহতম এবং ন্যক্কারজনক আরেকটি কাজ-যে কাজের ক্ষতি সবসময়ের জন্যেই বহমান থাকবে-তা হচ্ছে মক্কার "আলমাকতাবুল আরাবিয়া" নামের বিশাল লাইব্রেরিতে আগুন দেওয়া। এই কুতুবখানায় দুর্লভ ও মূল্যবান ষাট হাজার কিতাব ছিল এবং চল্লিশ হাজারেরও বেশি হাতে লেখা অনন্য পাণ্ডুলিপি ছিলো। এগুলোর মাঝে সেই জাহেলি যুগের, ইহুদিদের, কুরাইশ কাফেরদেরও হাতে লেখা বহু নিদর্শন মজুদ ছিল। বিশাল এই গ্রন্থাগারে আরো ছিল প্রাচীন কোরআন, আলী (আ), আবু বকর, ওমর, খালেদ বিন ওলিদ, তারেক বিন যিয়াদসহ নবীজীর আরো বহু সম্মানিত সাহাবির হাতে লেখা অনন্য সব নিদর্শন। আলমাকতাবুল আরাবিয়া লাইব্রেরিতে আরো যেসব মূল্যবান নিদর্শন মজুদ ছিলো তার মধ্যে ছিলো রাসূলে খোদা (সা) এর অস্ত্রশস্ত্র, ইসলাম আবির্ভাবকালে যেসব মূর্তির পূজা করা হতো-যেমন লাত, উযযা, মানাত, হুবাল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনায় এসেছে, ওহাবিরা কাফেরদের সাথে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনগুলো এই গ্রন্থাগারে মজুদ থাকার অজুহাত দেখিয়ে তাতে আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছে।
পূর্বপুরুষদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং প্রাচীনদের ইতিহাস সংরক্ষণ করা একটি সমাজের সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত হয়। কেননা এইসব নিদর্শন শিক্ষা নেওয়া, ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত থেকে করণীয় ঠিক করা ইত্যাদির জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ ও সরকার এ ধরনের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ করার জণ্যে বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং কাউকে সেখানকার ছোট্ট একটি মৃৎপাত্রও কিংবা সামান্য একটি প্রস্তর লিখনও নিয়ে যেতে দেয়া হয় না। নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বিশ্বের উন্নত সভ্যতাগুলোর একটি এবং মুসলমানরা ইসলামী শিক্ষার আলোকেই এই সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গীসাথীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিদর্শন সমৃদ্ধ এই সভ্যতার উত্তরাধিকার ও অংশ। তাই এইসব নিদর্শন সংরক্ষণ করা এবং সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতির গোড়াপত্তনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই প্রতীক। পক্ষান্তরে এগুলোকে ধ্বংস করা মূর্খতা ও জাহেলি কুসংস্কার তথা গোঁড়ামির শামিল। ভ্রমণকাহিনী আর ইতিহাসের বহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ইসলামী দেশগুলোসহ ওহির দেশে পূণ্যবানদের শত শত মাযার ছিল,যেগুলোর অধিকাংশই ওহাবিরা শেরেক আর কুফুরির অজুহাতে বিনষ্ট করে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে।
সাউদ বিন আব্দুল আযিয মক্কা মুকাররমা দখল করার সময় আহলে সুন্নাতের বহু আলেম ওলামাকে বিনা কারণে শহীদ করেছে এবং মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত লোককে কোনোরকম অভিযোগ ছাড়াই ফাঁসি দিয়েছে। মুসলমানদের যে-কেউই নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর স্থির থাকতো তাদের বিভিন্নভাবে শাস্তির হুমকি দিয়েছিলো। সে সময় হাটে-বাজারে, অলিতে গলিতে সাউদের ঘোষকেরা হাঁক মেরে ঘোষণা করে দিতোঃ "হে লোকজন! সাউদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হও এবং তার বিস্তৃত ছায়ার নীচে আশ্রয় নাও!" ওসমানী সরকারে নৌ-বাহিনীর উচ্চতরো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক রিয়ার এডমিরাল আইয়ুব সাবুরি লিখেছেনঃ আব্দুল আযিয বিন সাউদ বিভিন্ন গোত্রের শেখদের সমাবেশে দেওয়া তার প্রথম বক্তৃতায় বলেছেন, আমাদের উচিত সকল শহর নগরকে আমাদের অধীনে নিয়ে আসা। আমরা আমাদের আকিদা বিশ্বাসগুলো তাদেরকে শিক্ষা দেবো। আমাদের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে নিরুপায় হয়ে নবীজীর সুন্নাত তথা মুহাম্মাদি শরিয়াতের অনুসরণের দাবিদার আহলে সুন্নাতের আলেমদেরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে...বিশেষ করে নামকরা আলেমদেরকে; কেননা এরা যতোদিন বেঁচে থাকবে ততোদিন আমাদের আকিদা বিশ্বাস হাসির মুখ দেখবে না। তাই যারাই নিজেদেরকে আলেম বলে মনে করে প্রথমে তাদেরকে নির্মূল করতে হবে।"
সাউদ বিন আব্দুল আযিয মক্কা দখল করার পর আরব্য উপদ্বীপের অন্যান্য শহরও দখল করার চিন্তাভাবনা করে। এবার তাই হামলা চালায় বন্দর নগরী জেদ্দার ওপর। ওহাবি লেখক ইবনে বুশর তাঁর "নজদির ইতিহাস" নামক গ্রন্থে লিখেছেন, সাউদ মক্কায় বিশ দিনেরও বেশি ছিলেন,তারপর জেদ্দা দখল করার জন্যে মক্কা ত্যাগ করে। সাউদ জেদ্দা অবরোধ করে ঠিকই, কিন্তু জেদ্দার শাসক গোলা নিক্ষেপ করে বহু সংখ্যক ওহাবিকে হত্যা করে এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। ওহাবিরা এভাবে পরাজিত হবার পর মক্কায় ফিরে না গিয়ে বরং তাদের মূল ভূখণ্ড নজদে চলে যায়, কেননা তারা শুনতে পেয়েছিল ইরান থেকে একদল সেনা নজদে হামলা করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সুবর্ণ একটি সুযোগ এসে যায় ওহাবিদের হাত থেকে মক্কা শহরকে পুনরায় উদ্ধার করার। মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবিদের হামলার পর জেদ্দায় লুকিয়েছিলেন,তিনি এখন জেদ্দার শাসকের সহযোগিতায় প্রচুর সেনা নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তাদের সেনাদের কাছে কামান-গোলার মতো অস্ত্রশস্ত্র ছিল যার ফলে তারা ওহাবি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় মক্কা বিজয় করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ওহাবিরা এরপরেও বিশ্বমুসলমানের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান মক্কাকে পুনরায় দখল করার পাঁয়তারা করে। শেষ পর্যন্ত ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবিদের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত সাউদের আদেশে পবিত্র মক্কা শহরটিকে আবারো অবরোধ করা হয়। দখল করার পর সাউদ মক্কার জনগণের ওপর এতো কঠোর আচরণ করতে থাকে যে শহরের বহু লোক ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যায়। সাউদের আদেশে মক্কা শহরের প্রবেশদ্বার এবং বের হবার পথ সবই বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে-ই মক্কা থেকে পালাতে চেয়েছিল তাকেই হত্যা করা হয়েছিল। তাদের হাত থেকে শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় নি। অবস্থা ভীষণ বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবিদের সাথে হাত না মিলিয়ে পারলো না।
ওহাবিরা মক্কা অবরোধ করার সময় সে তাদের সাথে ভালো আচরণ করেছিল এমনকি ওহাবি আলেমদেরকে মূল্যবান সব উপঢৌকনও দিয়েছিল প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যে। মক্কা দখল করে এবার ওহাবিরা ইরাকি হজ্বযাত্রীদের জন্যে চার বছর,সিরিয়াবাসীদের জন্যে তিন বছর এবং মিশরীয়দের জন্যে দুই বছর হজ্বের মতো আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ ইবাদাতের সকল আনুষ্ঠানিকতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
সূত্রঃ ইন্টারনেট